সিসি ডেস্ক: পাঁচতলার ফ্ল্যাটে নীলাদ্রি চ্যাটার্জি ওরফে ব্লগার নিলয় নীলকে হত্যার পর নিচে অপেক্ষমান রির্জাভ করা সিএনজি চালিত অটোরিক্সায় এসে বসে খুনিরা। এরপর রক্তমাখা ছুরি আর চাপাতি কাপড় দিয়ে মুছে ব্যাগেই রেখে দেয় তারা।
নিলয়ের মূল হত্যাকারীর শার্টের পুরোটাই রক্তে ভিজে যায়। ওই অটোরিক্সায় বসেই সে তার গায়ের শার্টটি খুলে ব্যাগ থেকে টিশার্ট পরে নেয়। তারপর রক্তমাখা শার্টটি ফেলে দেয় বাসার পাশেই রাখা একটি বালতিতে।
হত্যার পর পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসছে। রক্তভেজা ওই শার্টটি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
ঘটনার তদন্তে থাকা একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, হত্যায় অংশ নেওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনের ২০ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। আরেক জনের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছর। ওই তিন জনের মুখে দাড়ি ছিলো। পরনে ছিলো শার্ট অার প্যান্ট।
নিলয়ের স্ত্রী আশা মনি মামলার এফআইঅার-এ উল্লেখ করেছেন, দুপুর ১টা ১০ মিনিটে খুনিদের একজন তাদের ঘরে ঢুকে। কিছুক্ষণ পর অারো তিনজন। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই তারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ১টা ২০ মিনিটে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
এদিকে নিলেয়ের লাশের ময়না তদন্ত শেষে তাকে আঘাতের বিস্তারিত বিবরণ জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হাবিবুজ্জামান চৌধুরী।
তিনি জানান, নিলয়ের শরীরে ১২টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গলার ও থুতনির আটটি আঘাত গভীর। এছাড়াও শরীরে ছিল আরও চারটি জখম।
তিনি আর বলেন, হত্যা নিশ্চিত করতেই এত আঘাত করা হয়েছে। মূলত গলার আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
যেভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে
নিহত নিলয় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন পূর্ব গোড়ানের একটি সরুগলির ১৬৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে পাঁচতলা বাড়ি হক মঞ্জিল- এ থাকতেন। বাড়ির মালিক শামসুল হক দোতলায় থাকেন। বাড়িটিতে কোনো নিরাপত্তাকর্মী নেই।
নিলয়ের স্ত্রী আশামনি বলেন, নিলয় শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে বাসায় ঢুকে গোসল করে শোবার ঘরে বসে ছিল। এর ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর বাইরে থেকে কড়া নাড়ার শব্দে তিনি দরজা খুলে দেন। ওই সময় এক যুবক বাসা ভাড়া নেবে বলে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে ২০-২১ বছর বয়সী জিন্সের প্যান্ট পরা এক যুবক দরজা খুলতেই বাসায় ঢোকেন। তিনি বাসা ভাড়া নেবেন বলে নিজ থেকেই দু’বার পুরো ফ্ল্যাট ঘুরে দেখেন। তখন আমি বলি, ‘আমরা তো বাসা ছাড়ছি না, বাসা ভাড়া নেবেন কীভাবে? বাড়িওয়ালাকেও তো এ বিষয়ে কিছু বলিনি।’
আশামনি বলেন, ‘এ সময় ওই যুবক বলেন- বাড়িওয়ালাই আমাকে দেখে যেতে বলেছেন বলে হাতে মোবাইলেও যেন কী যেন করছিলেন। আমি বিষয়টি ড্রয়িংরুমে আমার স্বামীকে জানাতে যাই।’
এইমধ্যে আরো তিন যুবক বাসায় ঢোকেন। এরমধ্যে একজনের মুখে দাঁড়িও ছিল। তারা ভেতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেন। তিনজন যুবকের হাতে রামদা ও একজনের হাতে পিস্তল ছিল।
নিলয়ের স্ত্রী বলেন, ‘আমি ওই যুবককে চলে যেতে বললে সে পিস্তল বের করে আমাকে ভয় দেখায়। এরপর আমি নিলয়কে ঘটনাটি বললে সে এগিয়ে আসে। নিলয় বেরিয়ে যেতে বলতেই তারা তাকে দেখামাত্রই ওই চারজন রামদা দিয়ে কোপাতে শুরু করে। এ সময় তারা নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার স্লোগান দিচ্ছিল।’
তিনি বলেন, ‘একজন আমার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বারান্দায় রেখে ভেতর থেকে দরজা লক করে দেয়। একইভাবে অন্য রুম থেকে তন্বীকেও এখানে নিয়ে আসে। পরে এক সঙ্গে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায় তারা।’
আশামনি বলেন, ‘বারান্দায় আমি বারবার বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার দিলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।’
পাঁচতলার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন শামীম হোসেন। তিনি জানান, দুপুরের দিকে বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ করে পাশের ফ্ল্যাট থেকে ‘ডাকাত, ডাকাত’ শব্দে তার ঘুম ভাঙে। দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখেন, ৩-৪ যুবক সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে যাচ্ছে। তাদের একজনের শরীরে রক্ত ছিল।
নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় (২৭) গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে আরডিসি নামের এক এনজিওতে কাজ করতেন।
তিনি ‘নিলয় নীল’ নামে বিভিন্ন ব্লগে লিখতেন। ফেসবুকেও ছিলেন একই নামে। স্ত্রী আশামনিকে নিয়ে পূর্ব গোড়ানের একটি বাড়ির পাঁচতলায় দুই কক্ষের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন তিনি।
শুক্রবার কাল বেলা সোয়া একটার দিকে চার ব্যক্তি এই বাসার ভেতরে ঢুকেই নীলাদ্রিকে কুপিয়ে হত্যা করে।
পুলিশ বলেছে, তার মাথা ও ঘাড়ে বেশ কয়েকটি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ব্লগার নিলয়। কর্মস্থলে ও বন্ধুদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন তিনি। পুলিশের সাহায্য চেয়েও পাননি। ঢাকার বাইরে বদলিও হয়েছিলেন। বিদেশে চলে যাওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু শেষমেশ নৃশংসভাবে খুন হলেন তিনি।
এদিকে ব্লগার নিলয় খুনের ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ ঘটনার নিন্দায় সরব হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে পূর্ব গোড়ানের ভাড়া বাসায় একটি ফ্ল্যাটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় নীলাদ্রি চক্রবর্তী ওরেফ ব্লগার নিলয় নীলকে। নিলয় নীল নামে ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। ব্লগে লেখার পাশাপাশি কাজ করতেন।
এর আগেও মৌলবাদী গোষ্ঠী তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলো। হত্যার পর ঘটনার দায় স্বীকার করে আল কায়দা’র বাংলাদেশ শাখা বলে দাবিদার কথিত জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম’। রাতেই বিভিন্ন মিডিয়ায় ই-মেইল করে জঙ্গি সংগঠনটি। তবে সংগঠনটির অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করছে পুলিশ।