।। নজরুল ইসলাম তমাল ।। বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের গুরুত্ব অল্প কথায় বলে বোঝানো কঠিন। বই, সংবাদপত্র, সাময়িকী, ধারণ যন্ত্র ও সিনেমাতে আটকে নেই গণমানুষের তথ্য-বিনোদনের উপায়। প্রযুক্তির দাপটে রেডিও, টেলিভিশন এগিয়েছে অনেক, এইপথে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট, মুঠোফোনের মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নানা পদ্ধতি।
প্রত্যেকটি গণমাধ্যমই তাদের স্বতন্ত্রতা, সৃষ্টিশীলতা, প্রযুক্তিকৌশলসহ নিজস্ব ব্যবসায়িক গুরুত্বেও সমাসীন। যেমন, ইন্টারনেট ব্যবস্থায় ওয়েবসাইট নেটওয়ার্কিং জগতে এখন শীর্ষস্থানে, ইন্টারনেট এবং মোবাইলকেই ডিজিটাল মিডিয়ারূপে আখ্যায়িত করা হয় এখন। রেডিও এবং টেলিভিশন ব্রডকাস্ট মিডিয়া বা সম্প্রচার মাধ্যমরূপে বিবেচিত।
আসা যাক টেলিভিশন বা ব্রডকাস্ট মিডিয়াতেই। উনবিংশ শতাব্দির শেষের দিক থেকে এই মাধ্যমে যোগ হতে শুরু করে প্রযুক্তির ব্যবহার। টেলিভিশনে দৃশ্যমান ছবির জন্য বাড়তে থাকে ক্যামেরার গুরুত্ব। অথচ একটা সময় ওজন ও আকৃতির কারণে ক্যামেরা বহন সম্ভব ছিলনা। কিন্তু ২০০ বছরের ক্রমবিকাশে আজ সে যন্ত্রটি হাতের মুঠোয়।
মুভি ক্যামেরা সম্প্রচার সাংবাদিকতার মুল অস্ত্র। এখানে শুধু তথ্য নয়, এর সঙ্গে যুক্ত করতে হয় প্রাসঙ্গিক ফুটেজও। যারা জেলা পর্যায়ে কাজ করেন, তারা ভাল জানেন এই ক্যামেরা নামের যন্ত্রটি ছাড়া টেলিভিশনে কাজ করা সম্ভব কি না। তবে এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, টেলিভিশনে প্রচারের যোগ্য বা ব্রডকাস্ট কোয়ালিটি ক্যামেরা কি?
সাংবাদিকতা করে মাসে কটা টাকা পকেটে আসবে। নাকি শখ থেকে সম্মান, সম্মান থেকে ক্ষমতা। নাকি দেশের সেবার জন্য এই পেশায় আসছেন তারা। এমন নানা ধারণা থেকে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় হচ্ছেন যুক্ত। শুরুতেই কিনে ফেলেন পেশা টেকানোর জন্য একটা ক্যামেরা। একবারও ভাবেন না, এই যন্ত্রটি আমি কি কাজে ব্যবহার করব! যেজন্য এটি কেনা হচ্ছে তা দিয়ে কি ভাল কাজ হবে? ভাবতে হয় বাজেটের বিষয়টিও, সাধ থাকলেও অনেক সময় সাধ্যে কুলোয় না, আবার সাধ্য থাকলেও মন তাতে সায় দেয়না, কেননা কাজ চলা দিয়ে কথা। যেহেতু প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে সহায়তা দিতে চায়না, তাই বেশি দামে ক্যামেরা কিনে বড় ধরণের ঝুঁকি নেয়াটা একটু কঠিনই হয়ে পড়ে তাদের জন্য।
কেউ কেউ ভালমানের ক্যামেরা কিনে পড়েন অন্য বিপদে। এসব ক্যামেরা নিয়ে মাঠে একাকী কাজ করা অনেক কঠিন। দরকার হয় দক্ষ ক্যামেরাপার্সনের। কিন্তু প্রতিষ্ঠানতো ক্যামেরা ও ক্যামেরাপার্সন দিতে আগ্রহী নয়। তাহলে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে আর কতদিন! কিংবা অন্যের সাহায্য নিয়েই বা চলা যায় কতদিন? এসব কারণে হোম ভিডিও তৈরির জন্য হ্যান্ডিক্যামগুলোই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে তাদের কাছে। এতে ব্রডকাস্ট কোয়ালিটি না হলেও, কোন রকম চালিয়ে নেয়া ফুটেজতো পাওয়া যায়। যদিও এ ধরণের ফুটেজেই টেলিভিশনের পর্দায় নিজ নামের প্রতিবেদন সাংবাদিকের বুক ফোলায় স্বস্তির নিঃশ্বাসে!
একটি প্রতিবেদনের জন্য কতবার যোগাযোগ করতে হয় কেন্দ্রে, কাকে না বলতে হয়! এসব করতে গিয়ে প্রতিবেদনের বিষয়টাও চাপা পড়ে যায় প্রতিনিধির কষ্টকাহিনীর কাছে। তখন প্রতিবেদন নাকি প্রতিনিধি কোনটা মুখ্য হয়ে ওঠে, জানা দরকার। অনেকবার তাদের সময় শ্রম ও কষ্টের কথা বিবেচনায় নিয়ে দু একটি প্রতিবেদন অনএয়ারে যায় ঠিকই। কিন্তু সমস্যা থেকেই যায় দিনের পর দিন ধরে। বারবার তাদের বোঝানো হলেও সমস্যা, সমস্যার জায়গাতেই থেকে যায়। জেলার সংবাদকর্মীদের মাথায় ভালভাবে নেয়া উচিৎ- তথ্যের জন্য নয়, ভাল মানের ফুটেজের (ভক্সপপ+সিংকসহ) জন্যই তাদের বেশিরভাগ প্রতিবেদন অনএয়ার করা সম্ভব হয়না। এসব সমস্যা চিহ্নিত ও পরিস্থিতির উন্নয়নে তাদেরকেই এগিয়ে আসা উচিৎ, জানা-বোঝা ও আন্তরিক হওয়া উচিৎ। নিজে যা জানি এর উপরে কিছু নাই, অন্যের পরামর্শ মেনে লাভ কি, আমি জেলার নামকরা সাংবাদিক, আমার চেয়ে ভাল কেউ বুঝতে পারেনা, এতো বছর ধরে এই পেশায়, আমাকে কে কি শেখাবে। এসব ধারণা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। নইলে জেলায় সম্প্রচার সাংবাদিকতার উন্নয়ন সম্ভব হবে না। প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসা জরুরি। তাছাড়া প্রযুক্তিগত কৌশল অজ্ঞতার কারণে আমাদের সম্প্রচার মাধ্যম আন্তর্জাতিক মানের অভাবে এগোতে পারবে না। আর শুধু রাজধানী নিয়ে বাংলাদেশ নয়, ৬৪ জেলা নিয়েই বাংলাদেশ।
তারপরও যেহেতু টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করতে হলে, ঘটনা/ঘটনাস্থলের ফুটেজ দরকার। তাই এ ধরণের ক্যামেরাই একজন সংবাদকর্মীর মূল আস্থা। আগে পিছের হিসাব না করে পাঁচ আঙ্গুলবদ্ধ এই যন্ত্রটি তাকে এগিয়ে রাখে অনেক দূর। তবে এসব ক্যামেরা কেনার আগে অন্তত দু একটি বিষয় খেয়াল করা উচিৎ। যেমন- মাইক্রোফোন পোর্ট, অডিও কন্ট্রোল ব্যবস্থা, এক্সট্রা লাইট, এক্সট্রা মেমোরি কার্ড ব্যবহার এবং রেকর্ডেড ফুটেজ কম্পিউটারে নেয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি।
বাজারে আসা বেশিরভাগ হ্যান্ডিক্যামই হাই ডেফিনেশন(HD) ভিডিও রেকর্ড করতে পারে, সেক্ষেত্রে ফুটেজের কোয়ালিটি একেবারে খারাপ হবেনা সংবাদের জন্য। তবে এসব ক্যামেরায় বেশিরভাগ অপশন বিল্ট ইন থাকায় কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। জেলার সংবাদকর্মীরা ক্যমেরার কারিগরি অনেক বিষয় না জানার কারণে পড়েন নানা সমস্যায়। আবার না জেনে ম্যানুয়ালি ক্যামেরা অপারেট করতে গিয়ে নষ্ট করছেন যন্ত্রটি।
তারপরও এখন পর্যন্ত যেহেতু হ্যান্ডিক্যামই তাদের একমাত্র ভরসা। এসব ক্যামেরা দিয়েও মোটামুটি মানের ফুটেজ ধারণ করা সম্ভব। এজন্য ক্যামেরার প্রযুক্তিগত দিকগুলো সম্পর্কে শুধু ধারণা নয়, মোটামুটি বিষয়গুলো জানাটা জরুরি।
একটা ভাল ফুটেজ ধারণের প্রথম শর্ত হলো ক্যামেরা হাতে নয়, লাগবে ট্রাইপড, ট্রাইপড এবং ট্রাইপড। এরপর ছবির ফ্রেম ঠিক করার জন্য কিছু নিয়ম এবং সংবাদের বিষয়বস্তু অনুযায়ী কিছু কৌশলের মাধ্যমে দৃশ্য ধারণ।