সিসি ডেস্ক: বগুড়ায় কলেজ ভবন নির্মাণকাজ শুরু না করেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে প্রায় এক কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
বিধি অনুযায়ী, নির্মাণকাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়ার কথা। কিন্তু বগুড়ার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৌনে এক কোটি টাকার বিল দেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন কাজ শুরুর আগেই বিল দেওয়ার সত্যতা স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, ‘কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য ছয়জন ঠিকাদার কার্যাদেশ পাওয়ার আগেই নিজেদের সাইটে (নির্মাণ এলাকায়) ইট, বালু, খোয়া, রডসহ নির্মাণ উপকরণ নিয়েছেন এবং মাটি খুঁড়ে ভবনের ভিত ঢালাইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাই প্রথম কিস্তির বিল দেওয়া হয়েছে।’ নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কার্যাদেশ দেওয়ার আগে শুধু নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ডের (এনওএ) ভিত্তিতেই প্রথম কিস্তির বিল দেওয়া যায়। কাজেই যে ছয় ঠিকাদারকে সামান্য বিল দেওয়া হয়েছে, তাতে কোনো অনিয়ম হয়নি। বরং কোনো কোনো ঠিকাদার উত্তোলিত বিলের অনেক বেশি অর্থের উপকরণ সাইটে নিয়েছেন।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মান্নোয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে প্রতিটি ভবন নির্মাণের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, বগুড়ার ১১টি কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে গত ১৩ মে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২ জুন। প্রতিটি গুচ্ছে গড়ে দরপত্র জমা পড়ে ৪০ থেকে ৫০টি। লটারির মাধ্যমে ১১ জন ঠিকাদারকে কাজের জন্য চূড়ান্ত করা হয়।
তিনজন সাধারণ ঠিকাদারের অভিযোগ, লটারির পর কার্যাদেশ না দিয়েই ছয়জন ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। ৩০ জুনের মধ্যে বিল দেওয়া না হলে টাকা ফেরত যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে সহকারী প্রকৌশলীদের দিয়ে কাজের অগ্রগতির মাপজোখ বই (মেজারমেন্ট বুক) ঠিকঠাক করা হয়। এরপর ২২ জুন থেকে ২৫ জুনের মধ্যে ওই ছয় ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ দেওয়ার পর প্রত্যেক ঠিকাদারকে সাড়ে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে মোট পৌনে এক কোটি টাকারও বেশি বিল দেওয়া হয়।
যে ছয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: গাবতলী উপজেলার সুখানপুকুর সৈয়দ আহমেদ কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য জে ই কনস্ট্রাকশন, সদর উপজেলার পাঁচবাড়িয়া জনতা ডিগ্রি কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য মেসার্স সেলিম রেজা কনস্ট্রাকশন, কাহালু উপজেলার দরগাহাট ডিগ্রি কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ, দুপচাঁচিয়ায় জাহানারা কামারুজ্জামান কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য এসআই এন্টারপ্রাইজ, শিবগঞ্জ উপজেলার পীরব ইউনাইটেড কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য মেসার্স জিয়াউল হক ও ময়দানহাটা মোশারফ মণ্ডল কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য মেসার্স আরিফ হাসান।
কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, ৩০ জুনের মধ্যে বিল দেওয়া হলেও ওই সময় পর্যন্ত নির্মাণ এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানেরই উপকরণ পৌঁছায়নি।
গত শনিবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু পীরব ইউনাইটেড কলেজ ও সৈয়দ আহমদ কলেজ ভবন নির্মাণের ভিত ঢালাই হয়েছে।
শনিবার সকালে সদর উপজেলার পাঁচবাড়িয়া জনতা মহাবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ভিত ঢালাইয়ের জন্য মাটি খোঁড়া হয়েছে এবং পিলারের (স্তম্ভ) জন্য রড সাজানো হয়েছে। সাইটে কিছু ইট-খোয়া, বালুও পড়েছে। নির্মাণশ্রমিক দলের নেতা নয়া মিয়া বলেন, সপ্তাহ খানেক ধরে তাঁরা ভবনের পিলার স্থাপনের জন্য মাটি কাটার কাজ শুরু করেন। এখন রড সাজানোর কাজ শেষ।
জনতা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, গত রোববার কলেজ ভবন নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক ভিত ঢালাই করা হয়েছে। ভিত ঢালাই ও ভিত্তিফলক উন্মোচনের মাধ্যমে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সাবেক নারী সাংসদ খাদিজা খাতুন।
ঠিকাদার সেলিম রেজা বলেন, ‘কলেজ ভবন নির্মাণকাজের জন্য ১৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বিল উত্তোলন করেছি। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। রোববার ভিত ঢালাই হয়েছে। এখন পর্যন্ত নির্মাণ এলাকায় যে পরিমাণ উপকরণ ফেলেছি, তাতে আরও বিল পাওনা রয়েছে।’
কাহালু উপজেলার দরগাহাট ডিগ্রি কলেজে গিয়ে দেখা গেছে, ভিতের জন্য মাটি খোঁড়া হয়েছে এবং কিছু রড দিয়ে ভিতের কিছু কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। খোঁড়াখুঁড়ির জায়গায় পানি জমে আছে। নির্মাণ এলাকায় কিছু খোয়া-বালু ও রড রয়েছে। কলেজ অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ রেখেছেন ঠিকাদারের লোকজন।
গত শনি ও গতকাল সোমবার ঠিকাদার সেলিম হোসেনের মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
প্রথম আলো