• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১০ অপরাহ্ন |

“সাংবাদিক নুরুল ইসলাম সততার প্রতীক হয়ে থাকবেন সবার হৃদয়ে”

।। মো. নজরুল ইসলাম ।। না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন নীলফামারী জেলার প্রবীণ সাংবাদিক মোঃ নুরুল ইসলাম। গত শুক্রবার বেলা সাড়ে এগারটায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি পোষ্ট থেকে তাঁর মৃত্যুর সংবাদটি জানতে পারি। প্রথমে আমার কাছে এটি অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। পরে নীলফামারীর এক সহকর্মীর কাছে মোবাইল করে নিশ্চিত হলাম সত্যিই আমাদের সবাইকে ছেড়ে ইহলোক ত্যাগ করছেন বিটিভির নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি মোঃ নুরুল ইসলাম। তিনি এমন এক ভূবনের বাসিন্দা হয়েছেন যেখান থেকে আর কেউ কোন দিন ফিরে আসে না। তিনিও আর ফিরবেন না তার চীরচেনা নীলফামারী শহরে । আর বসবেন না নিজের হাতে সজানো ডালিয়া প্রেস অথবা তার নিজস্ব অফিসে । সব যেমন ছিল তেমনই থাকবে। শুধু থাকবেন না এই বরেণ্য সংবাদকর্মী। এটা ভাবতেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায় । বার বার মনে পড়ছে গুনি এই মানুষটির সাথে প্রথম সম্পর্কের সেই দিনগুলোর কথা। নুরুলভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় গত শতকের সত্তুরের দশকের শেষের দিকে। তিনি তখন কাজ করতেন উপমহাদেশের প্রাচীণতম বাংলা দৈনিক আজাদের নীলফামারী প্রতিনিধি হিসাবে। পরে অবশ্য তিনি যোগ দিয়েছিলেন দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায়। সে সময় নীলফামারী ছিল রংপুর জেলার একটি মহকুমা । তখন এখান থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করতেন মোঃ ফজলুর রহমান। আর দৈনিক সংবাদের সাথে যুক্ত ছিলেন মোঃ সামসুল ইসলাম। সেখানকার আর এক সাংবাদিক মমতাজউদ্দিন আহমদের সাথেও বহুবার কথা হয়েছে নীলফামারী বার্তা কার্যালয়ে। তবে তিনি কোন পত্রিকায় কাজ করতেন তা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। মূলতঃ এই বরেণ্য ব্যক্তিরাই সেসময় ছিলেন নীলফামারীর পরিচিত সংবাদকর্মী। এছাড়াও নীলফামারীর আরও একজন সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেনের সাথেও আমার ছিল বিশেষ ঘনিষ্ঠতা। বাংলাভিশন টেলিভিশনের রংপুর ব্যুরো প্রধান আনজারুল ইসলামের বাবা তোফাজ্জল হোসেন ছিলেন রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক কিষাণ পত্রিকার নীলফামারী প্রতিনিধি । পরে পর্যবেক্ষক নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও বের করেন তিনি। কিছুদিন প্রকাশের পর সেটির নাম পরিবর্তন করে সাপ্তাহিক নীলসাগর রাখা হয়। হয়তো এখনও অনিয়মিত ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে পত্রিকাটি। তোফাজ্জল ভাই মারা গেলে পত্রিকার মাষ্ট হেডের উপরে প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে এখনও তার নাম ছাপা হচ্ছে । দৈনিক কিষাণ পত্রিকায় নীলফামারীর অনেক সাড়া জাগানো রিপোর্ট করেছিলেন তোফাজ্জল ভাই। সৈয়দপুর থেকে কিছুদিন আমিও দৈনিক কিষাণে কাজ করেছি। পরে আমি দৈনিক আজাদ এ যোগ দেই। সেই সূত্রে তোফাজ্জল ভাই ও নুরুল ভাইয়ের সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। নীলফামারীর উল্লেখিত সংকাদকর্মীদের মধ্যে একমাত্র সামসুল ইসলাম ছাড়া অন্যরা কেউ আর বেঁচে নেই। সবার সাহচর্যে আশার সুযোগ হয়েছিল আমার। ১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তার এক অধ্যাদেশ বলে দেশের ৬৪ টি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। ফলে নীলফামারীও পায় জেলার মর্যাদা । একই সময় প্রতিটি জেলায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ রেডিও’র জন্য একজন করে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। নীলফামারী থেকে বিটিভিতে নুরুল ইসলাম ও রেডিওতে সৈয়দপুরের সিনিয়র সাংবাদি আমিনুল হক নিয়োগ পান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নুরুলভাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। বিটিভির জেলা প্রতিনিধি হিসাবেই তিনি মারা গেলেন । সাংবাদিক আমিনুল হক এখনও রেডিওর জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকতার সূত্রে প্রায়ত নুরুল ইসলামের সাথে আমার ছিল দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক। যদিও শেষের দিকে সে সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়েছিল । সড়ক দুর্ঘটনার পর তিনি আর সৈয়দপুরে আসেননি। আসলেও আমার সাথে দেখা হয়নি। তারপরও জ্যেষ্ঠতার দায়িত্ববোধ থেকে কনিষ্ঠের প্রতি তার মমত্ববোধে কোন ঘাটতি ছিল না। মাঝে-মধ্যে মোবাইলে আমাদের খোজঁখবর নিতেন। সম্ভবত আশির দশকের মাঝামাঝি কোন এক সময়(সঠিক দিন তারিখ মনে পড়ছেনা)। স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে দৈনিক সংবাদে একটি দুর্নীতির রিপোর্ট করেছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক আমিনুল হক। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সেসময়ের ক্ষমতাসীন দলের নেতারা আমিনুল হককে নীলফামারী শহরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তার সেই ক্রান্তিকালে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সাংবাদিক নুরুল ইসলাম। নীলফামারীতে নিষিদ্ধ থাকা অবস্হায় সংবাদ সংগ্রহের সূত্রে আমিনুল হক আর আমি বেশ কয়েক বার নুরুলভাইয়ের বাসায় গিয়েছি। নীলফামারী শহরে ঢোকা যাবেনা তাই মোটরসাইকেলে শহরের পুব দিক দিয়ে ঘুর পথে যেতাম নুরুলভাইয়ের বাড়িতে। সদ্য প্রকাশিত আমিনুল হকের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্হে তিনি এ বষয়টির উল্লেখ করেছেন। আশির দশকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি কয়েক মেয়াদে নুরুল ইসলাম রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন । আমার জানা মতে, নিষ্ঠার সাথে এ মানবিক দায়িত্ব পালন করে জনপদে তিনি পেয়েছিলেন বিশেষ পরিচিতি। সৈয়দপুরের অনেক দরিদ্র পরিবার নুরুলভাইয়ের মাধ্যমে রেড ক্রিসেন্টের ত্রাণ পেয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, সৈয়দপুর আমার আদি নিবাস,আমার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন এখানকর বাসিন্দা। এখানেই রয়েছে আমার নাড়িপোতা। তাই সৈয়দপুরের প্রতি রয়েছে আমার ভিন্ন মমত্ববোধ। সাংবাদিকতার সূত্রে নুরুলভাই মাঝে-মধ্যে আসতেন সৈয়দপুরে। এখানকার অন্যান্য সংবাদকর্মীদের সাথেও সদ্ভাব ছিল তার। এক্ষেত্রে সিনিয়র জুনিয়রের মাঝে কোন ভেদরেখা টানতেননা তিনি। বলতেন, সংবাদপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই সংবাদিক। ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে আমার কাছে নুরুল ভাইকে মনে হয়েছে- অত্যন্ত বেহিসেবি ও হেয়ালি একজন মানুষ। গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুগম্ভীর কোন বিষয় অতি সহজে এড়িয়ে যাওয়া বা ঠাট্টা মসকরা করার একটা প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। তার এই আচরণের কথা জানতেন তার সহকর্মীরা। নিজের জীবনকেও সিরিয়াসলি নেননি তিনি। হয়তো জীবনটাও তার কাছে ছিল একটা মস্ত বড় হেয়ালি। তাইতো বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত থেকেও পরিবারকে আর্থিক স্বচ্ছলতা দিয়ে যেতে পারেননি। অথচ জেলায় নুরুলভাইয়ের অনেক পরে সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে অনেকেই আর্থিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু নুরুলভাই সেটি পারেননি। সারা জীবন অতি সাধারণ জীবন যাপন করে গেছেন নির্লোভ এই মানুষটি। হয়তো তার নীতিবোধ, তাকে অনৈতিকতার পাঁকে নামতে দেয়নি। এজন্য অর্থ-বিত্ত্ব নাগালে আসেনি তার। কথা প্রসঙ্গে একদিন বলেছিলেন, জীবনে সেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য পাইনি। তাতে আমার কোন আক্ষেপ নেই। একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিক হিসাবে জেলাবাসীর ভালোবাসা পেয়েছি। এটিই আমার বড় প্রাপ্তী। নুরুলভাই আপনি আজ নেই- আমরাও বিশ্বাস করি, একজন নিবেদিতপ্রাণ সৎ সাংবাদিকের প্রতিকৃতি হয়ে আপনি বরেণ্য হবেন নীলফামারী তথা এই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে। আমরা যারা আপনার বয়ঃকনিষ্ঠ এখনও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত- ওপার থেকে দোওয়া করবেন আমরা যেন সাংবাদিকতায় আপনার আদর্শ অনুসরণ করে চলতে পারি। যেখানেই থাকেন ভালো থাকবেন নুরুলভাই। এবার থেকে আপনার জন্য এটাই আমাদের প্রার্থনা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সৈয়দপুর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ