সিসি নিউজ ।। নীলফামারীর জেলা সদরের চওরাবড়গাছা ইউনিয়নের নতিবাড়ি চৌরঙ্গী বাজার গ্রামে পাওয়া যাওয়া পায়ের ছাপ গুলো চিতা বাঘের নয়। ওই ছাপগুলো শেয়াল-কুকুড়, মেছো বিড়ালের। মুরগির খামারে বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকা পড়ে একটি চিতা বাঘের মৃত্যু হলেও আর কোন চিতা বাঘ নেই দলবাড়িসহ আশপাশের গ্রামে।
গত দু’দিন ধরে ইউনিয়নটিতে অনুসন্ধান পূর্বক সকল তথ্য-উপাত্য এবং পায়ের ছাপ বিশ্লেষন করে জীবিত চিতা বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এতে এলাকাবাসীর আতঙ্কিত হওয়ান কিছুই নেই। দু’দিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে বাঘের অস্তিত্ব না মেলায় বাঘ উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেছে বন বিভাগ।
রোববার বিকেলে নীলফামারী প্রেসক্লাবের সম্মেলণ কক্ষে বন বিভাগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলণে চিতা বাঘ উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন অভিযান দলের প্রধান ঢাকা বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র কর্মকর্তা রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, রংপুর সামাজিক বন বিভাগের বন্য প্রাণি জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা স্মৃতি সিংহ রায়, রাজশাহী বন্য প্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্য প্রাণি পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির, ওয়াইল্ড লাইফ রেঞ্জার সরোয়ার হোসেন খান, ঢাকার বন্য প্রাণি অপরাধ দমন ইউনিটের বন্য প্রাণি পরিদর্শক অসিম মল্লিক, নীলফামারী বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মোনায়েম, চওরাবড়গাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের বিটু, গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুব জজ প্রমুখ।
গত শুক্রবার (১৮ মার্চ) জেলা সদরের চওরাবড়গাছা ইউনিয়নের কাঞ্চনপাড়া দলবাড়ি গ্রামের অলিয়ার রহমানের মুরগির খামারে পেতে রাখা বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে মারা যায় একটি চিতা বাঘ। ওই বাঘের সঙ্গে আরো একটি চিতাবাঘ ছিল এলাকাবাসীর এমন দাবিতে বাঘ আতংক ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মাঝে। এতে বাঘবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় ৬টি গ্রামের মানুষ। খবর পেয়ে রংপুর সামাজিক বনবিভাগ, রাজশাহী বন্য প্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং ঢাকার বন্য প্রাণি অপরাধ দমন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন।
শনিবার থেকে তারা আরো একটি চিতাবাঘের অনুসন্ধান কাজ শুরু করে এসময় ঘটনাস্থল থেকে তিন কিলোমিটার দূরে নতিবাড়ি চৌরঙ্গী বাজার গ্রামে বাঘের পায়ের একাধিক ছাপ ও মলের সন্ধান পায়। সেগুলো সংগ্রহ করে অনুসন্ধান দল। এতে এলাকাবাসীর মাঝে আরো আতঙ্ক বেড়ে যায়। এদিকে পায়ের ছাপ ও মল পরীক্ষা-নিরিক্ষা শেষে অনুসন্ধান দল নিশ্চিত হয় পায়ের ছাপগুলো শেয়াল, মেছো বিড়াল এবং কুকুড়ের এবং মল গুলো শেয়ালের। ফলে এই এলাকায় চিতা বাঘের কোন অস্তিত্ব নেই। রোববার দুপুর পর্যন্ত আর কোনো বাঘের অস্তিত্ব না পেয়ে বিকেলে তারা তাদের অভিযান সমাপ্ত ঘোষনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র কর্মকর্তা রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ‘বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকে একটি চিতাবাঘ মারা যাওয়ার পর স্থানীয়দের ধারণা ওই এলাকায় আরো একটি চিতাবাঘ আছে। এমন খবরের রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা থেকে বন বিভাগের তিনটি ইউনিটের সদস্যরা শনিবার সকাল থেকে অনুসন্ধান কাজ শুরু করি। এদিন আমরা অনুসন্ধানকালে বিভিন্ন প্রাণীর পায়ের ছাপ, মল সংগ্রহ করি। পরে পরীক্ষা-নিরিক্ষায় সেগুলোতে চিতাবাঘের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। এসময়ের মধ্যে এলাকায় নতুন করে কেউ চিতাবাঘ দেখতেও পায়নি। আমরা এলাকায় মাইকিং করে জনগণকে গুজবে কান না দিতে বলেছি। এলাকাবাসীকে রাতের বেলা একা পথ চলতে নিষেধ করা হয়েছে। এর পরেও চিতাবাঘের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে আমাদের খবর দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় ভিতি কাটাতে আনছার ও ভিডিপি সদস্যদের মোতায়েন রাখার জন্য প্রশাসনকে বলা হয়েছে।’
রাজশাহী বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্য প্রাণী পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘একটি চিতা বাঘ এক দিনে ৬০ থেকে একশত কিলোমিটার পথ পারি দিতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে খামারে বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে মারা যাওয়া চিতাবাঘটি সীমান্ত পেড়িয়ে ভারত থেকে এসেছিল।’
রংপুর সামাজিক বন বিভাগের বন্য প্রাণি জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা স্মৃতি সিংহ রায় বলেন, ‘মৃত চিতা বাঘটির ওজন ছিল ৮৫ কেজি, দৈর্ঘ সাড়ে ৪ ফুট, উচ্চতা আড়াই ফুট। মৃত চিতাবাঘটির ময়নাতদন্ত শেষে নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তরে রাখা হয়েছে। সেটি রবিবার রাজশাহীতে পাঠানো হয়েছে।’ ‘‘যেভাবে এখানে চিতা বাঘের মৃত্যু হয়েছে তা সাধারণ মৃত্যু নয়; এটিকে হত্যা করা হয়েছে মন্তব্য করে স্মৃতি সিংহ রায় বলেন,“এটি একটি হত্যাকান্ড। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ এর ৩৭ ধারায় এটি দন্ডনীয় অপরাধ। ওই আইনে স্পষ্ট বলা আছে ‘কেউ যদি চিতা বাঘ হত্যা কিংবা মারলে তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদন্ড, তিন লক্ষ টাকা জরিমানা এবং উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। যেহেতু ওই মুরগির খামারে পেতে রাখা বৈদ্যুতিক ফাঁদে পরে চিতা বাঘটির মৃত্যু হয়েছে। আমরা যথাযথ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি আমার এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যে কোন খামারে বৈদ্যতিক ফাঁদ পাতা থেকে বিরত থাকবেন। এসব ফাঁদ পেতে আর কোন প্রাণী হত্যা করবেন না।’
নীলফামারী বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মোমেন বলেন,‘বৈদ্যতিক ফাঁদে চিতা বাঘ মারা যাওয়ার বিষয়ে নীলফামারী সদর থানায় একটি জিডি করা হয়েছে।’ রোববার দুপুরে দলবাড়ি গ্রামের মাজিদুল হক বলেন, ‘গ্রামে একটি চিতা বাঘের মৃত্যু এবং আরো একটি বাঘ আছে এমন খবরে গত দু’দিন থেকে আমার চরম আতঙ্কে ছিলাম পরিবার নিয়ে। এই দু’দিন বন বিভাগের লোকজন গোটা ইউনিয়ন জুড়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে মৃত বাঘের সঙ্গীটিকে ধরার। অনুসন্ধান দলসহ আমরা কোথাও আর বাঘের দেখা পায়নি।’
জাহাঙ্গীর আলম (৪০) বলেন,‘বন বিভাগের লোকজন পরীক্ষা নিরিক্ষা করে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে এলাকায় আর কোন বাঘ নেই। এতে আমাদের মনে কিছুটা আতঙ্ক কেটেছে। তবে তারা বলেছে আমরা গ্রামবাসীরা যাতে সাবধানে চলাফেরা করি।’
চওড়াবড়গাছা ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আবুল খায়ের বিটু বলেন,‘একটি চিতাবাঘ মারা যাওয়ার পর সেখানে আরো একটি চিতাবাঘ আছে এমন গুজবে এলাকায় আতংক বিরাজ করছিল। অনুসন্ধানী দল সেখানে আর কোনো বাঘ নেই বলে জানিয়েছেন। তার পরেও এলাকাবাসীকে সতর্কাবস্থায় চলচল করতে বলা হয়েছে। গুজব না ছড়াতে ও সতর্কতামুলক ব্যবস্থা নিতে মাইকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
চওড়াবড়গাছা ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আবুল খায়ের বলেন,‘একটি চিতাবাঘ মারা যাওয়ার পর সেখানে আরো একটি চিতাবাঘ আছে এমন গুজবে এলাকায় আতংক বিরাজ করছিল। অনুসন্ধানী দল সেখানে আর কোনো বাঘ নেই বলে জানিয়েছেন। তার পরেও এলাকাবাসীকে সতর্কাবস্থায় চলচল করতে বলা হয়েছে। গুজব না ছড়াতে ও সতর্কতামুলক ব্যবস্থা নিতে মাইকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
শুক্রবার সকালে চওরাবড়গাছা ইউনিয়নের দলবাড়ি গ্রামের মুরগির খামার মালিক অলিয়ার রহমান দাবি করেন বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে তার খামারে মুরগি চুরি যাচ্ছিল। অনেক সময় মুরগির মাথা ছিরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। শেয়াল মুরগি নিয়ে যাচ্ছে এমন ধারণা থেকে তিনি বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা হয়। ওই ফাঁদে আটকা পড়ে শুক্রবার ভোরে একটি চিতা বাঘ মারা যায়। এসময় আরেকটি বাঘ গর্জন দিয়ে খামার সংলগ্ন ভুট্টা ক্ষেতে চলে যেতে দেখা যায়।