সিসি নিউজ।। ঘোষনার দীর্ঘ ৬ বছরেও সৈয়দপুর বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রুপ নেয়নি। এ সরকার ক্ষমতা থাকাকালীন ২০১৭ সালে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা প্রতিকূল সমস্যার কারনে পরবর্তীতে থেমে যায় প্রকল্পটির কাজ। কিন্তু আগামী ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী দলীয় কাজে রংপুরে আসছেন। আর এ সমাবেশের মাধ্যমে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছেন উত্তর জনপদের মানুষ।
সূত্র মতে, দেশের আভ্যন্তরিন যাত্রী পরিবহনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দর। দেশের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে এটি একটি। বিমানবন্দরটিতে বর্তমানে প্রতিদিন ৩০টি ফ্লাইট ঢাকা-সৈয়দপুর-ঢাকা রুটে চলাচল করে। চলাচল করেছে সৈয়দপুর- চট্টগ্রাম ও সৈয়দপুর- কক্সবাজার রুটেও। যা গত তিন মাস থেকে চলাচল বন্ধ থাকার পর আগামী ৭ আগস্ট থেকে পূর্নরায় বাংলাদেশ বিমান সৈয়দপুর-কক্সবাজার রুটে চলাচল করার ঘোষনা দিয়েছে।
ভৌগোলিক সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে বহুমুখী যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীতকরণের ঘোষনা দেওয়া হয় ২০১৭ সালে। সেই অনুযায়ী শুরু করা হয় প্রকল্পটির কাজ। কিন্তু কোভিড মহামারীর কারণে গতি হারায় এ কার্যক্রম। জমি অধিগ্রহণের কাজও ঠিকঠাক শুরু করা যায়নি। রানওয়ে সম্প্রসারণে জমি অধিগ্রহণে ভূমি মালিকদের ৪ ধারার নোটিশ জারি এবং হাতে লেখা ফিল্ডবুক তৈরির পর আর কোনো অগ্রগতি নেই। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় থমকে আছে কাজ। এতে একদিকে ভূমি মালিকরা বিপাকে পাড়েন অন্যদিকে হতাশ হয়ে পড়েন এ অঞ্চলের মানুষ।
তবে আগামী বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রংপুর সফরে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঘিরে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন রাজনীবিদ, ব্যবসায়ীসহ এ অঞ্চলের লোকজন।
সৈয়দপুর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে উত্তরের এই বিমানবন্দরটি ১৩৬ দশমিক ৫৯ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। রাজধানী ঢাকা থেকে ২৬০ কিলোমিটার উড্ডয়ন দূরত্বে অবস্থিত যা আকাশপথে অতিক্রম করতে সময় লাগে মাত্র ৪৮ মিনিট। বিমানবন্দরটি অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু করে ১৯৭৯ সালে। ৬ হাজার ফুট রানওয়েসম্পন্ন এই বিমানবন্দরটি দেশের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি।
বিমানবন্দরটিতে বর্তমানে প্রতিদিন ৩০টি ফ্লাইট ঢাকা-সৈয়দপুর-ঢাকা রুটে চলাচল করে। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বাংলাদেশ বিমান, ও বেসরকারি অপারেটর ইউ এস বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা এখান থেকে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
বিমানবন্দরের তথ্য থেকে জানা যায়, এই বিমানবন্দর থেকে সর্বোচ্চ ১৮০ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে নেপাল ও ভুটান সীমান্ত। সৈয়দপুর থেকে নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বের সেভেন সিস্টারখ্যাত ৭ রাজ্যের নিকটতম বিমানবন্দরগুলেতে যেতে আকাশপথে ৩০ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগে। নিজেদের ছোট ছোট বিমানবন্দরে অবতরণ-উড্ডয়ন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পাহাড়ি দেশ দুটি সৈয়দপুর বিমানবন্দরটি ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সিভিল এভিয়েশন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। এরপর বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নিত করার লক্ষ্যে জরিপকাজ পরিচালনার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ান একটি ফার্মকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে জরিপ শেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ একটি মাস্টারপ্ল্যান করে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আশেপাশের ৯১২ দশমিক ৯০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল বিমানবন্দরটিকে উন্নীতকরণ প্রকল্প সীমানা চিহ্নিত ও জরিপকাজ শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা (এলএ) একই বছরের ১১ জুলাই ওই জরিপকাজ সম্পন্ন করে।
বর্তমানে সৈয়দপুর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের ১৩৬ একর জমির সঙ্গে আরও ৯১২ দশমিক ৯০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য চিহ্নিত করে লাল নিশানা লাগানো হয়। এর মধ্যে সৈয়দপুর উপজেলার বাঙালিপুর ইউনিয়ন এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বেলাইচী ইউনিয়ন রয়েছে। সৈয়দপুরের ৫৯৫ দশমিক ১৩ একর জমির মধ্যে সরকারি ৩টি সংস্থার ৬০ একর জমি রয়েছে। এদিকে পার্বতীপুরে রয়েছে ৩১৭ দশমিক ৭৭ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি।
সূত্রটি জানায়, বিমানবন্দর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার প্রাথমিকভাবে ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু বরাদ্দের সেই টাকা না পাওয়ায় কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ কুমার গাইওয়ালি বাংলাদেশ সফরকালে সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করার প্রস্তাব করেন। সেসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছিলেন, আন্তঃদেশীয় সংযোগ এবং ব্যবসা বাণিজ্য ও পর্যটনশিল্পের বিকাশে সরকার সৈয়দপুর বিমানবন্দর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অপরদিকে ভুটানের অর্থনীতি বিষয়ক সেক্রেটারি কারমা শেরিং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরকালে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।
একই সূত্র জানায়, ভূমি অধিগ্রহন, পুনর্বাসন ও স্থানান্তর সংক্রান্ত একটি ডিপিপি (ড্রাফট প্রজেক্ট প্রপোজাল) মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু এটি চূড়ান্ত করার পূর্বেই করোনা মহামারির কারণে তা থমকে যায়।
সৈয়দপুর বিমানবন্দর সংলগ্ন জমি মালিক আতাউর রহমান বলেন, জমি অধিগ্রহণের জন্য নোটিশ দিয়েছে প্রায় চার বছর আগে। কিন্তু এখনো জমির টাকা পাইনি। আমার স্ত্রী জটিল রোগে আক্রান্ত। তার চিকিৎসায় অনেক টাকা দরকার। ভেবেছিলাম, জমির টাকা পেলে চিকিৎসা করাবো। কিন্তু সরকার সেই টাকা দিচ্ছে না, অন্য কোথাও জমি বিক্রি করতেও পারছি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি তিনি যেন দ্রুত আমাদের এ সমস্যার সমাধান করেন।
সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোখছেদুল মোমিন বলেন, যেহেতু এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, তাই আমরা আশাকরি অবশ্যই এটি বাস্তবায়ন হবে। এটি একটি মেগা প্রকল্প। এখানে অনেক অর্থের ব্যাপার আছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা সংকটের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।
নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি প্রকৌশলী এস এম শফিকুল আলম ডাবলু বলেন, সৈয়দপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে বিদেশের সাথে শিল্প বাণিজ্যে পিছিয়ে থাকা এই এলাকার ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের একটাই দাবি তিনি যেন এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন হয়।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সুপ্লব কুমার ঘোষ জানান, ’ বিমানবন্দর উন্নিত করার অংশ হিসেবে দৃষ্টিনন্দন অভ্যন্তরীন টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজ প্রায় সমাপ্তির পর্যায়ে। এর ফলে যাত্রীধারণ ক্ষমতা বর্তমানের ২০০ জনের স্থলে ৬২০ জন হবে।’