• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫১ অপরাহ্ন |

সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালনে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

।।মো. আলাউদ্দিন আলী।। অনেক শংকা, অনিশ্চয়তা অতিক্রম করে সাফল্যের সাথে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল ১২ ফেব্রুয়ারী’২০২৬। ছোট খাটো কিছু ঘটনা থাকলেও এটা নির্দিধায় বলা যায় স্বাধীনতার পর এ নির্বাচনটি সুষ্ঠুতার দিক দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য মাইল ফলক হয়ে থাকবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কাঙ্খিত অনেক না পাওয়ার মনোকষ্টের মধ্যে এটা একটা বড় প্রাপ্তি হিসেবে যোগ হলো বলে বিবেচনা করা যেতেই পারে। নির্বাচনে দু’টি বড় জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। বেসরকারি ফলাফল প্রকাশের সাথে সাথে কয়েকজন উভয় জোটের পরাজিত প্রার্থী জয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কেউ জয়ী প্রার্থীর বাড়ি যেয়ে শুধু অভিন্দনই নয় একসাথে উন্নয়ন কাজে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছেন। ইতমধ্যেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি ও জয়ী জোটের নেতা তারেক রহমান বিজিত জোটের সকল দলের নেতাদের বাড়িতে যেয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ থেকে ধারণা করা যায় পরিবর্তিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। এসব খবর শুধু অভূতপূর্বই নয় রাজনৈতিক মূল্যবোধের সংস্কৃতি উন্নয়নের নির্দেশকও বটে। যারা এই মূল্যবোধের পরিচয় দিতে পারছেন তাদের সময়ের সাহসী মানুষ বলতেই হবে। নির্বাচনের ফলাফলে একটি জোট দুই তৃতীয়াংশের অধিক আসনে বিজয় লাভ করলেও একথাও বলা যায়, এ নির্বাচনে কেউই হারেনি। বরং উভয় পক্ষই জিতেছে। দেশ উন্নয়ন, জনকল্যাণের কথা চিন্তা করলে বহুদিন পর সবার সামনেই যে সুযোগ উপস্থিত হয়েছে তার চেয়ে ভাল জয় আর কী হতে পারে।
নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের কথার শুরুতে সমাজে বহুল প্রচলিত একটি কথা আছে ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবন’। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এই কথাটি ধ্রুব সত্যের মত হয়ে গেছে। কেন এমন হয়। নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দায়িত্ব কী, তা যে তিনি জানেন না বিষয়টি তেমনও নয়। তাহলে যা হয় তা হচ্ছে, সাধারণভাবে সব মানুষই পুরানো প্রথা অনুসরণ করে থাকেন। বিষয়টি যেহেতু রাষ্ট্র, সরকার ও আইন-কানুনের সাথে জড়িত সেজন্য এসব সংশ্লিষ্ট বহু ব্যক্তি একরকম প্রথা মেনে চলছেন বহুদিন ধরে। অনেক কথা বইতে লেখা থাকে বাস্তবে তার কোন প্রতিফলন দেখা যায় না। এটা এতটা ব্যাপক যে তা নিয়ে কেউ কোনদিন প্রশ্নও তোলেন না, তুললেও তা তেমন কোন গুরুত্ব পায় না। যেমন আমাদের দেশের সংবিধানে আছে দেশের মালিক জনগণ। রাষ্ট্র ও সরকারে যারা চাকুরী করেন তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। এখানে বুঝতে কোনই অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, রাষ্ট্রের মালিক যখন জনগণ তাহলে কর্মচারীদের প্রকৃত মালিক জনগণ। জনসেবার জন্যই কর্মচারী নিয়োজিত। আমাদের দেশ যখন পরাধীন ছিল তখন শাসক দেশের সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হতো। স্বাধীন দেশ, সংবিধান পাওয়ার পরও পরাধীন দেশের কর্মচারীদের সেই প্রথা, সংস্কৃতি, আচরণ অব্যাহত রয়েছে। মোটেও বদলায়নি, বরং নানা কায়দা-কৌশলে কর্মচারিরা জনগণের সাথে এমন আচার-ব্যবহার করছেন যেন তারা নিজেরা মালিক আর জনগণই উল্টো তাদের চাকর হয়ে যায়। এটা আমাদের বড় ব্যর্থতা। এত বড় ভ্রান্ত একটি সংস্কৃতি রাষ্ট্র ও সরকারি ক্ষমতার পরতে পরতে যেখানে অনুশীলন চলছে তার মধ্যে জনগণের নির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রবেশ করে প্রচলিত প্রথা মেনে তাদেরই একজন হয়ে ওঠেন এবং হতে পেরে গর্ববোধ করেন। ভুলে যান জনগণের প্রকৃত দুঃখ কষ্টের কথা। ভুলে যান জনসেবার জন্য করা শপথের কথা। তখন চলমান স্রোতে গা ভাসিয়ে বিলীন হতে থাকেন। এটাই প্রথা।
সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র মূলত: দুটি। (১) বহুমুখী কর্মকাকান্ড পরিচালনার মধ্য দিয়ে জনচাহিদা নিরূপন করা ও (২) জনচাহিদা অনুযায়ী সংসদে আইন প্রনয়ন, পাশ করতে সহায়তা করা এবং সে আইন বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা। এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে তিনি সকল কাজ করবেন। তার সকল দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য রাষ্ট্র, সরকার আর্থিক, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাজনিত সকল সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত আইনগত দেয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। তার বেতন, ভাতা ও আর্থিক সকল সুবিধা ট্যাক্স ফ্রি। তিনি জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন।

২০১৬ সালে সংশোধিত রাষ্ট্রীয় প্রটোকল বা পদমর্যাদা ক্রম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের অবস্থান ১৩ নং এ। সরকারের সিনিয়র সচিবগণের অবস্থান যেখানে আছে দুই ধাপ নীচে ১৫ নং এ।

জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সংসদ সদস্য এত বিপুল সুবিধা ও ক্ষমতার অধিকারী শুধু তার জনসেবার কাজটি যাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় সেজন্য। কিন্তু বাস্তবে কী হয়। বিগত অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন সাক্ষী দেয়। সংসদ সদস্য জাতীয় পর্যায়ে যেমন আইন প্রনয়নসহ নানাবিধ কাজে তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন না তেমনি মাঠ পর্যায়ে জনসেবা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে জনকল্যাণমূলক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন না। তারপরও প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারী ও সকল সংসদ সদস্যকে একসাথে ঢালাওভাবে একই কথা বলা যাবে না। দুই ক্ষেত্রেই সবসময় কিছু মানুষের ব্যতিক্রমধর্মী সাফল্য লক্ষ্য করা গেছে। একই আইন, কাঠামো ও অবস্থানে থেকেও কেউ কেউ ব্যতিক্রম হয়ে ওঠেন। সেই ব্যতিক্রমধর্মী মানুষদের সাফল্যের দিকটি আমাদের সামনে শিক্ষামূলক হয়ে আছে বা থাকবে। শুরুতেই তারা নিজের দায়িত্ব ও কাজের প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। তাদের কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের মূল্যবোধ, মর্যাদাবোধের প্রকাশ করতে পেরেছেন। জনকল্যাণের কথা চিন্তা করে নিজের ভবিষ্যত বিবেচনায় রেখে হীন ব্যক্তি স্বার্থ ত্যাগ করতে পেরেছেন। সেটা অনেক সাহসের কাজ। চেষ্টা করলে যে কেউ এরকম সাহস দেখাতে পারেন, এর জন্য কোন মনি, ঋষি হওয়ার প্রয়োজন হয় না। এটা নিশ্চয় মনে রাখা দরকার যে, কেউ সৎভাবে কাজ করার জন্য মন স্থির করে কাজে লেগে পড়লেন, তাতেই যে সবকিছু ভালভাবে সম্পন্ন হবে তা কিন্তু সম্ভব নয়। কারণ সৎভাবে কাজ করার জন্য মন স্থির করাটা মাত্র প্রাথমিক পর্যায়। সাফল্যের জন্য দরকার দক্ষতা। সে দক্ষতা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়। অনুশীলনে ভুল-ত্রুটি হতেই পারে তবুও হাল না ছাড়লে সেই অভিজ্ঞতা সাফল্য আনতে সাহায্য করে। তিনি হয়ে উঠতে পারেন অন্যান্য, ব্যতিক্রমধর্মী ও দৃষ্টান্ত।

প্রায়ই মানুষ তার জবাবদিহিতার কথা ভুলে যান। তখন তিনি ভুল, অন্যায় করতে করতে এক সময় বড় বিপদের মধ্যে পড়ে যান। সেসময় সবকিছু তার আয়ত্বের বাইরে চলে যায়। তখন ভেবে দুঃচিন্তা করা ও হতাশ হওয়ায় তার সামনে একমাত্র পথ হিসেবে অবশিষ্ট থাকে। প্রচলিত ধারায় আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, নির্বাচিত প্রতিনিধি অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি ভুলেই যান যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব পালন শেষে কতটা মর্যাদার সাথে দায়িত্ব থেকে বিদায় নিতে পারেন সেটিও আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজের ব্যস্ততা এত বেশি যে তার নিজের পরিবারের মানুষদের সাথেও কথা বলার সময় থাকে না, পারিবারিক দায়িত্ব পালন তো পরের কথা। আর্থিক বস্তুগত সম্পদ অর্জন বা হীন কোন অন্যায় স্বার্থের জন্য সময় নষ্ট করে যে অর্জন হবে তার চেয়েও পারিবারিক দায়িত্বহীনতা এত বেশি ক্ষতি করবে যা এক জীবনে আর অর্জন করা সম্ভব হবে না। জনগণকে অবহেলার ফলাফল অবশ্য পেতে অনেক দেরী হয় না। এর উদাহরণ আমাদের চারিদিকে চোখ মেললেই অনেক দেখা যাবে। তাহলে বুঝতে হবে প্রত্যেকটি মানুষের জবাবদিহিতা আছে। সেটি যেমন প্রাতিষ্ঠানিক জবাদিহিতা আর নিজের কাছে জবাবদিহিতা। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার বেড়াজাল থেকে আইনী ফাঁক-ফোকড় দিয়ে বের হওয়া গেলেও নিজের কাছের জবাবদিহিতা থেকে বের হওয়ার কোন পথ নেই।
ভোটের আগে যে যা চেয়েছে তেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রার্থী মন খুলে। তখন প্রতিশ্রুতি দেওযার প্রতিযোগিতাও ছিল, সেজন্য অতকিছু ভেবে বলার সময় কম ছিল। শুধু সভা বা ব্যক্তিগতভাবে নয় আনুষ্ঠানিকভাবে সব প্রার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে। সেসব কথা তাদের নিজেদের মনে থাকলো কিনা তার চেয়ে বড় কথা অনেক শ্রোতা কিন্তু ভালই মনে রেখেছেন। এখন কেউ বলবেন না এবং ভুলবেনও না। উপযুক্ত সময়ে নিশ্চয় তারা বলবেন, আলোচনা করবেন। সময় বদলেছে, এখন শুধু মনেই রাখেন না ডিজিটাল এই যুগে বক্তব্যের রেকর্ড হয়ে আছে, সময়মত সেটাও বাজবে। সুতরাং সবচেয়ে ভাল হচ্ছে- দায়িত্বের শুরুতেই এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এবিষয়টি সবারই জানা যে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় দায়িত্ব পাওয়ার মূল চাবিকাঠি জনসাধারণের কাছে। জনগণ চাইলে ওঠাতেও পারে নামাতেও পারে। শুধু জানলেই এটা পালন করা যায় না। পালন করার জন্য ধারন করার সক্ষমতা থাকতে হবে এবং তা অনুশীলন করতে হবে বিরতিহীনভাবে। সেজন্য কখনই কোন অবস্থাতেই জনযোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। জনযোগাযোগ অক্ষুন্ন রাখতে মাস, বছর ও মেয়াদকাল পর্যন্ত একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করা ও তা বাস্তবায়ন করার জন্য কর্মসূচী ঘোষনা করা প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। নানাভাবে সে কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। আলোচনা সহজ করার জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- প্রত্যেক মাসে একটি করে ইউনিয়নে খোলা মাঠে জনসাধারণের সাথে মতবিনিময় করা যেতে পারে। প্রতিনিধি নিজে উদ্যোগ গ্রহণ করে আয়োজন করতে পারেন। এরকম অনুষ্ঠানে সাধারণের মতামত যেমন পাওয়া যাবে তেমনি প্রতিনিধিও নিজের কর্মতৎপরতা বলার সুযোগ পাবেন, উত্থাপিত প্রশ্নের সঠিক উত্তর সাধারণকে জানাতে পারবেন। ফলে কোন ভুল বোঝবুঝির সুযোগ থাকবে না। যেসকল প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের আগে মুখোমুখী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে তারা নির্বাচন পরবর্তী সময়েও বাস্তবায়ন অগ্রগতি বোঝার জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। জনসাধারণের দিক থেকেও নাগরিকরা উদ্যোগ নিয়ে আয়োজন করতে পারেন। জবাবদিহিমূলক এরকম অনুষ্ঠান সবার জন্যই খুব প্রয়োজনীয়। এটা অনুশীলন করা শুরু করলে সবার অংশগ্রহণে আরও অনেক নতুন কৌশল সৃষ্টি হবে ও আরও উন্নত হবে। মানব সম্পদ উন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোন বিকল্প নেই।

মো. আলাউদ্দিন আলী
উন্নয়ন কর্মী, নীলফামারী
১৬ ফেব্রুয়ারী’২০২৬

 


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আর্কাইভ