ঢাকা: মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত ফাইনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের প্লানারি সভায় সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে মর্মে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বা সংহতির প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা হতে বেরিয়ে আসল।
সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ কথা জানান। সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা অসুবিধায় ছিলাম। এটা দূর হয়েছে। আমরা গ্রে-লিস্টে ছিলাম। এর থেকে ব্লাক-লিস্টে আসতে পরতাম। অনেক দেশ ব্লাক-লিস্টে আছে। আমরা এগিয়েছি। পাঁচ বছর গ্রে-লিস্টে ছিল এদেশটি। এখান থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, গত কয়েক বছরে আমরা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব বিধি-বিধান তৈরি করেছি, সেই প্রেক্ষিতেই এফএটিএফের সভায় বাংলাদেশের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে। ধূসর তালিকা যেটা ছিল, তা থেকে যদি আমরা কালো তালিকায় ঢুকে যেতাম তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের মানমর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ত।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, বাজেট বরাদ্দের অর্থ দিয়ে পদ্মাসেতু প্রকল্পের বৈদিশিক মুদ্রার দায় পরিশোধে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ডলার নেবে। তিনি বলেন, পদ্মাসেতুর ডলার ব্যবহার নিয়ে একটা ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাজেট বরাদ্দের অর্থ দিয়ে ডলার নেবো। পদ্মাসেতু প্রকল্পে ২২০ কোটি ডলার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের ১ হাজার ৮৫০ কোটি ডলারেও বেশি রিজার্ভ রয়েছে। তাই ২২০ কোটি ডলার নেওয়া খুব বেশি নয়।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলামুল হক বলেন, অনেক কষ্ট করে আমরা ধূসর তালিকা থেকে ঘন ধূসর তালিকায় যাওয়া ঠেকিয়ে রেখেছিলাম। বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে বর্তমানে আমরা ধূসর তালিকা থেকেই বেরিয়ে এসেছি। এটা আমাদের জন্য বিশাল অর্জন। অর্থনীতি সম্পর্কে এতদিন যে হুমকি ছিল তা দূর হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, আমরা যদি সফল না হতাম তাহলে আমরা একটা ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হতাম। কেউ আমাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চাইত না। এর থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। তিনি বলেন, এখন ঋণপত্র (এলসি) খোলায় খরচ কম হবে। ধূসর বা কালো তালিকাভুক্ত থাকলে বৈদেশিক সাহায্য পেতেও সমস্যা হয়।
পদ্মাসেতুর অর্থায়ন সম্পর্কে গভর্নর বলেন, সেতু করতে হলে বিদেশীরা ডলারের নিশ্চয়তা চাইবে। অগ্রণী ব্যাংককে বলা হয়েছে, তোমরা ডলারের নিশ্চয়তা দাও। বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রণী বাংকের সঙ্গে আছে।
এদিকে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, সন্ত্রাস বিরোধী আইন ও অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তায় এবং বিধিমালা জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কনভেনশন ও রেজুলেশনের আলোকে প্রণীত হয়েছে। মানি লন্ডারিং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গিকার, উচ্চ পর্যায়ের সচেতনতার ভূয়ষী প্রশংসা করা হয়। ফাইনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স হলো ৩৪টি উন্নত দেশ ও দুটি আঞ্চলিক সংস্থা নিয়ে গঠিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা, যা মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে।
ফাইনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের মানদণ্ড জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন-প্রোটোকল এবং নিরাপত্তা পরিষদে সংশ্লিষ্ট রেজুলেশনের ওপর ভিত্তি করে রচিত, যা পৃথিবীর প্রায় ১৮০টি দেশ বা রাষ্ট্রের জন্য পরিপালনীয়। ঝুঁকিপূর্ণ তালিকা হতে বেরিয়ে আসার ফলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যয় হ্রাস পাবে।