• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৬ অপরাহ্ন |

সময় ভুলিয়ে দিয়েছে শহীদ আব্দুর রহিমকে !

।।রাইসুল ইসলাম রোমান।। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই কিছু স্মৃতি থাকে। কিছু স্মৃতি আনন্দের, কিছু গৌরবের, আর কিছু স্মৃতি রক্তে লেখা। সৈয়দপুর সরকারি কলেজেরও তেমনই একটি ইতিহাস আছে—যে ইতিহাসের প্রতিটি অক্ষরে লেগে আছে এক তরুণ শিক্ষার্থীর অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি পরিবারের আজীবনের কান্না এবং সময়ের নির্মম বিস্মৃতি। সেই নাম আব্দুর রহিম।
১৯৯৩ সাল। উচ্চ মাধ্যমিক মানবিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিনের মতো সেদিনও সাইকেলে চড়ে কলেজে এসেছিলেন। হয়তো ক্লাস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করবেন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনবেন, কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য এক নির্মম অধ্যায় লিখে রেখেছিল।
কলেজের প্রধান ফটকের সামনের ব্যস্ত সড়ক পার হওয়ার মুহূর্তে একটি দ্রুতগতির বাস তার জীবনের সমস্ত স্বপ্নকে মুহূর্তের মধ্যে থামিয়ে দেয়। রক্তাক্ত রাজপথে নিথর হয়ে পড়ে থাকে এক তরুণ শিক্ষার্থীর দেহ। আর আকাশভরা স্বপ্ন ভেঙে পড়ে তার পরিবারের ওপর।
সংবাদটি ছড়িয়ে পড়তেই গোটা কলেজে নেমে আসে শোকের ছায়া। শত শত শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়েন। মুহূর্তেই সেই শোক রূপ নেয় ক্ষোভে। উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনাকবলিত বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। শুরু হয় আন্দোলন। দাবি ওঠে দোষীদের বিচার এবং নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের ক্ষতিপূরণের।
কিন্তু আন্দোলনের উত্তাপ একসময় থেমে যায়। রাজপথ শান্ত হয়। আগুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যায় আকাশে। শুধু থেমে থাকে না একটি পরিবারের অপেক্ষা। সেই পরিবার আজও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।
তৎকালীন সময়ে কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন নজরুল ইসলাম। দুর্ঘটনার পর কলেজে কয়েকবার আব্দুর রহিমের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সহপাঠীদের চোখে তখনও অশ্রু ছিল, শিক্ষকদের কণ্ঠে ছিল বেদনা। মনে হয়েছিল, কলেজ কখনোই তার এই সন্তানকে ভুলবে না।
কিন্তু সময়ের নিজস্ব নিয়ম আছে। একের পর এক শিক্ষাবর্ষ বদলেছে। নতুন শিক্ষার্থী এসেছে, পুরোনোরা বিদায় নিয়েছে। শিক্ষক বদলেছেন, কর্মচারী বদলেছেন। ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করেছে একটি নাম, একটি ইতিহাস।
কলেজের হিসাবরক্ষক নাজমুল হুদা বলেন, “তখন কয়েকবার দোয়া মাহফিল হয়েছিল। এরপর আর কখনো কলেজের উদ্যোগে তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় কোনো অনুষ্ঠান হয়েছে বলে আমার জানা নেই।”
আজকের প্রজন্মের অনেক শিক্ষার্থীই জানে না আব্দুর রহিম কে ছিলেন। তারা প্রতিদিন সেই সড়ক দিয়ে হেঁটে যায়, যেখানে একদিন ঝরে পড়েছিল একটি তরুণ প্রাণ। তারা কলেজের আঙিনায় সময় কাটায়, অথচ জানেই না এই মাটির সঙ্গে মিশে আছে এক শিক্ষার্থীর অসমাপ্ত স্বপ্ন।
বর্তমান শিক্ষার্থী তাহসান বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আমাদের কখনো জানানো হয়নি। এমনকি অনেক প্রভাষকও হয়তো এ মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে অবগত নন।”
এই কথাগুলো যেন আরও গভীরভাবে মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া কত সহজ! তবে কলেজের কিছু পুরোনো মুখ এখনো সেই দিনের কথা ভুলতে পারেননি।
নৈশপ্রহরী রবিউল ইসলাম বলেন, “আব্দুর রহিমের শাহাদাতের ঘটনাটি আমি জানি। ঘটনাটি খুবই কষ্টের ছিল।”
অফিস সহকারী আফজাল হোসেন স্মৃতির ভাঁজ খুলে বলেন, “তার বাড়ি সম্ভবত লক্ষণপুর এলাকায়। সেদিন তিনি সাইকেলে করে কলেজে এসেছিলেন। রাস্তা পার হওয়ার সময় কলেজের সামনেই বাসের ধাক্কায় নিহত হন।”
দুর্ঘটনার পর শহীদ মিনারের পূর্ব পাশে আব্দুর রহিমের নামে একটি স্মারক ফলক স্থাপন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন তাকে স্মরণ রাখে। কিন্তু সময়ের ধুলো সেই স্মৃতিচিহ্নকেও যেন আড়াল করে দিয়েছে। আজ সেখানে খুব কম মানুষই থেমে তাকায়।
হয়তো ফলকটি নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষার্থীরা এই ক্যাম্পাসে গিয়ে আব্দুর রহিমের স্মারক ফলকে বসে আড্ডা দেয়। তার মর্মান্তিক ইতিহাস কেউ জানন না। তবে কলেজের পুরোনো গাছগুলো এখনো শুনে আঃ রহিমের বাচার জন্য আকুতি ভড়া চিৎকার। সেই বিকেলের কান্নার শব্দ। হয়তো বাতাস এখনো বয়ে আনে সহপাঠীদের আর্তনাদ।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস শুধু ভবন, ফলাফল বা সাফল্যের নয়; তার ইতিহাস গড়ে ওঠে তার সন্তানদের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং স্মৃতিকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে।
প্রশ্ন থেকেই যায়—যে কলেজের সামনে একজন শিক্ষার্থীর জীবন অকালে ঝরে গেল, সেই কলেজ কি অন্তত বছরে একদিন তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করতে পারে না? নতুন প্রজন্মকে কি জানানো যায় না, এই ক্যাম্পাসের ইতিহাসে এক তরুণ শিক্ষার্থীর রক্তমাখা একটি অধ্যায় রয়েছে?
আব্দুর রহিম আর কোনোদিন ক্লাসে ফিরবেন না। তার হাতে আর বই ধরা হবে না। পরীক্ষার খাতায় আর লেখা হবে না তার নাম। কিন্তু যদি সৈয়দপুর সরকারি কলেজের প্রতিটি শিক্ষার্থী তার কথা জানে, যদি প্রতি বছর একবার হলেও তার জন্য দোয়া করা হয়, যদি তার স্মৃতিকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করা হয়—তবে হয়তো একটি শহীদ শিক্ষার্থীর আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আর্কাইভ