সিসি ডেস্ক: সিলেটে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলার ৪ আসামির মধ্যে তিন আসামিই সহোদর। তারা হলেন, মুহিত আলম (৩২), কামরুল ইসলাম (২৪) ও হায়দার আলী হোসেন ওরফে আলী (৩৪)। আর সহোদর তিন ভাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট।
রাজন হত্যা মামলার প্রধান আসামি মুহিত আলম রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তার ভাইদের রাজন হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও তাদের সরকার দলীয় সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন।
রিমান্ডে রাজনকে পিটয়ে মারার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে মুহিত বলেছেন, বুধবার বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি রাজন মাটিতে পড়ে আছে। তখন শ্বাস নিচ্ছিল। তবে, কথা বলতে পারছিল না। ১০মিনিট পর দেখি কোন নড়াচড়া নেই। শরীরে হাত দিয়ে দেখি দেহ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’
রাজন খুনের সঙ্গে তারা ৫জন জড়িত ছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছেন মুহিত। সে ছাড়াও সেখানে তার সৌদি প্রবাসী ভাই কামরুল, আরেক ভাই যুবলীগ নেতা হায়দার আলী হোসেন ওরফে আলী, শামীম আহমদ ও চৌকিদার ময়না মিয়া ছিল।
রিমান্ডে মুহিত জানিয়েছেন, ‘সৌদি প্রবাসী ভাই কামরুল বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করেছে রাজনকে। সকাল থেকে কামরুল রাজনের উপর অত্যাচার চালায়।’
মুহিত জানান, ‘রাজন খুনের পর লাশ গুমের পরিকল্পনা করে। নিজেদের রক্ষা করতে লাশ গুম করার পরিকল্পনা করে। এ কারণে তারা মাইক্রোবাস নিয়ে আসে। এবং লাশ নিয়ে তারা টিলার কাছে যেতে চাইছিল। কিন্তু পথিমধ্যে স্থানীয় জনতা আটক করে।’
মুহিত পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি এ ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পৃক্ত নন। তার ভাই কামরুল হচ্ছে রাজনের মূল ঘাতক।
সিলেটের জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন জানান, কামরুলকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় সোমবার দুপুরে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল নিজেকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করে কামরুলকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে।
একপর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ মুহিতের স্ত্রী লিপি বেগমকে আটক করে নিয়ে আসে। লিপিকে থানায় নিয়ে আসার পর মুহিত মুখ খুলতে শুরু করে। রাতে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদে মুহিত খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুহিত-কামরুল-আলীরা সাত ভাই। তাদের পৈত্রিক নিবাস ছিল সিলেটের কুমারগাওয়ের টুকেরবাজারের হায়দরপুর গ্রামে। কিন্তু তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসী তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের এলাকা ছাড়া করে।
এরপর শেখেরপাড়া এলাকায় নানা বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এখানে এসেও তাদের অত্যাচার থামেনি। বরং দিনে দিনে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে শেখেরপাড়াকে জিম্মি করে ফেলে।
জানা গেছে, সাত ভাইয়ের অত্যাচারী হয়ে ওঠার কারণটি হল, সহোদর হায়দার আলী স্থানীয় যুবলীগ নেতা। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, আরেকদিকে স্থানীয় পুলিশের সাথে সখ্যতা- দুইয়ে মিলে আলী ছিলেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আর আলীর পরিচয়ে তার অন্য ভাইয়েরাও সরকার দলীয় কর্মী হিসেবে এলাকায় দাপট দেখাতে শুরু করেন।
স্থানীয়রা দাবি করেন, ৮ জুলাই রাতে রাজনের লাশসহ মুহিতকে আটক করার পর তার ভাই যুবলীগ নেতা হায়দার আলীকে আটক করেছিল পুলিশ। কিন্তু তাকে প্রভাবশালীরা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
এ সময় আলীই রাজনের মূল ঘাতক ছোট ভাই কামরুলকে বাঁচাতে পুলিশকে ১২ লাখ টাকা দিয়ে তকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। একই সাথে ঘাতকদের বাঁচাতে মামলা না হওয়ার ব্যাপারেও পুলিশের কাছ থেকে আশ্বাস আদায় করেন।
এদিকে রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান জানান, ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে ৮ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসআই আমিরুল রাজনের লাশের ছবি দেখায় তার মোবাইল ফোনে। এরপর হাসপাতাল মর্গে গিয়ে লাশ সনাক্ত করে থানায় যাই মামলা করতে।’
তিনি জানান, ততক্ষনে এসআই আমিরুল অজ্ঞাতদের নামে আগেই মামলা করে বসে আছেন। আমি আসামিদের নাম ধরে মামলা করতে চাইলে এক পর্যায়ে এসআই আমিরুল আমাকে গলাধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেয়।’
তিনি অভিযোগ করেন,‘ এরপর পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোন উদ্যোগ নেয়নি। চারদিন পর পত্রিকায় খবর বের হলে পুলিশ তৎপর হয়। পুলিশ কোন আসামিকে ধরেনি। মুহিত আলমকে পাবলিক ধরেছে।
শেখ আজিজুর আরো জানান, তার ছেলেকে হত্যা করার পরের দিন গত ৯ জুলাই রাত ১২টার দিকে তার বাড়িতে গিয়ে মুহিত-কামরুল-আলীদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনজন লোক তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করে মামলা তুলে নিতে বলে।
তিনি জানান, প্রথমে মামলা তুলে নিতে ইউপি সদস্য গিয়াসউদ্দিনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা তাকে চাপ দেয়। তিনি ছেলে হত্যার বিচারের দাবিতে অনড় থাকলে তাকে টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় তারা চলে যায়।
মুহিত-কামরুল-আলীদের প্রতিবেশী মুরব্বি নাজিম উদ্দিন জানান, মুহিত-কামরুলরা টুকের বাজারের হায়দরপুর গ্রামে ছিল। শেখেরপাড়ায় এখন নানাবাড়িতে থাকে। হায়দরপুরেও মানুষকে অত্যাচার করতো তারা ৭ ভাই। তাই গ্রামের মানুষজন তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিলে তারা শেখেরপাড়ায় নানা বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
তিনি বলেন, আলী যুবলীগ করে। তাই তার ভাইয়েরা এলাকার কাউকে তোয়াক্কা করে না। গায়ের জোরে চলে। শেখেরপাড়ার মানুষজন জিম্মি ছিলেন তাদের কাছে। নিহত শিশুটি সবজি বিক্রি করতো। তাকে একেবারে পিটিয়ে মেরে ফেলার কোনো কারণ ছিল না।
তিনি আরো বলেন, কামরুল সৌদি প্রবাসী ছিল। মাসখানেক হলো সে দেশে এসেছে। সৌদিতেও তার বাজে স্বভাব ছিল। দেশে এসেই ময়না চৌকিদারের সাথে মিলে বাচ্চাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতো। তার নামে প্রায়ই নালিশ আসত।
গত ৮ জুলাই সকালে সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে রাজনকে ভ্যান গাড়ি চুরির অপবাদে খুঁটির সাথে বেঁধে লোহার রোল দিয়ে পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে রাজনকে হত্যা করা হয়।
এরপর দুপুর পৌনে ১টার দিকে হত্যার পর একটি মাইক্রোবাস যোগে (ঢাকা মেট্টো-চ-৫৪-০৫১৬) রাজনের লাশ গুম করার চেষ্টা মুহিত আলম। এ সময় তাকে আটক করে পুলিশে দেয় জনতা।
এরপর গত সোমবার সৌদি আরবে পালিয়ে যাওয়া কামরুলকে আটকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে আটকে করে পুলিশে দেয় জনতা। তবে মামলার অপর আসামি যুবলীগ নেতা আলী এখনো গ্রেপ্তার হননি।