সিসি নিউজ ।। ট্রেন চলাচলের সময়-সূচী তাঁর মুখস্ত। ট্রেন আসার সঠিক সময়ে পৌছে যায় বাড়ির পাশে দারোয়ানী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে। দুই পাশে নিজের হাতে গড়ে তোলা বাঁশের ব্যারিয়ার আটকে পথচারীসহ সকল প্রকার যানবাহন আটকে দেয়। তারপর মুখে বাঁশি ও হাতে কলাপাতার পতাকা দেখিয়ে পার করে দেয় ট্রেনগুলো।
গত ২৭ জানুয়ারী থেকে এ কাজটি করছেন নীলফামারী সদর উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের দারোয়ানী বাজার সংলগ্ন গোলকশা পাড়ার রিক্সাভ্যান চালক আলমগীর হোসেন।
গ্রামবাসী আমিনুর রহমান জানান, ভ্যানচালক আলমগীরের বাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে চিলাহাটি-সৈয়দপুর রেলপথের দারোয়ানী লেভেল ক্রসিং। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে লেভেল ক্রসিংটি অরক্ষিত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পথচারী ও বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। গত ২৬ জানুয়ারী সকাল সাড়ে ৬টার দিকে উত্তরা ইপিজেডের ৮জন নারী শ্রমিক ইজিবাইকে চেপে কর্মস্থলে যাচ্ছিল। ঘণ কুয়াশার মাঝে ইজিবাইকটি এ লেভেল ক্রসিং অতিক্রমের সময় চিলাহাটিগামী আন্তঃনগর রুপসা এক্সপ্রেস ট্রেনের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। এতে মারা যায় ৪ নারী শ্রমিক ও গুরুতর আহত হয় ইজিবাইক চালকসহ ৫ জন।
তিনি জানান, এ ঘটনার পরদিন থেকে ভ্যানচালক আলমগীর হোসেন নিজের খরচে বাঁশ কিনে লেভেল ক্রসিংয়ের দুই পাশে গড়ে তোলে ব্যারিয়ার। আয়-উপার্জন বিসর্জন দিয়ে ট্রেনের সময়-সূচী অনুযায়ী ছুটে আসে লেভেল ক্রসিংয়ে।
লেভেল ক্রসিং সংলগ্ন ঘুমটির পাড় জামে মসজিতের মুয়াজ্জিন জালাল উদ্দিন জানান, দিনে বা রাতে যে কোন সময়ে চলাচলকারী ট্রেনের সময় আলমগীরকে লেভেল ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজাতে দেখা যায়। সকলের কাছে গেট কিপার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কখনও ভ্যান নিয়ে জেলা শহর কিংবা গ্রামের বাইরে গেলে তার বড় ছেলে আমিনুর রহমান এ দায়িত্ব পালন করে।
তিনি জানান, ৬ সদস্যের পরিবারের আলমগীর হোসেন একমাত্র উপার্জনশীল ব্যাক্তি। নিজের ভিটেমাটি নেই। সরকারী খাস জমিতে তাঁর বসবাস। মানবিক এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংসারে তাঁর চলছে টানাপোড়েন।
কথা হয় ভ্যানচালক আলমগীর হোসেনের সাথে। তিনি জানান, সেই ২৬ জানুয়ারীর ঘটনায় নিহত ও আহতরা সকলেই আমার প্রতিবেশি। ঘটনাস্থলে নিহত শেফালী বেগমের ছিন্নভিন্ন শরীরের অংশগুলো সে নিজের হাতে একত্রিত করেছে। আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে। গেট কিপার থাকলে এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে হতো না- এমন উপলব্ধি থেকেই সে ওই লেভেল ক্রসিংয়ে গেট কিপারের দায়িত্ব পালন করছে। যতদিন এখানে ব্যারিয়ার স্থাপন ও গেট কিপার নিয়োগ হবে না ততদিন তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান তিনি।
সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম শাহ জানান, আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা আলমগীরের এমন মানবিক দায়িত্ব পালনে আমি গর্বিত। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁর আয়-উপার্জনের ক্ষতি হচ্ছে নিশ্চিত। তাই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আলমগীর হোসেনকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, উত্তরা ইপিজেডে প্রায় ৩৫ হাজার কর্মচারী কাজ করেন। এর মধ্যে দৈনিক দুইবার রেলপথ অতিক্রম করেন প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক। লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান বা প্রতিবন্ধকতা না থাকায় নির্বিঘ্নে ওই সব শ্রমিক বহনকারী গাড়িসহ প্রতিদিন হাজারো যান চলাচল করে। বিষয়টি আমলে নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে লেভেল ক্রসিংয়ে জনবল নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল পাকশি ডিভিশনের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিইএন-২) আব্দুর রহিম জানান, দারোয়ানীতে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে গেট কিপারের দায়িত্ব পালনে ভ্যানচালক আলমগীর হোসেনের এমন মানবিক দায়িত্ববোধ প্রশংসার দাবিদার। দ্রুত ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করে অরক্ষিত ওই লেভেল ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার স্থাপনসহ নির্বিঘ্নে পথচারী ও যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান তিনি।
এছাড়া অবৈধ লেভেল ক্রসিং যাতে তৈরি না হয় সে জন্য সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। দুর্ঘটনার জন্য লেভেল ক্রসিং পারাপারে মানুষের অসাবধানতাও দায়ী বলে মনে করেন রেলওয়ের এ কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য যে, চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুরে রেলপথের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৩৬টি লেভেল ক্রসিং। এর মধ্যে ৩৩টি বৈধ ও ৩টি অঘোষিত লেভেল ক্রসিং। বৈধ ৩৩ টির মধ্যে মাত্র ১২ টিতে আছে ব্যারিয়ার। বাকি ২১টি লেভেল ক্রসিং দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অরক্ষিত।