আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সময় যত বাড়ছে মালয়েশীয়ান এয়ার লাইন্সের নিখোঁজ হওয়া বিমানটি নিয়ে রহস্য তত ঘনীভূত হচ্ছে। বিমানটি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর ৩৬ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখনো অনেক প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার আগমুহূর্তে চীনের দিকে না গিয়ে মালয়েশিয়ায় ফিরে আসার চেষ্টা করেছিল বলেও মনে করা হচ্ছে।
মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানটি ফিরে আসার চেষ্টা করেছিল- এমন ধারণা সৃষ্টি হওয়ার কারণে তারা অনসন্ধানের ক্ষেত্র বাড়িয়েছে।
আলজাজিরার স্কট হেলডার কুয়ালামপুর থেকে জানান, এখন মালয়েশিয়া উপকূলেও অনসন্ধান চালানো হবে।
তিনি বলেন, বিমানটির মালয়েশিয়ার দিকে ফিরে আসার খবরটিতে আরো কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পাইলট যদি ফিরে আসার চেষ্টা করে থাকেন, তবে তিনি কেন কন্ট্রোল প্যানেলকে আগে জানাবেন না। কর্মকর্তারা ওই ধরনের কোনো কল পাননি বলে জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানকারীরা রাডারের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের পাশাপাশি কোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা সন্দেহভাজনদের ছবি খতিয়ে দেখছেন। বিমানটির খোঁজ পেতে অনুসন্ধান এলাকা আরো সম্প্রসারণ করেছে উদ্ধারকারী দল। প্রায় ২২টি বিমান আর ৪০টি জাহাজ বিমানটি উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়া সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল জুলকেফি জিন। এখনও পর্যন্ত বিমানটির কোনো ধ্বংসাবশেষের খোঁজ মেলেনি।
‘ভুয়া’ পরিচয়ে ৪ যাত্রী
মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা ‘সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ’ বিষয়টিরই আশঙ্কা করছেন। ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে চার যাত্রী ওই বিমানে উঠেছিলেন- এমন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তও শুরু করেছেন দেশটির গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এদিকে দীর্ঘ সময়েও বিমানের খোঁজ না মেলায় যাত্রীদের উদ্বিগ্ন স্বজনেরা কর্তৃপক্ষকে দুষছেন বলে রয়টার্সের খবরে জানানো হয়েছে। বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজটি সাগরে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে শনিবার ধারণা করা হলেও রোববার সকালে মালয়েশীয় কর্মকর্তারা জানান, বিমানের ধ্বংসাবশেষের কোনো চিহ্ন উদ্ধারকারীরা পাননি। কর্তৃপক্ষ বলছে, যোগাযোগ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন আবহাওয়া ছিল যথেষ্ট ভালো। ‘উধাও’ হওয়ার আগে বিমানটি থেকে কোনো বিপদ সংকেতও পাঠানো হয়নি। ভিয়েতনামের কাছে সাগরে শনিবার দীর্ঘ তেলের স্তর দেখা গেছে বলে খবর পাওয়া গেলেও তা মালয়েশীয় বিমান থেকে পড়েছে কি না- তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিমানটি সন্ত্রাসী হামলা বা ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে- এমন কোনো স্পষ্ট ইংগিতও পাওয়া যায়নি। তবে দুই ইউরোপীয় নাগরিকসহ অন্তত চারজনের ‘ভুয়া’ পরিচয় ব্যবহার করে ফাইট এমএইচ৩৭০-এ ওঠার খবরে দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের দেয়া যাত্রী তালিকায় অস্ট্রিয়ার নাগরিক ক্রিস্টিয়ান কোজেল ও ইতালির লুইজি মারাদলদি নামের দুজনের তথ্য থাকলেও তারা আদৌ ওই বিমানে ছিলেন না বলে জানিয়েছে দেশ দুটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অস্ট্রিয়ার পুলিশের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ক্রিস্টিয়ান কোজেল নিরাপদে তার বাড়িতেই রয়েছেন। তার যে পাসপোর্টের তথ্য মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স দিয়েছে সেটি দুই বছর আগে থাইল্যান্ড ভ্রমণের সময় খোয়া যায়।
আর লুইজি মারাদলদির মা রেনেটা লুচ্চি পুলিশকে জানিয়েছেন, তার মেয়েও ওই বিমানে ছিলেন না। তিনিও তার পাসপোর্টটি গত বছর থাইল্যান্ডে হারিয়ে ফেলেন। এটা সন্ত্রাসী হামলার কোনো ঘটনা বলে সন্দেহ করছেন কি-না জানতে চাইলে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেন, ‘আমরা সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছি। তবে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না’।
মালয়েশিয়ার পরিবহন ও প্রতিরা মন্ত্রী হিশামুদ্দিনকে উদ্ধৃত করে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই দুই জন ছাড়াও আরো দুই যাত্রীর তথ্য যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে। ‘আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে চারটি নামই দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক গোযেন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও সাহায্য চাওয়া হয়েছে’।
নিখোঁজ বিমানের তদন্তে এফবিআই: নিখোঁজ বিমানটি খুঁজে পেতে মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই সহযোগিতা করছে। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বিমানে চার যাত্রী ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে যাত্রা করছিলেন। তাদের পরিচয় জানতে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।
বান কি-মুনের সমবেদনা
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি-মুন শনিবার রাতে মালয়েশিয়ার নিখোঁজ বিমান যাত্রী ও ক্রুদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তার শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। জাতিসংঘ মুখপাত্রের দফতর টুইটারে পোস্ট করা এক বার্তায় বলা হয়, মালয়েশীয় বিমান দুর্ঘটনায় এত বেশি লোকের মৃত্যুতে বান কি-মুন গভীরভাবে শোক-সন্তপ্ত। বার্তায় বলা হয়, ‘তিনি সকল শোকার্ত পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন।’
মালয়েশীয় এয়ারলাইন্সের এমএইচ৩৭০ ফাইটটি শনিবার বিমানটি মোট ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে বেইজিং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। আরোহীদের মধ্যে ১৫৩ জন চীনা, ৩৮ জন মালয়েশীয়, ৭ জন ইন্দোনেশীয় এবং অস্ট্রেলিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র হল্যান্ডও ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশের বেশ কিছু নাগরিক ছিলেন।
সূত্র : বিবিসি ও আলজাজিরা।