সিসি ডেস্ক: বিদায় ঘণ্টা বাজছে ৭ মন্ত্রীর। স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (এলজিআরডি) সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে- মঙ্গলবার এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে সচিবালয়সহ সর্বত্র। এ ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে উঠে আসে, তার প্রতি মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও কেবিনেটসহ সরকারি কাজে তার অনুপস্থিতি। তবে সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ দপ্তর হারালেও মন্ত্রিত্ব হারাবেন না।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার সারসংক্ষেপ তৈরি করে অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। দিনভর এই গুঞ্জনের মধ্যেই গতকাল সৈয়দ আশরাফ সাংবাদিকদের বলেন, গুজবে কান দেবেন না।
এদিকে শুধু সৈয়দ আশরাফই নন, মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতির তালিকায় আছেন আরও বেশ কয়েকজন। সূত্র জানায়, ঈদের পর ৬টি মন্ত্রণালয়ে আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হতে পারে। অর্থাৎ অব্যাহতি পেতে যাচ্ছেন মোট ৭ মন্ত্রী। এ ছাড়া রদবদল হতে পারে আরও ৫টি মন্ত্রণালয়ে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিসভা রদবদলের একটা হাওয়া বেশ কিছুদিন ধরেই বইছে সব মন্ত্রণালয়ে। বিশেষ করে দুর্বল ও আলোচনায় থাকা মন্ত্রণালয়গুলো এ ক্ষেত্রে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। এসব মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর হাতে পৌঁছেছে। বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর আমলনামা খতিয়ে দেখছেন তিনি। শূন্য পড়ে থাকা ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে ইতিপূর্বে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ যেগুলোতে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী নেই, সেগুলোতে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী নিয়োগেও তার সম্মতি স্পষ্ট। তবে যেসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা কার্যত সরকারের কোনো ‘কাজে’ আসছেন না, ক্ষেত্রবিশেষে সরকারকে বিতর্কিত করে তুলছেন, তাদের অব্যাহতি অবশ্যম্ভাবী বলে জানান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী পর্যায়েও পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুই নেতা জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রী আজ অবধি কোনো কূটনৈতিক সাফল্য দেখাতে পারেননি। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে চলছে রুটিনওয়ার্ক। অলস এসব মন্ত্রণালয়েও রদবদল আসতে পারে। মামলার আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকছেন। এ নিয়ে সরকার আর কোনো আলোচনায় আসতে চায় না। তবে ঈদের পর মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন হলে মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হতে পারে মায়ার। গম কেলেঙ্কারির অভিযোগের কারণে অব্যাহতি পেতে পারেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
সম্প্রতি একটি দুর্নীতির মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ১৩ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়। এরপর থেকেই তার মন্ত্রী ও সাংসদ থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গতকাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দ এ বিষয়ে একটি রিট করেন। রিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও জাতীয় সংসদের স্পিকারকে বিবাদী করা হয়েছে।
এ ছাড়া অব্যাহতির তালিকায় আছেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, মৎস্যসম্পদমন্ত্রী সায়েদুল হক, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এমাজ উদ্দিন প্রামাণিক। এই চার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই আমাদের সময়কে বিষয়টি জানান।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় পার্টির তিনজনকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইতিপূর্বে কথা বলেছেন। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও আলোচনা হয়েছে। সরকারে থেকে জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বর্তমান সরকার। সব মিলিয়ে ঈদের পরে জাতীয় পার্টি আলোচনা ও সমঝোতার খাতিরে মন্ত্রিসভা থেকে সরে গেলে মন্ত্রণালয়ের রদবদলের পরিধি আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে দলের অনেক ত্যাগী নেতা মন্ত্রিত্বে আসার সুযোগ পাবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলীয় সভানেত্রীর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভায় কয়েকজন শীর্ষ নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস অন্যতম। এ ছাড়া পুরনোদের মধ্যে অনেকেই মন্ত্রিসভায় আবারও স্থান পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। তাদের মধ্যে আছেন সাবেক পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। এ ছাড়া শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল মতিন খসরু, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আশরাফুন্নেছা মোশারফের নামও শোনা যাচ্ছে। ঢাকা মহানগর ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, বিশেষ করে গত সিটি নির্বাচনে দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন এমন ২ জন নেতা প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে।
সৈয়দ আশরাফের অব্যাহতি নিয়ে ধোঁয়াশা
সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি দেওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, তাকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছেন, এ ?বি?ষয়ে আমার কাছে কোনো নির্দেশনা নেই। মূলত মন্ত্রিসভায় রদবদল ও দপ্তর বণ্টনের দাপ্তরিক কাজটি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী জানান, গতকালের একনেক বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ উপস্থিত না থাকায় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উনি (আশরাফ) মিটিং-টিটিংয়ে আসেন না, এ জন্য সরিয়ে দিলে ভালো হয়।’ এরপর তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এ বিষয়ে সারসংক্ষেপ তৈরি করতে বলেন। ওই মন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী হয়তো ক্ষোভের বশে এ ধরনের কথা বলেছেন। চাইলে পরে তিনি তা প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। তবে পুরো বিষয়টি এখন নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর ওপর।
এদিকে গুজবে কান না দিতে সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত ইফতার মাহফিলে যোগ দেন সৈয়দ আশরাফ। সেখানে ইফতার মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। গুজবে কান না দেওয়াই ভালো। মন্ত্রিপরিষদ রদবদল সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। আস