সিএনজি চলছে দ্রুত গতিতে। জ্যামের কারণে মাঝে মাঝে থেমে যায়, আবার কখনো ধীরগতিতে চলে। ভেতরে ওরা গল্পে এতোই বিভোর যে, কোনদিকে খেয়াল নেই। আচমকা জোরে ব্রেক কষার সঙ্গে সঙ্গে চোট লাগে চিঠির হাত দুটোতে। ব্যাথায় উফ করে ওঠে চিঠি। ওর ব্যাথাতুর হাত দুটো আলতো করে নিজের হাতে পুরে নেয় উষ্ণ। বলে, বেশ লেগেছে?
উত্তরের তোয়াক্কা না করে আলতো চাপ দিতে দিতে লাবন্যময় মায়াবী কন্ঠে বলে, আমি ম্যাসেজ করে দিচ্ছি দেখবে ঠিক হয়ে যাবে।
চিঠির মুখে কোন কথা নেই। ঠোঁটে মৌন দুষ্ট হাসি, চোখে মদিরতার ভাষা, মনে এক বিন্দু মিষ্টি রোদ। আর উষ্ণ ছল করে চিঠির কোমল দুটো হাতে আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা এক চিলতে লাবণ্যময় মিষ্টি আদর।
চিঠির ভেতরে ভালো লাগার মায়াবী সুর। উষ্ণের দিকে সরাসরি তাকাতে পারে না, চোরাচোখে দেখে নেয় বার কয়েক। উষ্ণের মাথায় উড়ন্ত চুল, চোখে-মুখে উপচে পড়া খুশির মৌনবান, ঠোঁটে এক টুকরো চোরা হাসি । আর শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে অদ্ভুত অচিন গন্ধ। যদিও গন্ধটা পুরুষালী তথাপি অন্যরকম। মনে হচ্ছে সদ্য প্রস্ফূটিত কোন অচেনা নতুন ফুলের মায়াবী গন্ধ।
নিবিড় ভালোলাগার আবেশে উষ্ণও নিরব। ওর চনমনে চাতক চোখ দুটো বক্রভাবে নিক্ষেপ করে চিঠির দিকে। সে চোখের উদীপ্ত আলোতে চিঠির ভেতরে ভালোলাগার মিছিল। হৃদয়ের গভীরে কাঁপা কাঁপা উচ্ছসিত সুর। আর বুকের মাঝে দুরন্ত শিরশিরানি।
কখন যে পথ ফুরিয়ে আসে! ব্রেক কষার সঙ্গে সঙ্গে সুখমাখা সুন্দর স্বপ্নটুকু ভেঙ্গে যায়। এতোক্ষণে যেন কোন স্বর্গীয় উদ্যান থেকে মর্তে নেমে এলো । ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস ! কেন ত্বরা করে ফুরিয়ে এলো পথটা ! কেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো না এ পথ! অনন্তকাল যদি শেষ না হতো এ পথ!
রাতে বিছানায় শুয়ে আছে চিঠি। মনের ভেতরে একখন্ড ভালোলাগা বাউরি বাতাস গভীর থেকে গভীর করে তুলছে। উদ্বেলিত করছে হৃদয়কে। আচমকা অন্ধকারে ছেয়ে গেল নক্ষত্রের এক চিলতে আলো। প্রতিদিনের ব্যবহৃত অসহিষ্ণু হাতটা এসে গায়ে পড়ে। সুন্দর সুখমাখা স্বর্গীয় অনুভূতিটুকু মুখ লুকোয় কালো নেকাবে। স্মৃতির পাতায় লেখাগুলো বড় বড় হয়ে ভেসে উঠে চোখের সামনে।
কোন এক শুভক্ষণে এই হাত দিয়ে মালা পরিয়েছিল চিঠির গলায়। আজ তা প্রাণহীন লোহার শেকল হয়ে আটকে রেখেছে চিঠির উচ্ছল জীবনটাকে। এই হাত দিয়ে কতবার চপেটাঘাত করেছে চিঠির নরম গায়ে! আর ঠোঁটের পাতায় উচ্চারিত অকথ্য বাক্য দ্বারা মানসিক আঘাত করেছে শতবার। আরো বীভৎস সব স্মৃতি ভাসে। চোখ বন্ধ করে চিঠি। আর ভাবতে চায় না কালো দিনগুলো, কালো মুহুর্তগুলো। নিশিরাতে অসহায় পাখির মতো কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পার করে এসেছে অনেকগুলো বছর। চিঠি উপেক্ষা করতে পারেনি সমাজের খোরা নিয়মগুলো। কিন্ত আজ কেন যেন প্রতিবাদী চাবুক মারতে ইচ্ছে করছে সমাজের নির্মম গালে, উপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে নীতি বিবর্জিত লোকটাকে, ইচ্ছে করছে ভেঙে ফেলতে ধর্মীয় শেকলের মিথ্যা বাঁধনটা।
ভোরের আলোয় প্রাত্যহিক কাজে জড়িয়ে পড়লেও এক খন্ড নক্ষত্রের আলো শুভ্র হাসির যোগান দেয় মনের ভেতরে। বিলাসি স্বপ্ন ভেসে উঠে ওর চোখে-মুখে-ঠোঁটে-শরীরে।
আবার কোন এক সূর্যডোবা বিকেলের জন্য আকূল প্রতীক্ষায় চিঠি। ওর ভেতরে জানান দেয় যে, উষ্ণের ভেতরে একই সুর, একই গান। অল্প সময়ের মধ্যে উষ্ণের মনের পাতাটা পড়ে ফেলেছে চিঠি। উষ্ণ যদিও প্রকাশ বিমুখ তবুও ওর চোখ-মুখ সব বলে দিয়েছে। ঠোঁটের হাসি দিয়ে ব্যাথার গোপন গভীর গহ্বরটি লুকোতে যেয়েও ব্যর্থ হয় উষ্ণ। আর কেউ না বুঝলেও চিঠির চোখে ফাঁকি দিতে পারেনি। হয়তো সে কারণে প্রকৃতগতভাবেই আপনা আপনি মিলে গেছে চিঠির মনের সাথে। কারণ চিঠির ভেতরেও একটা গোপন গভীর ব্যাথাতুর পাখি বাস করে। আর সে পাখিটাকে গোপন রাখার জন্য হাস্যোজ্জ্বল মুখটাই উপস্থাপন করে সকলের সামনে। তবে উষ্ণের অক্ষম হৃদয় সেটা ধারণ করতে বা বুঝতে অক্ষম।
অপেক্ষর পালা শেষে আবার দেখা হয় কোন এক লাবন্যময় বিকেলে গোধূলিতলে। উন্মুখ মনের ভেতরে যে না বলা নতুন দ্বীপের উর্ণনাভ জালের গল্পটা আটকে ছিল সেটা প্রকাশিত হয়ে যায় দুটি মনের অজান্তেই। ভালবাসার ফ্রেমে বাঁধা পড়ে মানব যুগল। চিঠি আর উষ্ণের মাঝখানের ব্যরিকেডটা ভেঙে যায়। অবাধে নীল আকাশে ডানামেলে ওরা উড়ছে ভালোলাগার দুর্বার গতিতে।
ক্ষণিক সময়ের মধ্যে দেওয়াল তুলে ধরে বাস্তবতা। কোন এক নির্মম বিকেলে ওদের দেখা হয় এয়ারপোর্টে । মুখোমুখি বসে চিঠির দুটো হাত উষ্ণের হাতের উপরে। চিটির ভেতরে অভিমানি রাগ আজ নেই। উষ্ণের ঠোঁটে আলতো ছোঁয়ে চিঠি বলে, উষ্ণ তোমাকে অনেকবার বলেছি তুমি অভিমানি, তুমি উদাসি, তুমি আমাকে ভুলে যাবে। ওসব ছিল আমার অভিমানি প্রকাশ। আজ সত্যি বলছি তুমি কখনো আমাকে ভুলতে পারবে না।
উষ্ণের চোখদুটো ছল ছল! আর ঠোঁট দুটো কাঁপছে! চিঠির হাত দুটো শক্ত করে ধরে কি যেন বলতে যেয়ে থেমে য়ায় । হাত দুটো শূন্য । ততক্ষণে প্লেনটা মিশে গেছে নীল আকাশে। কখন যে ফুরিয়ে গেছে বিকেলটা। শুধু বুকের ভেতর ভালবাসাটুকু অবশিষ্ট আছে। গোধূলিতলে দাঁড়িয়ে আহত পাখির মতো চোখ তুলে চেয়ে আছে শূন্য থেকে শূন্যে বহুদূরে।