ঢাকা: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মন্দির, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের ঘটনায় সংখ্যালঘুরা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, যা একটি স্বাধীন দেশে কোনোভাবেই কাম্য নয়। শুক্রবার রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের নেতারা এ কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘কয়েকদিন আগে যশোরে চৈতন্য মণ্ডলকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে আহত করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি প্রতিদিনই মন্দির, বাড়িঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা এই সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।’
এতে আরো বলা হয়, ‘১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ে সংবিধানের চার মূলনীতির অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কারণে অসাম্প্রদায়িকতাকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়। গত ৪২ বছরে ধর্মীয় বৈষম্যে হামলার শিকার হয়ে অনেকে দেশত্যাগ করছে। ১৯৯০, ১৯৯২ ও ২০০১-এর সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ১৯৬৪ সালের হামলাকেও ছাড়িয়ে গেছে।’
দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবদান রয়েছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ‘স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও সংখ্যালঘুরা নিজদেশে পরবাসীর মতো জীবন-যাপন করছেন। এ হামলা আরো তীব্র হচ্ছে ‘
সংগঠনটি একটি পরিসংখ্যানের বরাত জানায়, গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হামলায় চারজন নিহত, ৩৪ জন আহত, দেড়শ মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, ১৮২টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত, ৪৫২টি পরিবার ও ২০৬টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয়েছে।
এছাড়া গত ২৫ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হামলায় ১৫০ জন আহত, ১৫২টি মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত, ৪৮৫টি বাড়িঘর, আড়াই হাজার পরিবার নির্যাতিত ও ৫৭৮টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হয়েছে। ৯ থেকে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত হামলায় একজন নিহত হয়েছে। এসময় ২৭টি মন্দির ভাঙচুর করা হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় নারী ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে অনেক ঘটনা লজ্জার ভয়ে প্রকাশ করা হয়নি।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, ‘আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পূজা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে সরস্বতী পূজা বন্ধ ও দেশ ত্যাগ করার হুমকি দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। এমনকি সাতক্ষীরার পলাশপুরে হিন্দুদের দেশত্যাগ করার হুমকি দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল দেশ গড়ার অনুকূল নয়।’
লিখিত বক্তব্যে রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘দেশ বাঁচাতে হলে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। গত বছরের পরিস্থিতি সংখ্যালঘুদের মনে যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে, তা সহজে দূর হওয়ার নয়। এই অনিশ্চয়তা দেশের জন্যে আরো ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।’
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে হামলাকারীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসন, আহতদের চিকিৎসা, শাহাবুদ্দিন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, হামলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদদাতা সংগঠন ও দল নিষিদ্ধ করা এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বসানো।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কানুতোষ মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ প্রমুখ।
বাংলামেইল