।। ইলোরা জামান ।। আমার পড়াশোনার সুবাদে একবার কিছু পতিতা কিংবা সোজা বাংলায় ‘বেশ্যা’ বলে যাদের, তাদের সাথে কথা বলবার সুযোগ হয়েছিলো। ঘটনাচক্রে তাদের একজনকে বলেছিলাম, “সবচেয়ে ঘৃণ্য যে কাজ, সেই ঘৃণা বুকে চেপে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একই কাজ করে যাওয়ার মত কষ্টকর বুঝি আর কিছুই নেই। আমি সমব্যথী।” সে বলেছিলো, “তুমি ভুল, ইলোরা। আমার কাজে আমার কাছে ঘৃণ্য নয়। কষ্ট নয়। সবচেয়ে কষ্টকর সেই সময়টি যখন আমার কাস্টমার যে প্রতিদিন আমার কাছে এসে আনন্দগ্রহণ করে, সে যদি আমাকে বেশ্যা বলে গালি দেয়। এর চাইতে ভয়ংকর বেদনার আর কিছুই নেই।”
পরে ভেবেছি পৃথিবীর কত মেয়েকেইতো প্রস্টিটিউট না হয়েও এই শব্দ হজম করতে হয় অন্যের কাছ থেকে। যারা বলে তারা রাগের প্রশমন করে, তৃপ্তি পায় একধরণের। একধরণের মানসিক পীড়া দিয়ে নিজ রাগের প্রশমন করতে গিয়ে অনেকে কাছের মানুষকেও ছাড়েনা। যদিও সে জানে তার স্ত্রী ওরকম নয়। নিজ কানে শুনেছি স্বামী তার স্ত্রীকে এরকম বলছেন কিছুতে কিছু হলেই। সরে এসেছি ওখান থেকে না শুনবার ভাণ করে। তখনই ভেবেছি এসব বিষয় সামনে আনা জরুরী।
নারীর প্রতি পুরুষের কিংবা নারীর প্রতি নারীর যে ভাষাভিত্তিক সহিংসতা তা নিয়ে সেই বহুকাল আগে থেকে ভাবছি। আমরা অনেক কিছু ওভারলুক করে যাই, মেনে নেই ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজের সাথে কিছু ঘটে যায় সংশ্লিষ্ট কিছু। আমাদের সমাজে নারীদের সাথে প্রচুর অবহেলা, অবমাননা এবং ডিস্ক্রিমিনেশন ও ভায়োলেন্স ঘটে। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, সামাজিক ভায়োলেন্স ইত্যাদিস্থানীয়। নারীরা যেহেতু লিখালিখিতে কম এগিয়ে এই সমাজে কিংবা প্রকাশের ক্ষেত্রে লাজুক অথবা পারদর্শী নয় ততটা সেহেতু অনেক বিষয় আছে যা সামনে আসেনা। হয়ত সাহসের অভাব কিংবা আরেকবার সহিংসতার ভয়ে।
বেশ্যা শব্দটি এসেছে বৈশ্য শব্দ থেকে। বর্ণপ্রথার কালে হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণীকে বলা হতো বৈশ্য। সেখান থেকে বিকোনো অর্থে এসেছে বাংলা বেশ্যা শব্দটি। কালের পরিক্রমায় শব্দটির একক-একমুখী অর্থ নির্মিত হয়েছে। শরীর বিক্রি করা মেয়েদের উপাধি হয়েছে বেশ্যা শব্দটি। আর এখন শুধু শরীর বিকোলেই না, স্বামীর সাথে তর্ক কিংবা একটু এদিক সেদিক করলেও বেশ্যা বলার চল আছে।
বেশ্যা একটি স্ত্রীবাচক শব্দ এবং এর কোনো পুরুষবাচক সমার্থক শব্দ নেই। তারমানে কি এই যে, শরীরী শুদ্ধতা শুধুমাত্র নারীদের বিষয়? পুরুষের শরীর শুদ্ধ হতে হয় না? পুরুষের শরীর বিক্রয়যোগ্য কোনো পণ্য হতে পারে না? নারীর ক্ষেত্রে কেন এর একক অবস্থান? আবার নারীকেই এর ভিক্টিম হতে হয়।
আমরা কতটা অসভ্য যে কিছু বিশ্রী স্ত্রী-বাচক শব্দকে এখনও লালন করছি, যেগুলোর কোনো পুরুষ-বাচক শব্দ নেই। যেমনঃ গণিকা, বেশ্যা, রক্ষিতা, পতিতা ইত্যাদি। এইসব শব্দের পুরুষ-বাচক শব্দ আবিস্কার করতে হবে নতুবা সেগুলোকে শব্দ-ভান্ডার থেকে বাদ দিতে হবে। কারণ, এসব শব্দের দ্বারা প্রতিনিয়ত মেয়েরা মানসিক ধর্ষন এবং ভায়োলেন্স এর স্বীকার হচ্ছে। যা ভিক্টিম ঠিক অনুরুপে ফিরিয়ে দিতে পারেনা। এই শব্দের অনুপযুক্ত ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ থাকা জরুরী।
বিঃদ্রঃ আমি নারীবাদি নই। স্রেফ মানুষবাদী। অনেকের কাছে এরমত জঘন্য লেখা আর হয়না বলে মনে হবে। কিন্তু হু কেয়ারস? নিজের মস্তিষ্ক অন্যের কাছে বর্গা দিয়ে গনি মিয়া টাইপের লেখক হতে চাইনা। উৎস: বিডি টুডে/ফেসবুক থেকে