ঢাকা: ১৫ জুন ২০১৫, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ। প্রতিদিনকার মতো সেদিনও রোগী আর স্বজনদের ভিড়। এরমধ্যেই হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন এক নারী। একই সময় আরেক নারীকে ছুটে পালিয়ে যেতে দেখা গেল। চিৎকার করে ওঠা মহিলাটি তার সোনার চেইন ছিনতাইয়ের কথা বলতেই সাধারণ মানুষ ধরে ফেললেন ছুটতে থাকা ওই নারীকে। কিন্তু তল্লাশী করে তার কাছে কোথাও সোনার চেইন পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল তখনই যখন তার পেট ওয়াশ করা হল। চেইন ছিনতাই করেই গিলে ফেলেছিলেন বিলকিস বেগম (৩৫) নামে ওই নারী ছিনতাইকারী।
শুধু ছিনতাই-ই নয়, বর্তমানে খুন, মাদক পাচার, জাল টাকা, নারী-শিশু পাচার, ব্ল্যাকমেইল, গাড়ি ছিনতাই, অপহরণ, অজ্ঞান পার্টিসহ হেন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না কিংবা নারীরা সম্পৃক্ত হচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধ জগতে নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারের পুরুষ সদস্যটির প্ররোচনা ও চাপ, অর্থ লিপ্সা, বিলাসিতা, নিরাপত্তাহীনতা ও দারিদ্র্য অন্যতম।
এছাড়াও নারী অপরাধীদের একটি অংশের উত্থান ঘটেছে পতিতাপল্লী থেকে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পতিতা পল্লী উচ্ছেদের পর ভাসমান পতিতাদের একটি অংশও জড়িয়ে পড়ছে নানামুখী অপরাধের সঙ্গে।
আবার অপরাধের সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ততা বিষয়ক বেশ কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়- বাবা, স্বামী, ভাই কিংবা পরিবারের অন্য কোনো পুরুষ সদস্যের হাত ধরে অপরাধ জগতে পা রাখছেন নারীরা। মূলত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেই পরিবারের পুরুষ অপরাধীরা তাদের এ জগতে টেনে আনছেন।
গত বৃহস্পতিবার গাইবান্ধায় ইয়াবাসহ আটক করা হয় আশরাফুল ইসলাম (৪৮) এবং তার মেয়ে আসমা বেগমকে (২৭)। আশরাফুল পুলিশকে জানান, তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়েই মাদক ব্যবসা করেন।
গত শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের ৬ সদস্যকে আটক করে র্যাব। এই চক্রের দুই নারী সদস্য প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধনী পুরুষদের ফ্ল্যাটে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতো। এক পর্যায়ে দলের পুরুষ সদস্যরা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে হানা দিত সেই ফ্ল্যাটে। পরে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিত মোটা অঙ্কের টাকা।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে সোনার দোকানে ডাকাতির ঘটনায় আটক করা হয় ৪ নারীকে; যারা বোমা বানানোর কাজে বিশেষ পারদর্শী। এরা প্রত্যেকেই তাদের স্বামীদের ডাকাতির কাজে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন। এদের মধ্যে গ্রেফতার হওয়া জুলেখা বেগম (৩১) ও খোরশেদা আক্তার (৩০) ছিলেন ডাকাত মনিরের স্ত্রী এবং হাসিনা বেগম (৩৪) ছিলেন ডাকাত আবুল কালামের স্ত্রী। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া আরেক নারী রুমি বেগম ছিলেন ডাকাতদের সোর্স।
রাজধানীতে গাড়ি ছিনতাইকারী বেশ কয়েকটি চক্রের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মোরশেদা আক্তার প্রিয়ার চক্রটি। প্রিয়া শুধু গাড়ি ছিনতাই করেই ক্ষান্ত হন না, গাড়ি চালক কিংবা এর মালিককে ওই গাড়ির চাকাতেই পিষ্ট করে হত্যা করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে নিজ প্রেমিক নাটোরের যুবদল নেতা জিয়াউল হক সেন্টু হত্যারও অভিযোগ আছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে তাকে আটক করে ডিবি পুলিশ।
শুধু যে নিম্নবিত্ত পরিবারের অশিক্ষিত নারীরাই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তা নয়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক নারীও অপরাধ জগতে পা বাড়াচ্ছেন। জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মজিদ জানান, গত বছর যৌনাঙ্গে প্রায় ৮শ পিস ইয়াবা ট্যবলেট বহনকারী এক নারীকে আটক করা হয়েছিল যিনি চট্টগ্রামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী। আটকের পর তিনি পুলিশের কাছে স্বীকার করেন তার মতো অনেক ছাত্রীই মাদক বহনের কাজ করছে।
এর আগে মাদক ও প্রতারণার অভিযোগে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিতুমীর কলেজের ছাত্রী প্রিয়াংকা ও মডেল ইমাসহ অনেক শিক্ষিত সুন্দরী তরুণী। বহুল আলোচিত যুবলীগ নেতা মিল্কি খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ফাহিমা ইসলাম লোপাকে।
এ রকম বহু লোমহর্ষ হত্যা কিংবা অপরাধের সঙ্গেই নারীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে হরহামেশা। নারী অপরাধীদের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা জানিয়ে সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী জানান, আগের তুলনায় কারাগারে নারীবন্দীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারীদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে নারী অপরাধীরা। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ অপরাধীরা ঢাল এবং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে পরিবারের নারী সদস্যদের।’
বাংলামেইল