সিসি নিউজ: বাংলাদেশে খুব দ্রুত নিষিদ্ধ হতে পারে জামায়াত-শিবির। নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাদের শীর্ষপর্যায়ের নেতারাও। বিশ্বের অন্যতম সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে শিবিরের নাম উঠে আসার পর থেকে শিবিরের সঙ্গে জামায়াতেরও সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইএইচএসও’এর তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ দশ অস্ত্রধারীগ্রুপের মধ্যে শিবিরের নাম উঠে আসে। এর পূর্বে জামায়াত নানা অভিযোগে ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পাকিস্তান সরকার ও বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়ে দুবার নিষিদ্ধ করা হয়।
সূত্র জানায়, জঙ্গি কানেকশন, অস্ত্রধারী, জঙ্গি অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও দেশে সহিংসতা সৃষ্টি নানা অভিযোগে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত স্বাধীনতাবিরোধী দলটির সব ধরনের তত্পরতা যে কোনো সময় নিষিদ্ধ করা হতে পারে। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে জামায়াত এখন কিছুটা ব্যস্ত সময় কাটালেও বিষয়টি নিয়ে তাদের নেতাকর্মীরা নতুন করে বিপাকে পড়েছেন। সামনের দিনগুলোতে নিষিদ্ধের আশঙ্কায় জামায়াতকে দেশি-বিদেশি আরও চাপের মুখে পড়তে হবে— এ বিষয়টিও তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।
জামায়াত-শিবির এমনিতেই দেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে তাদের সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের দাবি করে আসছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দেশের সুন্নি মতাদর্শভিত্তিক ইসলামী দলগুলোও জামায়াত-শিবিরকে ইসলাম বিকৃতিকারী ও জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধের দাবি করছে। এ অবস্থায় বিশ্বের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নাম উঠে আসায় নিজেদের ভবিষ্যত্ নিয়ে জামায়াত-শিবির নেতারা চরম উদ্বিগ্ন। বিষয়টি নিয়ে তাদের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা গত দুদিনে একাধিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। নিষিদ্ধ করা হলে তারা কিভাবে নিজেদের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখবে এবং নিজেদের অর্থসম্পদ রক্ষা করবে এসব বিষয় নিয়ে করণীয় নির্ধারণে বিভিন্ন কৌশল ঠিক করছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, জামায়াত ও শিবিরের বিরুদ্ধে জঙ্গি কানেকশন, জঙ্গি তত্পরতা, জঙ্গি অর্থায়নসহ নানা বিষয় খতিয়ে দেখছে সরকার। কোনো কারণে তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে তাহলে তাদের বিপুল সংখ্যক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়বে। বন্ধ হয়ে যাবে বায়তুল মাল নামে অর্থ সংগ্রহের পথও। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হলে একইসঙ্গে তাদের সমর্থিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সব কিছুই বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়তে পারে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত ও শিবির কোটি কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করে আসছে। সেই সঙ্গে জামায়াতের শীর্ষপর্যায়ের নেতাকর্মীর নামে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন, ইসলামী হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ-হাসপাতাল, ইবনে সিনা ফার্মেসিসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ডেভেলপার কোম্পানি, মিডিয়া এবং বিপুল সংখ্যক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বড় ধরনের অর্থ তহবিল জোগান দেয়া হয় জামায়াত ও শিবিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। এসব তহবিল থেকেই তাদের নেতাকর্মীরা দশম সংসদ নির্বাচনের আগে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সহিংস কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ব্যাপক নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, দেশের সংবিধানবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের করা একটি মামলায় হাইকোর্টের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। বিষয়টি এখন উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। উচ্চ আদালতে বিষয়টির আপিল নিষ্পত্তি হলে এবং রায় পুনর্বহাল থাকলে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নাম নিশানা মুছে যাবে। একইসঙ্গে তাদের সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হতে পারে।
জানা গেছে, আদালতের রায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পরপরই উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে জামায়াতের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের আবেদন করা হয়। নিবন্ধন বাতিলের রায়ের সঙ্গে সঙ্গেই দলটির নিষিদ্ধের বিষয়টিও নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আলকায়েদা, মিসরের ব্রাদারহুড, পাকিস্তানের লস্করে তৈয়্যবা ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), মিয়ানমারের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জামায়াত ও শিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মিসরে যখন ব্রাদারহুডের সরকার, তখন তাদের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা এদেশের যুদ্ধপরাধের বিচার থেকে জামায়াতের শীর্ষনেতাদের রক্ষায় চেষ্টা করেছিল। এমনকি ব্রাদারহুড সরকারের মাধ্যমে তুরস্ক সরকারের একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম বাংলাদেশে এসে জামায়াতের পক্ষে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। হঠাত্ করে মিসরে রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে ব্রাদারহুডের পতন এবং দলটিকে নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াত-শিবির আনুষ্ঠানিকভাবে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে একাধিক বিবৃতি দেয়। ব্রাদারহুডের পক্ষে এদেশে জনমত সৃষ্টির চেষ্টাও করে জামায়াত নেতৃত্ব।
অভিযোগ আছে, আন্তর্জাতিক সংগঠন আল কায়েদার সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের যোগাযোগ রয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় আল জাওয়াহিরি অডিওবার্তার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এক শিবির কর্মীকে গ্রেফতারের পর আল কায়েদার সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
একইভাবে পাকিস্তান জামায়াতের মাধ্যমে সেদেশের সন্ত্রাসী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবানা ই পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে বাংলাদেশের জামায়াতের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। যে কারণে জামায়াতের শীর্ষনেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার পর টিটিপি বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার প্রকাশ্য হুমকি দেয়। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি টিটিপির সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের যে শান্তি আলোচনা চলছে টিটিপির সেই কমিটিতে পাকিস্তান জামায়াতের দুই শীর্ষনেতাকে রাখা হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের একাধিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গেও জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া দেশে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাতুল মোজাহেদিন, হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহরিরের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বিবৃতিতে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে এসব কিছুই সরকারি ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, জামায়াত ও শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে তাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি কানেকশন, জঙ্গি অর্থায়নসহ নানা চক্রান্ত করা হচ্ছে।