ঢাকা: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কেটে গেল একমাস। এই এক মাসের মধ্যে সরকার গঠন করে ফের ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার।
গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় আসে তারা। নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারের মাত্র কয়েকদিনেই সাফল্যের পাশাপাশি জুটেছে অনেক কলঙ্ক।
গত ১২ জানুয়ারি নবম সংসদের বির্তকিত মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন মন্ত্রিসভা গঠন করে প্রংসশিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ‘একতরফা’ নির্বাচনের কালিমা মুছে ভাবমূর্তি উদ্ধারে শুরু থেকেই সরকারের মন্ত্রী ও এমপিদের ব্যস্ততা দেখা গেছে। কিন্তু এর মধ্যেই কিছু মন্ত্রী ও সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার।
মন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমদিনই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আলোচনায় আসেন দুই মন্ত্রী।
এদের একজন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। দুটি মন্ত্রণালয়কে ‘সেক্সি মন্ত্রণালয়’ বলে তিনি আলোচনায় আসেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে দুটি সেক্সি মন্ত্রণালয়ের অফার করা হয়েছে। কিন্তু আমি তা গ্রহণ করিনি।’ তার এমন বক্তব্যে আপাত হাস্যরসের সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত তা সমালোচনায় পরিণত হয়।
আরেকজন হলেন সমাজ কল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ক্ষেপে যান। আর এ কারণেই মিডিয়ায় তিনি ‘ক্ষ্যাপামন্ত্রী’ হিসেবে চিহ্নিত হন।
এরপর স্কুলের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সোনার নৌকা উপহার নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এ ঘটনায় তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন। পরে অবশ্য তিনি সেই সোনার নৌকা বিক্রি করে সে অর্থ দুঃস্থ শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আহবান করে ২৭ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন জারির পর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘এ আপত্তিমূলক নির্দেশনা সবার জন্য প্রযোজ্য। কেবল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর আগমনে তাদের একজনজর দেখতে শিক্ষার্থীরা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়ায় তা মেনে নেওয়া যায়।’
পরিপত্র জারির পরও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি স্কুলে সংবর্ধনা নিতে আসেন, সেখানেও সংবর্ধনার নামে শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর প্রতিমন্ত্রীর মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকেই।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে মঞ্চে বসে সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর আয়েসি ধূমপানের বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়।
গত ২৭ জানুয়ারি সিলেটের বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। তিনি সেখানে মঞ্চে বসেই শিক্ষার্থীদের সামনে ধূমপান করেন। এই ছবি সামাজিক ওয়েবসাইটের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ হলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এরপর মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান।
নতুন সরকারের মন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রথম মাসেই কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ।
সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মাথায় ১৭ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগের শিক্ষকের গায়ে হাত তুলে সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সম্পাদক মামুন খান।
এদিকে গত ২৯ জানুয়ারি শাহবাগে মদের দোকান ভাংচুর করে ছাত্রলীগ। আর এ ঘটনায় ৩০ জানুয়ারি বহিষ্কার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের সভাপতি মেহেদি হাসান। শোকজ করা হয় একই হলের সাধারণ সম্পাদক দিদার মো. নিয়াজুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনকে।
২ ফেব্রুয়ারি রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুলি চালিয়ে আবারও পত্রিকার শিরোনাম হয় ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় রাবি ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ ওরফে সেতু ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান ওরফে ইমনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেট সার্কিট হাউসেও মন্ত্রী-এমপিদের চোখের সামনেই সংঘর্ষে জড়িয়েছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সিলেটের বিশ্বনাথে থানা ভাংচুর করেছে ছাত্রলীগ।
অন্যদিকে এবার এ সরকারের সাফল্যের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্তদের মন্ত্রিত্ব না দেয়া, বিদেশি কিছু দাতা গোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন আদায় ও কিছুটা কৌশল অবলম্বন করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাবেক বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত করা এবং বিএনপির অপচেষ্টা প্রতিহত করে বিদেশি রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাওয়াই সরকারের প্রথম মাসের বড় সফলতা।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এক সদস্য বলেন, ‘ছাত্রলীগ বিগত দিনেও সরকারকে বিপদে ফেলেছে। এখন তারা আবার শুরু করেছে। কিন্তু এ বিষয় নিয়ে আগে কথা বলে বিপদে পড়েছি। এখন আর এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।’
অন্যদিকে গত মেয়াদে শুরু হওয়া পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রো রেল, কক্সবাজারের সোনাদিয়া গভীর সমুন্দ্র বন্দর ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দ্রুত শেষ করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলামেইল