সিসি নিউজ।। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন,‘ আমরা বলছি মৌলিক সংস্কার হতে হবে রাষ্ট্রের। সংস্কারের মধ্যদিয়ে নির্বাচনের দিকে যেতে হবে’। বৃহস্পতিবার বেলা তিনটার দিকে নীলফামারী শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি একথা বলেন।
দেশগড়তে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির অংশে উত্তরাঞ্চলে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের আগমনে পার্টির জেলা শাখা ওই সভার আয়োজন করে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আরো বলেছি বাংলাদেশে একটা নতুন সংবিধান লাগবে। যে আওয়ামী লীগের সংবিধান, যে মুজিববাদের সংবিধান সেই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। সে সংবিধান আপনার, আমার অধিকার রক্ষা করতে পারে নাই, আমাদেরকে যখন রাস্তায় মারা হয়েছে, আমাদেরকে গুম করা হয়েছে, আমাদের মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে নাই। যে সংবিধান জনগণের সংবিধান নয় সে সংবিধান রাখার আর কোন মানে হয় না’।
তিনি উল্লেখ করে বলেন, আমরা অবশ্যই নির্বাচন চাই, আমরা নির্বাচিত সরকার চাই। কিন্তু অবশ্যই এই গণঅভ্যুত্থানে যারা হত্যা করেছে, শেখ হাসিনা এবং তাদের দোসর যারা বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকায় এলাকায় এখনো লুকিয়ে আছে, তাদেরকে বিচারের আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। শেখ হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের আওতায় আনতে হবে। শেখ হাসিনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সকলের মনে দাউদাউ করে যে আগুন জ্বলছে সে আগুন কোনদিন নিভবে না’।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান যারা করেছে তারা কিন্তু এখনো জাগ্রত আছে হুশিয়ারী দিয়ে তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা অনেককিছু আশা করেছিলাম। আমাদের সব আশা পূরন হয়নি। আমরা এখন এটাই মনে করি যে, আমাদের লড়াইটা হয়তো চালাতেই হবে। এই গণঅব্যুত্থানের পরে আবারো পুরনো যে নিয়ম-কানুন, পুরনো কালচার সব ফিরে আসছে আমরা দেখছি। যদি কেউ মনে করে আবারো পুরোনা বন্দোবস্ত, পুরোনো দখলদারিত্ব, পুরোনো সন্ত্রাসের রাজনীতি ফেরৎ আনবে তাদের পরিণতিও কিন্তু স্বৈরাচার হাসিনার মতই হবে’।
এসময় নীলফামারী বাসীকে বলেন,‘আজকে ভরদুপুরের কাঠফাটা রোদের মধ্যে আপনারা কষ্ট করে, পরিশ্রম করে এসেছেন আমাদের কথা শুনতে, আমাদেকে সমর্থন জানাতে এজন্য আপনাদেরকে আন্তরি ধন্যবাদ জানাই’। তিনি নীলফামারীর সন্তান শহিদ রুবেল হোসেনের বাবা রফিকুল ইসলামকে সামনে দেখিয়ে বলেন, ‘আমার সাথে যিনি আছেন উনি শহিদ রুবেলের পিতা। এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান, যেই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে স্বাধীনতা এবং মুক্তির স্বাদ পেয়েছে, সেই গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সন্তান জীবন দিয়েছেন। সেই শহিদ রুবেল তার জীবন দানের মধ্যদিয়ে, তার রক্ত দেওয়ার মধ্যদিয়েই আমরা একটা স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশের কথা বলতে পারছি, আমরা স্বৈরাচারকে হটাতে পেরেছি’।
নীলফামারীর শহিদ সন্তান রুবেলের আন্দোলনে কথায় বলেন,‘রুবেল মাত্র ক্লাশ সেভেনে পড়তো। গার্মেন্টেসে কাজ করতো নিজের পড়াশোনার খরচ মেটানোর জন্য। খুবই গরীব ঘরের সন্তান সেই রুবেল। সে রুবেলের কোন প্রয়োজন ছিলনা রাস্তায় নামার, প্রয়োজন ছিল না পুলিশের বুলেটের সামনে নামার। কারণ এই আন্দোলনটা ছিল প্রথকে চাকুরীর আন্দোলন, যে চাকারীতে বৈষম্য হয়। শহিদ রুবেল হয়তো সেই পুরো জিনিসটাও বুঝতো না। কিন্তু ক্লাস সেভেনের একটা ছেলে রাস্তায় নেমেছিল, কেন নেমেছিল ? আপনারা নিজেদের কাছে, নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন। সপ্তম শ্রেণির একটা ছেলে যদি রাস্তায় নেমে পুলিশের বুলেট বুকে নিতে পারে সন্ত্রাসীদের বুলেটের মুখে সাহস করে দাঁড়িয়ে যেতে পারে, স্বৈরাচারকে হটাতে পারে, তাহলে আপনারা, আমরা যারা জীবিত আছি তারা কী একটা নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে পারবো না ? এইযে সপ্তম শ্রেণির রুবেল, এইযে বাচ্চা ছেলেরা-মেয়েরা শহিদ হলো, জীবন দিলো, তাদের জীবনদানের বিনিময়ে আমাদের এই বাংলাদেশকে সুন্দর এবং স্বপ্নের, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে’।
তিনি বলেন,‘সকল শহিদরা আমাদের অনুপ্রেরণা, আমরা মনেকরি এই মানুষগুলো জীবন দিয়েছে একটা সুন্দর, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য। যে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকবে না, যে বাংলাদেশে আঞ্চলিক বৈষম্য থাকবে না। যে বাংলাদেশে আপনি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন, কথা বলতে পারবেন। আপনার ভাতের অধিকার পাবেন, শিক্ষার অধিকার পাবেন। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাবেন, সরকারি অফিসে গেলে আপনাকে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে হবেনা, দুর্নীতির শিকার হতে হবে না। এরকম এটা বাংলাদেশের জন্য আমাদের ছেলেরা মেয়েরা, আমাদের ভাই-বোনেরা জীবন দিয়েছে, আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম’।
তিনি বলেন,‘আমরা পুরা দেশব্যাপী, দেশগড়তে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি, আমরা প্রথমে উত্তরবঙ্গে এসছি রংপুর, গাইবান্ধা গিয়েছি আজকে নীলফামারী এসেছি। কারণ আমরা মনে করি উত্তরবঙ্গ বৈষম্যের শিকার, এই উত্তরবঙ্গ থেকে শহিদ আবু সাঈদ, শহিদ রুবেলরা আন্দোলনে দাঁড়িয়েছিল তাই উত্তর বঙ্গের প্রতি আমাদের আলাদা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এসেছি। নীলফামারীতে এসেছি, নীলফমারীর ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ, নীলফামারীর ইতিহাস লড়াইয়ের ইতিহাস, সেই নীল বিদ্রোহ থেকে আমরা নীলফামারীর কথা শুনি’।
বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে উল্লেখ করে বলেন,‘রাজপথে তৃণমূলে কেবল একটাই দল আছে, বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, নাগরিক পার্টির উত্থান ঘটেছে, তারুণ্যের উত্থান ঘটেছে, চব্বিশের শক্তির উত্থান ঘটেছে। এই শক্তিকে অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশে কেউ কোন ধরণের ষড়যন্ত্র করতে পারবে না’।
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের সঞ্চালনায় এবং পাটির নীলফামারী জেলার শাখার প্রধান সমন্বয়কারী আব্দুল মজিদের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা দেন মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ন মুখ্য সংগঠক আবু সাঈদ লিওন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা প্রমুখ।
জাতীয় নাগরিক পাটির দক্ষিনাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘এই উত্তরাঞ্চলকে বলা হয় মঙ্গাপিরীত এলাকা। কিন্তু তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে নীল বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নীলফামারী সব সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ভুমিকায় ছিল। বিপরীত দিকে এই নীলফামারীর মানুষ সবসময় বঞ্চিত। আমরা আপনাদের দোওয়ার জন্য এসেছি, আমরা আপনাদের সমর্থনের জন্য এসেছি, আমরা চাই আপনারা আমাদের পাশে থেকে আমাদের হাতকে শক্তিশালী করবেন।