• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
ড্রাম ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কা, নিহত ৩ সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর

ওরা সকলেই খুন হয়

।। ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ ।।

আমার মেধাবী ছাত্র অর্ণব এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ফেসবুকে খুব সরব। দেশে ক্রমাগত ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মনের কষ্টে ও ক্ষুব্ধতায় অনেকগুলো স্ট্যাটাস দিয়েছে। এসবের ছত্রে ছত্রে ওর ভেতরের ক্ষোভ ও দ্রোহ স্পষ্ট হচ্ছিল। এই অর্ণব আমাকে ফোন করল। আমি যেন এ বিষয়টি নিয়ে কাগজে লিখি। আমি ওকে বলেছিলাম। কী লাভ বলো এসব অরণ্যে রোদন করে। না মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন করতে পারছি, না সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাবানদের সক্রিয় করতে পারছি। সম্প্রতি একটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় পরিসংখ্যান ছেপেছে। তাতে দেখা গেল ধর্ষণ বিষয়ক তিনটি ধারায় গত ১৫ বছরে ৫,৫০২টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২,৮৯৮টি। আর মাত্র ৮৮টি মামলায় অভিযুক্তের সাজা হয়েছে। একই কাগজের ভেতরের পৃষ্ঠায় আরেকটি রিপোর্টে দেখা গেল এক ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত প্রভাবশালী খালাস পেয়েছে। ধর্ষিতা হওয়ার কষ্ট নিয়ে মামলা করা মেয়েটির মামলাকে মিথ্যা বলেছে আদালত। লাঞ্ছিত মেয়ে আর তার পরিবার দারুণ হতাশায় নিমজ্জিত।

এসব চলমান বাস্তবতা। এর মধ্যদিয়ে ধর্ষিতাদের মিছিল ক্রমে বড় হচ্ছে। তরুণী থেকে শিশু ধর্ষণের যেন বীভত্স উল্লাস চলছে ধর্ষকদের মধ্যে। ধর্ষকের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে কিশোর থেকে প্রৌঢ়; ছাত্র থেকে বাস ড্রাইভার-হেলপার পর্যন্ত। নির্যাতিতা ধর্ষিত হয়েও রেহাই পাচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে খুনও করা হচ্ছে। কখনো প্ররোচিত হয়ে আবার কখনো গ্লানি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করছে ধর্ষিতা ফুটফুটে শিশুটিও। ওরা নৈতিক মূল্যবোধহীন এই সমাজ-রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানিয়ে অনন্ত শান্তিলোকে চলে যাচ্ছে। যেন বলছে তোমাদের নরক তোমরা গুলজার করো, জীবন থেকে পালিয়ে তবু আমরা বাঁচি। পুরুষশাসিত সমাজে এখনো নারী অধিকার প্রশ্নটি যোগ্য অবস্থান নিতে পারেনি। এরমধ্যে সমাজে তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত নানা অস্থিরতা। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে গেছে অনেক আগেই। এই অসাম্য থেকে রেহাই নেই। প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন দুর্বৃত্ত। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে এভাবেই। সামাজিক অনুশাসনগুলো কার্যকর হতে পারছে না। জীবনের দায় সবচেয়ে বড়। মানুষ সব থেকে বেশি ভালোবাসে নিজেকে। তাই বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এত তীব্র হয়। তারপরও এই কাঁচা বয়সের কিশোরী তরুণী মেয়েরা কতটা বিপন্ন হলে জীবনের চরম সিদ্ধান্তটি নিতে পারে একাকী। আত্মহননের পথ বেছে নেয়। নাকি মূল্যবোধহীন সমাজ তাদের ঠেলে দেয় অমন মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে?

এমন নয় যে স্কুলের গণ্ডিতে থাকা অভিমানী কিশোরী মায়ের বকুনি খেয়ে অথবা বাবা লাল জামার আব্দার মেটাতে পারেনি বলে আবেগে বিধ্বস্ত হয়ে হঠাত্ আত্মহত্যা করে বসেছে। তাহলে এই অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, সেগুলো কি স্বেচ্ছামৃত্যু? না, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে পৃথিবীকে মাত্র চিনতে শেখা চপলমতি মেয়েটির চেনা জগত্টাকে বিষাক্ত করে দিয়েছিল বখাটেরা। এই বিষমুক্তির জন্য সমাজ এগিয়ে আসেনি। শক্তি আর সান্ত্বনার ছায়া নিয়ে কিশোরী আর তার পরিবারের পাশে কেউ এসে দাঁড়ায়নি। তাই নিজের এই অরক্ষিত জীবন থেকে একসময় মুক্তি পেতে চেয়েছে লাঞ্ছিত বোনেরা। একসময় চরম সিদ্ধান্তটি নেয়, আত্মহত্যা করে। কিন্তু না, এই কোমলমতি মেয়েরা কেউ নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করে না। ওরা সকলেই খুন হয়। এই খুনের দায় অভিযুক্ত বখাটেদের একার নয়, এই দায় নিতে হবে নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা সমাজের প্রত্যেককে।

জটিল যান্ত্রিক যুগে আত্মকেন্দ্রিকতা সমাজের শক্ত বুনট নড়বড়ে করে দিয়েছে। আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। চোখের সামনে ছিনতাই দস্যুতা হলেও আমরা এগিয়ে আসার সাহস দেখাচ্ছি না। পাড়ার উঠতি মাস্তান আমাদের কারো না কারো সন্তান। তার দাপটে দরোজায় খিল আঁটছি। প্রতিবাদ করতে পারছি না। মায়ের সামনে মেয়ের হাত ধরে টানছে বখাটে। মায়ের বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, পরিবার অসহায়ভাবে তাকাচ্ছে সমাজের দিকে। সমাজের মানুষ কানে তুলো গুঁজছে। চোখের পাতা বন্ধ করছে।

আত্মরক্ষায় সদাব্যস্ত সমাজের মানুষের নানা রকমফের আছে। অতি সাধারণ যারা তারা এসব অনাচারে ব্যথিত হচ্ছেন—ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে মুখ বুঁজে সব সয়ে যাচ্ছেন। নির্বাক হয়ে দেখে যাচ্ছেন। পারিবারিক শাসন আর তেমনভাবে কার্যকর থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে অভিভাবক একাধিকবার বখাটে যুবকের বিরুদ্ধে নালিশ করেছে তার বাবা-মায়ের কাছে। এরা সময়মতো পুত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বিয়োগান্ত ঘটনা হয়তো ঘটতো না। হয়তো পুত্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে ততদিনে। বাবা-মাকে থোড়াই কেয়ার করে। অথবা বাবা-মা কীর্তিমান পুত্রের গর্বে সমাজে দাপুটে অবস্থান নিয়ে থাকতে চান। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তো এভাবেই দৃশ্যমান হয়। বয়োজ্যেষ্ঠ প্রাজ্ঞ বিচক্ষণ সর্বজন শ্রদ্ধেয়রা এখন আর সমাজের পতি হন না। এখন সমাজের বিধায়ক হন ক্ষমতাসীন মানুষ। তাদের বড় অংশ সমাজ রক্ষার বদলে নিজ নিজ দল রক্ষা, পেশী স্ফীত করা এবং ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষাকে জরুরি মনে করে। তাই বখাটে উঠতি মাস্তানরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাছে প্রশ্রয় পায়। বিচার-আচারও হয় দলীয় বিবেচনায়। একারণে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতেই হয় সাধারণ মানুষকে।

সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায় অনেক ক্ষেত্রে উত্পীড়নকারী বখাটের হাত থেকে রক্ষা পেতে সরকার দলীয় অমন সমাজপতিদের কাছে অভিভাবকরা যান। সামাজিক বিচার করে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া কি কঠিন? এসব দায়িত্ব পালন তো তাদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার সময় বা ইচ্ছে তাদের কোথায়! তারা দেখিয়ে দিয়েছেন পুলিশের কাছে ডায়েরি করার পথ। এ জ্ঞান সকলেরই আছে। তাহলে সমাজপতির কাছে যাওয়া কেন! ওয়ার্ড কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেম্বার, নানা নাম-পদের জনপ্রতিনিধিরা থাকেন কেন? স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা তো প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষভাবে জনপ্রতিনিধি। এরা নিজেরা সামাজিক সংকটের মোকাবিলায় সক্রিয় থাকেন না কেন? সমাজের কাছে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে আমাদের সরাসরি প্রশ্ন, আমাদের মেয়ে-বোনদের এমন লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে কেন? অমনভাবে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হচ্ছে কেন?

কোনো মৃত্যুই তাত্ক্ষণিক ঘটনার ফল নয়। দিনের পর দিন ক্রমাগত উত্পীড়িত হয়ে, মানসিক নির্যাতনে বিপর্যস্ত হয়ে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় সন্ত্রস্ত হয়ে, ব্যক্তি ও পরিবারের অপমানে বিধ্বস্ত হয়ে কিশোরী ও তরুণী চরম হতাশায় নিপতিত হওয়ার পর একসময় আত্মহননের চেয়ে নিরাপদ আর কিছু ভাবতে পারেনি। এই হতভাগ্য মেয়েরা তাদের পরিবারকে কাঁদিয়ে, সমাজের মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষের বুকে অক্ষমতার গুরুভার চাপিয়ে দিয়ে সমাজ থেকে জীবন থেকে পালিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কখনো কখনো তো বেশ কটা দিন বা মাস পেরিয়ে যায়। এ সময়ের মধ্যে কি কেউ পাশে এসে দাঁড়াতে পারেনি? শক্তিধর বখাটেদের রাশ টেনে ধরতে পারেনি?

আমরা যারা নিজেদের প্রগতিবাদী বলে ভাবছি, তারাও এক ধরনের তত্ত্ব আর ঘোরে আটকে থেকে সমাজ শৃঙ্খলার কথা ভুলতে বসেছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের কথা উঠে আসছে। এসবের মধ্যে কতটা বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দৃশ্যমান হয়েছে, কতটা আরোপিত প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে—তা প্রতিক্রিয়া প্রকাশকারী দায়িত্বশীলরা তলিয়ে দেখে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রায়ই হতাশা প্রকাশিত হলেও এ অবস্থার উত্তরণে তেমন একটা দায়িত্ব নিয়ে কেউ এগিয়ে আসি না। হঠাত্ কখনো নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশিত হলে তোলপাড় হয় ঠিকই, কিন্তু প্রতিবিধান নিয়ে তেমন ভাবা হয় না। আমরা বিশ্বাস করি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং তাদের নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। সামান্য কিছু সংখ্যক অতি স্বাধীনতা ভোগকারীরা পরিবেশের ওপর কালিমা লেপন করছে। কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে কোনো বিধিনিষেধ আরোপেরও উপায় নেই। তথাকথিত প্রগতিশীলরা তখন রে রে করে তেড়ে আসবেন। এ ধরনের সংকট প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেরই। তারপরও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে যৌক্তিক নীতি নির্ধারণে প্রগতিশীল দায়িত্ববানদের কখনো দাঁড়াতে দেখিনি।

এমন এক বিপন্ন অবস্থার মধ্যেই যেন আমাদের বসবাস। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির সূচক ওপরে উঠছে। কিন্তু সমাজ যখন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, পাষণ্ড দুর্বৃত্তরা নানাভাবে প্রশ্রয় পেয়ে চারপাশের অন্ধকারকে আরো গাঢ় করে, তখন হতাশা বাড়বেই। আমরা দায়িত্বশীলরা সবকিছু যখন বক্তৃতার শব্দ বুননে ইতি টানি তখন দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে শেষ পর্যন্ত খুব আশাবাদী হওয়া যায় না।

লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ