সিসি ডেস্ক: ট্রাইব্যুনালের রায়ের কপি যে কোনওভাবে চুরি করা এবং ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার পুরো পরিকল্পনার হোতা ছিলেন সালাউদ্নি কাদের চৌধুরী নিজে। আর তার ছেলেকে তিনি পুরো প্রক্রিয়াটা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাদের আইনজীবী প্যানেলের এক জুনিয়র সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘চৌধুরী সাহেবের (সাকা) উদ্দেশ্য ছিলো ট্রাইব্যুনালকে হেয় করা। এই ট্রাইব্যুনাল যে কোনও কাজের না আর সরাসরি মন্ত্রণালয়ের আদিষ্ট হয়ে কাজ করে- এমনটাই সাজানোর কথা ছিলো। আর এটা এমনভাবে আসতে হবে যেন মনে হয়, রায়টা চুরি হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু শেষমেষ পরিকল্পনা সাজানোয় গলদ থাকায় সবাই ধরা খেয়ে গেছে।’
এমনকি ওয়েবসাইটটি এখনও সেভাবেই আছে, বন্ধ হয়নি। তবে কার্যক্রম নেই। আগের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণে দেখা যায় ট্রাইব্যুনালকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ আর ভুল তথ্যে ভরা কিছু গল্প প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা আছে।
এদিকে, যুদ্ধাপরাধের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর মামলার রায়ের খসড়া ফাঁসের মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি গত সোমবারও তার স্ত্রীর সময়ের আবেদনের কারণে পিছিয়ে গেছে। ফলে আলোচিত এ মামলায় সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী, ছেলে ও আইনজীবীসহ সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন পঞ্চমবারের মতো পিছিয়ে গেল।
আসামির মধ্যে ফারহাত ও তার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী জামিনে রয়েছেন। সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলাম, সাকা চৌধুরীর ম্যানেজার মাহবুবুল আহসান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কর্মচারী নয়ন আলী ও ফারুক হোসেন আছেন কারাগারে। আর ফখরুলের সহকারী মেহেদী হাসান পলাতক।
প্রসিকিউটর শাহীদুর রহমান বলেন, ‘মামলাটি বিচারাধীন থাকায় আমাদের কথা বলা ঠিক না। তবে সব প্রমাণই তাদের বিপক্ষে যেতে দেখা গেছে। একটা অখ্যাত ওয়েবসাইটে রায়টির খসড়া কপি পাওয়া গেলো এবং তার পরিবারই সেটা কেবল খুঁজে পেয়ে বাইন্ডিং করে আদালতে নিয়ে এলো। পুরোটাই হাস্যকর।’
২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। তবে রায়ের আগেই সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা রায় ফাঁসের অভিযোগ তোলেন। তারা ‘রায়ের খসড়া কপি’ সংবাদকর্মীদের দেখান।
সাকার আইনজীবী বলেন, আসলে আমরা টাকা খরচ করে কর্মচারীর মাধ্যমে রায়ের কপিটা নিতে চেয়েছিলাম। তার আগে নানা ছুঁতায় আমরা খাস কামরায় যাওয়া এবং কিছু সাংবাদিককে কাজে লাগিয়েও রেকি করানোর চেষ্টা করেছিলাম। তিনি বলেন, চৌধুরী সাহেব সব ঠিকঠাক পরিকল্পনা করলেও মাথা গরম হওয়ায় তার ছেলে ও সিনিয়র আইনজীবীরা পরিকল্পনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দণ্ড লেখা না হতেই খসড়া অংশটা নিয়ে নিজেরাই আগে পাবলিক করার মতো বোকামি করে ফেলেছেন।
রায় ঘোষণার আগেই খসড়া প্রকাশিত হওয়ার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা করেন। এতে ট্রাইব্যুনালের কর্মী ফারুক, পরিচ্ছন্নকর্মী নয়ন আলী ও সাকার আইনজীবী ফখরুল ইসলামের জুনিয়র মেহেদীকে আসামি করা হয়। ৪ অক্টোবর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ফজলুর রহমান শাহবাগ থানায় আরেকটি মামলা করেন।
প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলামসহ সাতজনকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবির) পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহজাহান। এতে বলা হয়, মিডিয়ায় রায় প্রকাশ হলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নয়ন আলী মেহেদী হাসানের চেম্বারে যায় এবং রায় কীভাবে ফাঁস হলো জানতে চায়। মেহেদী হাসান তাকে জানায় রায়ের কপি তার কাছ থেকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার নিয়ে গেছে। তারাই অনলাইনে এ রায় ফাঁস করে। মেহেদী নয়ন আলীকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
নয়ন আলীর জবানবন্দির ভিত্তিতেই ফখরুল ইসলাম ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যবস্থাপক মাহবুবুল আহসানকে গ্রেফতার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রায়ের আগে ১৮ সেপ্টেম্বর অন্য আদেশের সঙ্গে রায়ের কপির আংশিক পেনড্রাইভে মেহেদী হাসানের কাছে দেয় ফারুক। আর এভাবেই রায় ঘোষণার আগে রায়ের কপি ইন্টারনেটে ফাঁস হয়ে যায়। ব্যারিস্টার ফখরুল নয়নকে তার কাজের পুরস্কারস্বরূপ একটা সিম্ফোনি মোবাইল দেন।
এ অপরাধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ৫৪ (২), ৫৭(২), ৬৩ (২) ও ৬৬ (২) ধারায় ঢাকার আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। চার্জশিটে ২৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।