• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

ক্ষতটা জাগিয়ে দিলি সামিউল

samiul_murder1437040734এস এম কামরুজ্জামান : ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু,/ পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু।/এই-যে হিয়া থরোথরো কাঁপে আজি এমনতরো/এই বেদনা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু।/এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু,/ পিছন-পানে তাকাই যদি কভু।/দিনের তাপে রৌদ্রজ্বালায় শুকায় মালা পূজার থালায়,/ সেই ম্লানতা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু।’

সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য কবিগুরু রবি ঠাকুর ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন এভাবেই। আজ আমরাও ক্ষমা চাই। কিন্তু ঈশ্বরের কাছে যতটা তার চেয়ে বেশি ক্ষমা চাচ্ছি ছোট্ট সামিউলের কাছে, যার পুরো নাম সামিউল আলম রাজন। রবি ঠাকুর আজ বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিও ছোট্ট সামিউলের কাছে মাথা নত করে ক্ষমা চাইতেন। মনে হতে পারে সামিউলটা আবার কে?

সিলেটের সেই সামিউলের কথা বলছি, যাকে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই দাগী গাড়ি চোরা বানিয়ে দিল আমাদের এ সমাজ। সমাজের নিষ্ঠুর আঘাতে আঘাতে চলে গেল পৃথিবী বুকে নিজেকে মেলে ধরার আগেই। চোখের জলে ভেসে যাওয়া পানি দিয়ে মৃত্যুর আগে মিটালো তীব্র পিপাসা। আমি তার কথা বলছি, যার ছোট্ট শরীরটার ঠাঁই হলো না বিশাল বড় এ পৃথিবীতে। মূল্য দিতে পারলাম না তার নিষ্পাপ মুখের আর্তচিৎকার, মানতে পারলাম না দুহাত জোর করে আকুতি, অনুনয়, বিনয়। তার কচিমুখের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভাড়ি হয়ে উঠলেও গলেনি পাষাণের মন।

সামিউলের মায়ের বুকফাঁটা কান্নার আওয়াজের শব্দে মনে পরে গেল অনেক দিনের আগের একটি ঘটনা। আমাদের বাড়ির পাশেই হিন্দুপাড়া। আমরা মুসলমান আর তারা হিন্দু- এটা পৃথক করা খুব কঠিন ছিল। তারা আমাদের বাড়িতে আসছে, আমরা তাদের বাড়ি যাচ্ছি- একেবারে আত্মীয়ের বন্ধনের মতো। এক হিন্দুবাড়ির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল অন্যদের চেয়ে একটু বেশি ভালো। এর কারণও ছিল। কারণটা হচ্ছে-ওই পরিবারের ছোট ছেলে আমার বন্ধু। মানে আমরা একসঙ্গে পড়ি। আসা যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া সবকিছু চলে দেদারসে। যাকে বলে দহরম-মহরম সম্পর্ক।

হিন্দুবাড়ি হলেও বন্ধুর সঙ্গে তাদের বেডে আমি অনেক দিন ঘুমিয়েছি, টিভি দেখেছি, রাতভর আড্ডা দিয়েছি। বন্ধুটা এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হয়েই এক রাতে হঠাৎ বাবা-মাকে নিয়ে চিরদিনের জন্য ভারতে পাড়ি জমালো। রেখে গেল তার একমাত্র বড় ভাই, ভাবি (বৌদি) এবং ৮ বছরের ভাতিজি ও বছর পাঁচেক বয়সের ভাস্তেকে। বাড়ির পাশেই তার চাচাতো ভাইয়েরা থাকলেও সম্পর্ক ভালো ছিল না। খোঁজ-খবরও কম রাখত। তাদের মধ্যে মাঝে মধ্যে ঝগড়া হতো, ফলে কথা-বার্তাও তেমন চলত না। বন্ধুর ভাইয়ের মেয়ে-ছেলে হওয়ায় দুজনকেই নিজেদের ভাতিজি-ভাস্তে মনে করতাম আমরা। আমার বাবা-মাও তাদের বেশ খোঁজ খবর নিতেন এবং দেখা-শোনা করতেন।

আমাদের বাড়ি এবং তাদের বাড়ির মাঝে একটি পুকুর ছিল। বর্ষাকাল ছাড়া সেখানে পানি দেখিনি। একদিন বৌদির ছোট্ট ছেলের খোঁজ নেই। সারা জায়গা হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলেন তার পাগলপ্রায় মা। অবশেষে নাড়িছেঁড়া ধনের লাশ মিলল সেই পুকুরে। পানির নিচে অনেক সময় থাকার পর একাই মাকে জানান দিতে হয়তো নিজেই ভেসে উঠেছিল সে। তার নাম ছিল ভরত।

তার মায়ের অভিযোগ, শত্রুতার জেরেই কেউ পানিতে ফেলে মেরেছে তাকে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করেনি। থানা-পুলিশ-জেল-হাজত-বিচারক-বিচারালয় থাকলেও তার অভিযোগ কেউ-ই আমলে নেয়নি। সমাজের মাতাব্বররাও হেলায় উড়িয়ে দেন। নিষ্পাপ একটি শিশুর অকালে প্রাণ গেল। আর সমাজের কাঠামো ঠিকই রয়ে গেল, চলল নিজের নিয়মে। সমাজ, রাষ্ট্র এটাকে নিছক একটা দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিল। যার গেল, সে ছাড়া কেউ বুঝল না এর বেদনা কী?

রাতে টিভিতে সামিউলের মায়ের বুকফাঁটা আর্তনাদ দেখে ঠিক ওই বৌদির কথা মনে পড়ে গেল অজান্তেই। পুকুর পাড় থেকে ছেলেকে নিয়ে তিনি যেভাবে আছড়ে পড়ছিলেন আজও সেটা মনে পড়লে চোখে জল চলে আসে। বৌদির কান্নার আওয়াজ এখনো আমার কানে বাজে, যেমনটি সামিউলের মায়ের আর্তনাদের আওয়াজ বাজছে আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে।

আমি সামিউল ও ভরতের মায়ের মুখচ্ছবি একইভাবে দেখতে পাচ্ছি। অনুধাবন করার চেষ্টা করছি তাদের ভেতরটা। সামিউলের মা যেন গগনবিদীর্ণ চিৎকারে বলছেন, ‘আমার ছেলে চোর না।’ আর অন্যজন বলছে, ‘ছোট্ট শিশুটার সঙ্গে শত্রুতা কেন? সে তো নির্দোষ, নিষ্পাপ।’ তাদের ওই নির্মম মৃত্যুর দৃশ্যটা আমি ভুলে থাকতে চাচ্ছি। কিন্তু কিছুতেই পারছি না। ঘুরেফিরে চিন্তাটা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, মনে প্রশ্ন জাগছে- আমরা কি সভ্য? এগুলো কি সভ্য সমাজের কাজ ইত্যাদি, ইত্যাদি?

আমাদের সমাজে এখনও ধর্মের নামে মানুষ হত্যা চলছে। বাসে আগুন দিয়ে নিরীহ যাত্রীদের হত্যা করছি। রাস্তাঘাট, বাস টার্মিনাল, চলন্ত বাসে গণধর্ষণ, ধর্ষণের ঘটনা প্রায়ই শুনছি। দেখছি বিনা বিচারে মানুষকে গুলি করে হত্যার ক্ষতবিক্ষত লাশ। দিনদুপুরে হাজারো লোকের সামনে যৌন হয়রানির উৎসবে মেতে উঠতে দেখছি। আমরা সভ্য নই। আমরা বর্বর। না হলে কি এ রকম কাজ আমরা করতে পারি? অতটুকু শিশুকে হত্যার উৎসবে মেতে ওঠি?

সমাজে এভাবেই একটার পর একটা বর্বর ঘটনা ঘটবে। কিছুদিন আলাপ-আলোচনা-সমালোচনার পর কালের বিবরে সামিউল, ভরতের কথা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে। অর্থপ্রাচুর্য্য, ক্ষমতার দাপট আর প্রশাসনে থাকা কিছু নষ্ট মানুষের জন্য পার পেয়ে যাবে দোষীরা। হায়েনার মতো কাজগুলো দেখে সাধারণ মানুষ কিছু দিন অনুশোচনা করবে। তারাও বলতে বলতে নিস্তেজ হয়ে পড়বে। বিচারের বাণী মাথা কুঁটে কুঁটে মরবে বিচারালয়ে।

কিন্তু আমরা এ অবস্থা দেখতে চাই না। সকল অন্যায়-অত্যাচার থেকে মুক্তি চাই। জাগাতে চাই না সামিউলের মতো দুঃখকাতর স্মৃতি। গড়তে চাই সুন্দর নির্মল ভবিষ্যৎ। শেষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথায় বলতে চাই, ‘চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

লেখক: সংবাদকর্মী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ