।। মাসুদা ভাট্টি ॥
বাংলাদেশ প্যারাডক্স বা বাংলাদেশ বিস্ময় নিয়ে আজকাল বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে, দেশে এবং বিদেশে। বিশ্বব্যাংক হঠাৎ করেই বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করায় এই বিস্ময় আরও বেড়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিল তখন যে ঝড় চারদিকে উঠেছিল সমালোচনার, ঠিক সে পরিমাণ না হলেও তার সিকিভাগ প্রশংসাবাক্যও কারও মুখ থেকে এখন বেরুচ্ছে না, বিশ্বব্যাংকের এই নুতন তালিকাকরণে। একে কী বলা যেতে পারে? দ্বিচারিতা? দ্বিমুখিতা? নাকি ভণ্ডামি? যাই-ই হোক, তাতে সত্য বদলাবে না হয়তো, কিন্তু প্রশ্ন উঠবে যে, পরবর্তী সময়ে আবার কোনও নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশে যখন এরাই হা-রে-রে করে এগিয়ে আসবেন সমালোচনা করতে, তখন তাদের সেই সমালোচনার নৈতিক অধিকারটি আদৌ থাকবে কি না। যদিও বাংলাদেশে আমরা এ নিয়ে খুব একটা ভাবি না, কারণ, বাংলাদেশ সব সম্ভবের দেশ!
পশ্চিমা বিশ্বে একটি মজার ধরণ লক্ষ করা যায়, তা হলো, কাউকে কটু কথা বা নিন্দা করতে হলে, তাকে আগে প্রশংসা করা হয়ে থাকে। যেমন, কোনও ছাত্র যদি পরীক্ষায় খুব খারাপও করে তাহলে শিক্ষক আগে বলেন, তোমার রচনাটি চমৎকার হয়েছে, তুমি যুক্তি দিয়েছ ঠিকই, কিন্তু তোমার যুক্তিগুলো আসলে কিছুই হয়নি, ওগুলো অত্যন্ত জলো এবং অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু প্রথমেই যে ‘চমৎকার’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তাতেই কিন্তু ছাত্রের মানসিক আঘাতকে খানিকটা প্রশমিত করা গেছে। কাউকে অহেতুক আঘাত দেওয়াটা যদি উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণত তার কঠোর সমালোচনা করা হয় না, বা করলেও সমালোচনার আগে তার বিষয়ে ইতিবাচক কিছু কথা বলে নেওয়া হয়। কিন্তু প্রাচ্যদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশে তো প্রবাদই আছে যে, ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’! এরপর আসলে বলার মতো কথা আর থাকে না কিছুই।
বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি বলে যে প্রচারণা এক সময় বিশ্বের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল, মাত্র তিন দশক পরেই যে সে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এটা যেমন বিস্ময়ের, তেমনই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ তার শক্তিটি ফিরে পাবে সেটাও অনেকে বিশ্বাস করতে পারেননি।
আমরা যদি পেছনে ফিরে দেখি, তাহলে দেখতে পাই যে, এখনও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সহ্য করতে হয় সেই সব না-হক সমালোচনা, যার জন্য তিনি আসলে কোনওভাবেই দায়ী নন। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন- এ জাতীয় সমালোচনা তার মৃত্যুর পরই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ছড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বরাই। সামরিক শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রহননে এবং তাকে হত্যা করাকে জায়েজ করতে যে পরিমাণ মিথ্যাচার ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা হিটলারের প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার গোয়েবলসের প্রচারণাকেও হার মানায়। বঙ্গবন্ধুর পুত্রদের ব্যাংক ডাকাতি থেকে তার ৩২ নাম্বারের বাড়িতে বস্তায় বস্তায় সোনা ও টাকা পাওয়া যাওয়ার গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ যখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন, তখন তার হাতে যা ফেরত দেওয়া হয়েছিল তা এতটাই সামান্য যে, তা উল্লেখ না করলেও অসুবিধে ছিল না।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে যে, এত বস্তায় বস্তায় সোনাদানা, টাকা-পয়সা আসলে কোথায় গেল? সামরিক শাসক এবং তার প্রোপাগান্ডা মেশিনারিজের পরিচালকরাই সেগুলো খেয়ে ফেলেছেন? কিন্তু এ রকম যৌক্তিক প্রশ্ন তোলার সাহস বাংলাদেশে কারও ছিল না, বা কারও হয় না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার চেয়েও তার বিরুদ্ধে এই সব অপপ্রচারকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার কারিগররা কিন্তু এখনও এদেশে বেঁচে আছেন। বেতার-টেলিভিশন, সংবাদপত্র ইত্যাদিতে বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ করে রাখার চেয়েও তার চরিত্র হননে এগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু যে মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এসব মিথ্যাচার বন্ধ করার ব্যবস্থা নিয়েছে সেই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে মিডিয়াকে দখল করার, আওয়ামীকরণ করার। হ্যাঁ, স্বীকার করছি যে, অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগারদের হাতে পড়ে বঙ্গবন্ধুর কীর্তিও অনেকটাই লুণ্ঠিত হয়েছে কিন্তু তার আগে যে বঙ্গবন্ধুই কেবল নয়, দেশের স্বাধীনতা, জাতীয় নেতৃত্ব এবং ইতিহাসকে জাতীয়ভাবে কলুষিত করা হয়েছে তা নিয়ে কেউ টু-শব্দটি করেন না। এখানেই বিস্ময় আসলে, এই সমালোচকরা আসলে কার সমালোচনা করেন, বঙ্গবন্ধুর? আওয়ামী লীগের? না কি তারা আসলে স্বাধীন ও এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশটাকেই চাননি?
বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি বলে যে প্রচারণা এক সময় বিশ্বের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল, মাত্র তিন দশক পরেই যে সে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এটা যেমন বিস্ময়ের, তেমনই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ তার হৃত শক্তিটি ফিরে পাবে সেটাও অনেকে বিশ্বাস করতে পারেননি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তার অতীতের অনেক ঐতিহ্যকেই হারাতে হয়েছে। বিশেষ করে যখন শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন এবং দলকে গোছানোর চেষ্টা করছিলেন, ততদিনে দেশের ভেতরকার বিশেষ করে জনগণের মনে বিশাল পরিবর্তন এসে গিয়েছিল। সেনাশাসনের যাঁতাকলে থাকা মানুষের মনের বিস্তার ঘটেনি, উল্টো ধনীক শ্রেণির উত্থান ঘটিয়ে তাদের দিয়ে সমাজকে কলুষিত করার যে কৌশল দেশের শাসকশ্রেণি গ্রহণ করেছিল তা আওয়ামী লীগের তথা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে ছিল। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে তা কোনওভাবেই খাপ খেত না। তাছাড়া ততদিনে দেশে একটি ধর্মভিত্তিক শক্তিশালী গোষ্ঠীও তৈরি হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের কট্টর প্রভাব জনমানসেও প্রবলভাবে পড়েছিল। আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে পৌঁছুতে যে বিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, তা হয়তো অনেক আওয়ামী লীগারের চোখেও ইতিবাচক ঠেকেনি। কিন্তু এর বাইরে আর কোনও পথ আওয়ামী নেতৃত্বের সামনে খোলা ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। হতে পারে গবেষণাও। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মনোনয়ন দিয়েছিল এবং তার বিপরীতে বিএনপি ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও সেনা কর্মকর্তাদের মনোনয়ন দিয়ে সফলতা অর্জন করেছিল, তা দেখেও আওয়ামী লীগ যদি ১৯৯৮-এ নির্বাচনী স্ট্রাটিজি না বদলাতো তাহলে দলটির সমালোচকরাও কি দলটিকে রেহাই দিতেন নির্বুদ্ধিতার দায় থেকে? আমার মনে হয় না। এখানেও, আমরা বিতর্ক করতে পারি আওয়ামী লীগ কাজটি ঠিক করেছে কি না, তা নিয়ে, কিন্তু তিন পা এগুনোর জন্য দুপা পেছনে ফেরার কৌশল তো রাজনীতিতে নতুন নয়। যদিও আজকের লেখার বিষয় এটা নয়, তারপরও কিছু কথা বলতে হলো, সে জন্য দুঃখিত, এ নিয়ে আরেকদিন বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে রইলো।
শেখ হাসিনার সমালোচনা নেই তা নয়, যথেষ্টই আছে কিন্তু যতটুকু প্রশংসা তার প্রাপ্য সেটুকু দিয়ে যদি সমালোচনা করা যেত, তাহলে হয়তো সমালোচনাটাও গ্রহণযোগ্য হতো।
ফিরে যাই সমালোচনায়। বাংলাদেশকে নিয়ে যারা সমালোচনা করেন তাদের মূল চিৎকারটি আসলে একটি বিশেষ জায়গায়, তা হলো, কেন বাংলাদেশ ভালো করছে? এবং সেই ভালো করার নেতৃত্বে কেন শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ? কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, আওয়ামী-বিরোধীদের সামনেও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছিল, জনগণ তাদেরও বিপুল ভোটে ক্ষমতায় বসিয়েছিল (যদিও ভোটার তালিকার ত্রুটি বিশেষ করে কোটি কোটি ভুয়া ভোটারের উপস্থিতির কারণে সেই নির্বাচনকে কোনওভাবেই সঠিক বলে মেনে নেওয়া যায় না, এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের ভূমিকা সবই ছিল বিতর্কিত)। কিন্তু ক্ষমতায় বসেই দেশ ও দেশের মানুষের বিপরীতে হাঁটাই তাদের মৌলিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত সম্পদের বৃদ্ধিই কেবল নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে নিঃশ্চিহ্ন করার যে কৌশল তারা গ্রহণ করেছিল, তাতে বাংলাদেশের ভালো করা তো দূরের কথা, নিজেদের কবর তারা নিজেরাই খুঁড়েছিল। জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, আন্তর্জাতিক যেকোনও সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমশ নিম্নগামী হয়ে পড়ছিল। এই সত্যটি আমরা এখনও কেউ স্বীকার করতে চাই না, অথচ তখন দেশ যেন এগিয়ে না যায়, যেন দেশ সাহায্য-নির্ভরতা থেকে বেরুতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করাই ছিল সরকারি নীতি। দুর্নীতিতে পর পর পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া দেশটি যে দুর্নীতির সূচকে কোনওদিন আর নিচের দিকে নামবে, সেই ভাবনাটাই তখন কারও মাথায় আসেনি। অথচ বিগত কত বছর হলো দুর্নীতিতে ক্রমশ বাংলাদেশ সামনের দিকে এগুচ্ছে অর্থাৎ সূচকে নিচের দিকে নামছে? আমরা সমালোচকরা সেটা স্বীকার করি না, বা দেখেও দেখি না। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়াকে নিজের অবস্থান থেকে বিচার করে উড়িয়ে দেই, উড়িয়ে দেই সামাজিক ন্যায় বিচারের সূচকসহ উন্নয়নমাত্রা নির্ধারণে বাকি সূচকগুলোর ঊর্ধ্বগতিকেও। আমার মনে হয় এটাও বাংলাদেশ প্যারাডক্সের অংশ, নাহলে পৃথিবীর আর কোনও দেশেই কি এ রকম এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিকেও অবহেলা করতে পারে? কিংবা, অগ্রাহ্য করে? উদাহরণ একটিও পাওয়া যাবে না। বরং দেশের সামান্য অর্জনও জাতীয়ভাবে উদযাপিত (সেলিব্রেট) হয়। বাংলাদেশের মানুষ সেদিক দিয়ে চরম দুর্ভাগ্য নিয়েই জন্মেছে বলতে হবে।
হ্যাঁ, বাংলাদেশ এখনও অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে। এখনও দেশের রাজধানী বসবাসের অযোগ্য একটি শহর। এখনও দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক কাজ করতে হবে। এখনও সুশাসন নিশ্চিত করা যায়নি সর্বক্ষেত্রে। এখনও ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করা যায়নি দেশের মানুষকে। এখনও শিক্ষাব্যবস্থাকে করা যায়নি সার্বজনীন। না পাওয়ার তালিকাকে আরও দীর্ঘ করা যাবে কিন্তু তাই বলে যেটুকু পাওয়া গেছে তার প্রশংসা করতে ঠেকছে কোথায়? আসলে সেখানেই সকল প্রশংসা এসে ঠেকে যায় যখন দেখা যায় যে, এই সকল অর্জনের প্রায় সবটুকুই এসেছে শেখ হাসিনার শাসনামলে। শেখ হাসিনার সমালোচনা নেই তা নয়, যথেষ্টই আছে কিন্তু যতটুকু প্রশংসা তার প্রাপ্য সেটুকু দিয়ে যদি সমালোচনা করা যেত, তাহলে হয়তো সমালোচনাটাও গ্রহণযোগ্য হতো। যেহেতু আমরা তা করি না সেহেতু তার সমালোচনাটাও হালে পানি পায় না। জানি না, শেখ হাসিনার সমালোচকরা কি বিষয়টা একটু ভেবে দেখবেন কি না, মানে আমি সমালোচনার কৌশল পরিবর্তনের কথা বলছি আরকি!
বাংলাদেশ এগিয়েছে, আরও এগুবে। এবং অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই এগিয়ে যাওয়ায় যারা গাত্রদাহ অনুভব করেন, তাদের শরীর ও মন পুড়ে ক্রমশ কয়লা হতে থাকবে। কিন্তু তাতে উন্নয়ন কি থামবে? না থামা উচিত? নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে সময়ের আগেই হয়তো বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে ঠিকই কিন্তু ততদিন এই কয়লা হয়ে যাওয়া নিন্দুকরা যে ফসিলে পরিণত হবেন, সেটাই আসলে সান্ত্বনা। ফসিলের অনেক উপকারিতা, সবচেয়ে বড় উপযোগিতা হলো, ফসিল ইতিহাসের সাক্ষী- এসব ফসিল থেকেই জানা যাবে যে, বাংলাদেশ একসময় পিছিয়ে ছিল। আর সেসব ফসিলের জন্যই আজকের লেখার শিরোনামে আমি একটি বাংলা প্রবাদ ব্যবহার করেছি, যার অর্থ নতুন করে ব্যাখ্যার কিছুই নেই।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট