নিউজ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদাকে ঘিরে সারা দেশে রেডঅ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশের নিষিদ্ধ পাঁচটি জঙ্গি সংগঠন বিশেষ করে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ এবং হিযবুত তাহ্রীরের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়াও জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে চিহ্নিত কিছু ধর্মীয় সংগঠনগুলোর প্রতি গোয়েন্দাদের রয়েছে বিশেষ দৃষ্টি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরির অডিও বার্তার বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ অডিও বার্তা কোথা থেকে কীভাবে প্রকাশ হলো, তারও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে আল জাওয়াহিরির কণ্ঠ। অডিও বার্তার কণ্ঠটি আদৌ আল-কায়েদা প্রধানের কি-না এবং এটি পৃথিবীর কোন অঞ্চল থেকে ইউটিউবে তুলে দেওয়া হয়েছে তাও খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে আইটি বিশেষজ্ঞরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে একযোগে কাজ করছেন। এ ভিডিও বার্তার সঙ্গে দেশীয় কোনো চক্র জড়িত কি-না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘বাংলাদেশ : ম্যাসাকার বিহাইন্ড এ ওয়াল অব সাইলেন্স’-শিরোনামের একটি অডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরি বাংলাদেশে জিহাদের আহ্বান জানিয়েছেন। এ বার্তাটি ইউটিউবের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। এর পরই সারা দেশে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অডিও বার্তাটিকে হুমকি বলে মনে না করলেও তিনি বলেছেন, সবকিছু মোকাবিলার জন্য আমরা প্রস্তুত। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, অডিও বার্তাটি সঠিক কি-না তা নিশ্চিত হতে আরও দু-একদিন সময় লাগবে। এটি নিশ্চিত হতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুরো বিষয়টি স্পর্শকাতর। এ ব্যাপারে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রশ্নে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয়। তবে অডিও বার্তাটি আদৌ সত্য কি-না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি কোনো পর্যায় থেকে। আল-কায়েদা এ বিষয়ে এখনো কোনো বক্তব্য দেয়নি। তবে দেশের অভ্যন্তরে যারা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান, অতীতে তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। আফগান-ফেরত মুজাহিদরা জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন। যাদের সঙ্গে আল-কায়েদার যোগাযোগ রয়েছে। ভিডিও বার্তার সঙ্গে এসব সংগঠনের যোগসূত্র থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, বিভিন্ন কারণে জামায়াতসহ ধর্মীয় উগ্রপন্থি সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। অস্তিত্ব রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করতে পারে তারা। এই ভিডিও বার্তাটি হতে পারে সর্বশক্তি নিয়োগের একটি অংশ। তাদের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করতে আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ করে ভিডিও বার্তাটি প্রকাশের ব্যবস্থা করতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টি নেতিবাচক করতে এটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও হতে পারে বলে মনে করেন নিরাপত্তাবিষয়ক এই বিশ্লেষক। তবে তিনি এও বলেছেন, আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের যথেষ্ট শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে। যা বিগত পাঁচ বছরে লক্ষ্য করা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আল-কায়েদা প্রধানের অডিও বার্তা প্রকাশের পর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা রয়েছেন প্রস্তুত। জঙ্গিবাদ দমনে জিরো টলারেন্স দেখাতে বলা হয়েছে দেশের প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারদের। এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা নোট পাঠানো হয়েছে। বিশেষ নির্দেশনা পেয়েই প্রতিটি জেলার চিহ্নিত কিছু মাদ্রাসা নজরদারির আওতায় নেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দারা চষে বেড়াচ্ছেন জঙ্গি অধ্যুষিত এলাকায়। জঙ্গি সংগঠনগুলোর কোথাও কোনো তৎপরতা দেখা মাত্র তা যে কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণে নিতে বলা হয়েছে।
রাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, অডিও বার্তাটি এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই অডিও বার্তাকে ঘিরে যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় র্যাব রয়েছে প্রস্তুত। র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটও কাজ করছে। নজরদারি চলছে জঙ্গি অধ্যুষিত চিহ্নিত স্থানগুলোতে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতে ইসলামী এবং দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিতসহ ১২টি উগ্রপন্থি সংগঠনের ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে হিযবুত তাহ্রীরের তৎপরতা নিয়ে চিন্তিত প্রশাসন। সূত্র জানায়, নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও হিযবুত তাহ্রীর, জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) ও শাহাদাত-ই-আল হিকমার তৎপরতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এ ছাড়া হিজবুত তাওহিদ, উলামা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনিয়াত, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি (আইডিপি), ইসলামী সমাজ, তৌহিদ ট্রাস্ট, তাআমির উদ-দ্বীন বাংলাদেশ (হিজবে আবু উমর) এবং আল্লাহর দল নামে সংগঠনগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সূত্র জানায়, উত্তরা, গুলশানসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় স্থাপিত ইংরেজি মাধ্যমের বেশ কয়েকটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও নজরদারি শুরু হয়েছে। এসব স্কুল কলেজ থেকে ইতিপূর্বে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এদিকে সচিবালয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরির নাম ও ছবিসহ অডিও বার্তায় বাংলাদেশকে হুমকির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি কোথা থেকে, কীভাবে এসেছে, পুরো বিষয়টি সরকার খতিয়ে দেখছে। এই অডিও বার্তাকে হুমকি মনে করছি না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। তিনি বলেন, যেসব দেশে এ ধরনের ঘটনা (আল-কায়েদার তৎপরতা) ঘটেছে, সেখানে স্থানীয়রা এতে ইন্ধন দেয়। কিন্তু আমাদের জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। এ দেশের মানুষ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, আল-কায়েদা চায় না। আর জঙ্গিদের যে কোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলায় দেশের সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের কাউন্টার টেররিজমের ওপর প্রশিক্ষণ রয়েছে। আমরা মোকাবিলা করতে পারব। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল বিকালে নিজ দফতরে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আলোচিত অডিও বার্তাটি সঠিক কি-না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি নিশ্চিত হতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। এ জন্য আরও দু-একদিন সময় লাগবে। তিনি বলেন, আল-কায়েদার প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরির বার্তার সঙ্গে জড়িত সব বিষয় আমাদের নজরে আছে।
জাওয়াহিরির এই বার্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, বার্তার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর ভূমিকা- সবকিছু নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন, ভিডিও বার্তাটি আগে আমাদের নজরে আসেনি। মিডিয়া যখন জেনেছে, আমরাও তখন ভিডিও সম্পর্কে জেনেছি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকলে তা অবাক করার বিষয় হবে না।
আল-কায়েদার এ বার্তা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াত জোট স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে মদদ দিয়ে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক রয়েছে বলে এর আগে আওয়ামী লীগের অবস্থান থেকে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ সময় আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ওই বক্তব্য সম্পর্কে অনেকে মনে করতেন, রাজনৈতিক উদ্দেশে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এই কথা বলা হচ্ছে। এখন এই অডিওর সত্যতা পাওয়া গেলে আওয়ামী লীগের সেই দাবি জোরালোভাবে প্রমাণিত হবে।’ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত পাঁচ বছরে মহাজোট সরকার এ ধরনের সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলা সফলভাবে করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো এ বিষয়ে অনেক সহায়তা করেছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তাদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আদান-প্রদান হয়েছে। তাই বাংলাদেশ এই ধরনের হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম।