• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৮ অপরাহ্ন |

পেটের দায়ে দুই স্ত্রীকে বিপথে

trafficker02ঢাকা: পিরোজপুরের দরিদ্র দিন মজুর মো. আব্দুর রহিম শেখ। তবে বিয়ে করেছেন দুইটি। সামান্য আয়ে সংসার আর চলছিল না। ভাগ্য ফেরাতে ২০০৩ সালে ঢাকায় এসে শুরু করেন ট্রাকের হেলপারির কাজ। তারপরও দু’বেলা খাবার জোটানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।

২০০৮ সালে আব্দুর রহিমের সঙ্গে পরিচয় হয় হুমায়ুনের সঙ্গে। তিনি একজন জাল টাকার কারিগর। এই বিদ্যা শিখে নেয়ার পর দুই স্ত্রীকে ঢাকায় আনেন আব্দুর রহিম। তাদের লাগিয়ে দেন জাল টাকা তৈরির কাজে।

এই কারবার করে ধীরে ধীরে ভাগ্য ফিরতে শুরু করলো। রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে নিলেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। জাল টাকা তৈরি ও সরবরাহ করে রহিমের ভাগ্য ফিরছিল, স্বপ্ন দেখছিলেন বিত্তবান হওয়ার। কিন্তু বিধিবাম! কোটি টাকার জাল নোটসহ ধরা পড়লেন র‌্যাবের হাতে।

রোববার ভোরে বনশ্রীতে ভাড়ায় নেয়া বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাট থেকে আব্দুর রহিমের প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মোসাম্মৎ রুবিনা খাতুনকেও র‌্যাব আটক করে। সেই সঙ্গে আটক করা হয় রহিমের দুই সহযোগী মোহাম্মদ আসাদ ও মোহাম্মদ তাজিমকেও।

রহিম র‌্যাবকে জানিয়েছেন, রমজানের ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা তৈরিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন রহিম। শুধু স্ত্রীদেরই নয় গ্রাম থেকে নিকটাত্মীয়দেরও নিয়ে এসেছেন জাল টাকা তৈরি ও সরবরাহের জন্য। যে উপকরণ র‌্যাবের অভিযানে রহিমের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তা দিয়ে আরো ১০ কোটি টাকার জাল নোট তৈরি করা সম্ভব।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছেন, আব্দুর রহিম শেখ ২০০৩ সালে পিরোজপুর থেকে ঢাকায় এসে তেজগাঁওয়ে ট্রাক স্ট্যান্ডে হেলপারির (কুলি) কাজ শুরু করে। এরপর ২০০৮ সালে অসাধু জালটাকা তৈরি চক্রের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই চক্রটির মূলহোতা হুমায়ুন মোহাম্মদপুরে জাল টাকা তৈরি করতো। আব্দুর রহিম ওই চক্রের কাছ থেকে জাল টাকা সংগ্রহ করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করতো।

ওই চক্রের মূলহোতা হুমায়ুনের আস্থা অর্জন করে রহিম জালটাকা তৈরির সব ধরনের কারিগরী বিদ্যা হাতে কলমে শিখে নিজেই এই ব্যবসা শুরু করেন বলেও জানান মুফতি মাহমুদ।

টাকা তৈরির কৌশল সম্পর্কে রহিম র‌্যাবকে জানিয়েছে, টাকা তৈরির জন্য প্রথমে টিস্যু কাগজের এক পাশে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি স্ক্রিনের নিচে রেখে গাম দিয়ে ছাপ দেয়া হয়। এরপর ৫০০ ও ১০০০ লেখা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের ছাপ দেয়ার পর অপর একটি টিস্যু পেপার নিয়ে ফয়েল পেপার থেকে টাকার পরিমাপ অনুযায়ী নিরাপত্তা সুতা কাটা হতো। সুতা কাটার পর বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি জলছাপ দেয়া টিস্যু পেপারের সঙ্গে গাম দিয়ে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। এভাবে টিস্যু পেপার প্রস্তুত করে বিশেষ ডটকালার প্রিন্টারের মাধ্যমে ল্যাপটপে সেভ করা টাকার ছাপ অনুযায়ী প্রিন্ট করা হয়।

রহিম জাল টাকায় ব্যবহৃত উপকরণ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করতেন জানিয়ে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘সে জালটাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত টিস্যু কাগজ ঢাকার বাবু বাজার, টাকার ভেতরের নিরাপত্তা সুতার ফয়েল চকবাজার, স্ক্রিন ও বোর্ড মালিটোলা, রেডোসার কেমিক্যাল মালিটোলা ও আইপিআই প্রিন্টার কালি পল্টন থেকে সংগ্রহ করতো।’

তিনি জানান, এই চক্র দেশীয় জাল টাকা ছাপানোর পাশাপাশি ঈদের পর থেকে ভারতীয় জাল রুপি ছাপানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল। এরই মধ্যে চক্রটি ভারতীয় রুপিতে নিরাপত্তা সুতা হিসেবে ব্যবহৃত ফয়েল মজুদ করে, যা র‌্যাবের অভিযানে উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাবের অভিযানে- ১১টি টাকা তৈরির স্ক্রিন, তিনটি বোর্ড, দুইটি বিশেষ ডটকালার প্রিন্টার, দুইটি ল্যাপটপ, চার রোল টাকার ভেতরের নিরাপত্তা সুতার ফয়েল, দুই কৌটা টাকার জলছাপে ব্যবহৃত আইপিআই প্রিন্ট্রিং কালি, ২০০টি প্রিন্টারের কার্টিজ, একটি বোতল রেডোসার ক্যামিক্যাল, ৮ রিম টাকা তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ, একটি টাকা স্ক্যানার, একটি লেমিনেটিং মেশিন এবং দুইটি টাকা কাটিং গ্লাস উদ্ধার করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ