সিসি ডেস্ক: জাতীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) সুপারিশ ও পরামর্শ শুনছে না পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ দিনদিন বাড়ছে। এ নিয়ে অনেক এমপি প্রকাশ্যে কিছু না বললেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তা ফুটে উঠছে। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ‘সাংবিধানিকভাবে পুলিশ এমপিদের কথা শুনতে বাধ্য না।’ তবে প্রথাগতভাবে পুলিশ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে এমপিদের সুপারিশ পুরনো। ‘জেন্টেল এগ্রিমেন্টে’ পুলিশ তা শুনে থাকে। কিন্তু ইদানিং দেশের বিভিন্ন জেলায় পুলিশের কথা না শোনা নিয়ে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপিদের সুপারিশ ও অনুরোধ পুলিশ আরও বেশি এড়িয়ে যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি কয়েকজন এমপি পুলিশ কথা শুনছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন। এই তালিকায় ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরাও রয়েছেন। পুলিশ কথা না শোনায় সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী প্রকাশ্যে পুলিশকে গালমন্দ করেছেন। এমনকি তার আসনের তিন থানার ওসিকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় দাড় করিয়ে রেখেছেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগও করেছেন মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পুলিশ সুপার (এসপি)।
সমাজকল্যাণমন্ত্রীর অভিযোগ, ‘কুলাউড়া, জুড়ি ও বড়লেখার তিন ওসি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। এটা নাকি ভালো কাজ না করার শাস্তি।’
এই ঘটনার আগে জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) তোফায়েল আহমেদকে বদলি করান মন্ত্রী। কিন্তু নতুন এসপি সেখানে যোগ না দেওয়া এবং তোফায়েল আহমেদ সভায় থাকায় মন্ত্রী ক্ষেপে যান। এছাড়া এসপির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ ছিল বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি (১৬ জুলাই) রাজধানীর পল্লবীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার গাড়িচালক লাট মিয়াকে আটককে কেন্দ্র করে থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হয়েছেন। ইলিয়াস মোল্লার সমর্থকরা তাদের লাঞ্ছিত করে ওই গাড়িচালককে নিয়ে যায়। এর আগে গাড়িচালককে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কয়েক দফায় ফোন করেন এমপির ঘনিষ্ঠরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পল্লবী থানার এস আই জিল্লুর ও এএসআই রবিউল বৃহস্পতিবার বিকালে টহলরত অবস্থায় মোল্লা বস্তির কাছ থেকে লাট মিয়াকে আটক করে। এসময় নিজেকে সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার গাড়িচালক বলে পরিচয় দিলেও পুলিশ তাকে না ছেড়ে থানায় নিয়ে যায়। তাকে ছাড়িয়ে আনতে ইলিয়াস মোল্লার ঘনিষ্ঠ আলী মোল্লা, সোহেল ও আলম থানার সামনে যায়। তারা অনুরোধ করলেও পুলিশ লাট মিয়াকে ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। এসময় এসআই জিল্লুর ও এএসআই রবিউলকে তারা লাঞ্ছিত করেন। ঘটনার পর পল্লবী থানার ওসি দাদন ফকির এটাকে তুচ্ছ ঘটনা বলে মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি পুলিশ বাহিনীতে ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ নিয়ে এমপিদের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এমপিদের মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি। তবে পুলিশের অভিযোগ, এই নিয়োগে আর্থিক লেনদেন হওয়ায় সতর্ক অবস্থানে ছিল বাহিনী। তাই অনেকের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেনি তারা।
অপরদিকে, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের সুপারিশ, পরামর্শ সবসময় গ্রহণ করা হয় না। এলাকার আইনশৃঙ্খলা সভায় তারা উপস্থিত থাকলেও তাদের পরামর্শ মানা হচ্ছে না। এলাকার মাদক ব্যবসায়ী, চোরকারবারী, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না।
গোপালগঞ্জের সংসদ সদস্য উম্মে রাজিয়া কাজল বলেন, ‘সব সভায় আমি থাকি। এলাকার আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে কথা বলতে চেষ্টা করি। তবে সব পরামর্শ সবসময় গ্রহণ করা হয় না। তবে পুলিশ আন্তরিক আছে। আমার খোঁজ খবর রাখে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী সংসদ সদস্য বলেন, ‘পুলিশ আমাদের ফোনকে পাত্তাই দিচ্ছে না। ঈদ উপলক্ষে এলাকার ছেলেরা একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে ঘুরতেছিল কিন্তু তাদের পুলিশ আটকে দেয়। ছেলেরা আমাকে ফোন দিল। আমি ফোন দেওয়ার পর বলা হল উপরের নির্দেশে তাদের আটক করা হয়েছে। এভাবেই আমাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিষ খেয়ে বিষ হজম করার অবস্থা আমাদের। কার কাছে এসব কথা বলব। নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে, আসলে কী তাই হচ্ছে?’
চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুরের সংরক্ষিত আসনের নারী এমপি নুরজাহান মুক্তা বাংলা ট্রিবিউনকে অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নারী সংসদের বিষয়ে অনেক আন্তরিক। তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। কিন্তু প্রশাসন লেভেলে নারীর ক্ষমতায়নে সেভাবে সহযোগিতা পাচ্ছি না।’
পুলিশ এমপিদের কথা শুনছে না, এমন অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশ এমপিদের কথা শুনতে বাধ্য কি না সেটা প্রশ্ন না, প্রশ্ন হলো, পুলিশ সঠিক কাজটি করছে কি না। যেখানে সঠিক পুলিশকে সেরকমই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে সঠিক কাজটি করে। আবার এমপি সাহেবরা যে সাজেশন দেবে সেগুলোও গ্রহণ করতে হবে। এমপি সাহেবরাও দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন। সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে বাধ্যবাধকতা নেই কথা শোনার। তবে দেশের মঙ্গলের জন্য সবাই সমন্বয় করে কাজ করলেই ভালো।’
উৎস: বিডিটুডে