কৃষি ডেস্ক : আবারো বাণিজ্যিকভাবে সমুদ্র-শৈবাল চাষের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আগ্রহের প্রেক্ষিতে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি পৃষ্ঠপোষকতা করার পরিকল্পনা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোসাম্মৎ মোস্তারী খানম বলেন, চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাণিজ্যিকভাবে সমুদ্র-শৈবাল চাষের সম্ভাব্যতার বিষয়ে পত্র পাঠানো হয়। এরপর এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় খোঁজ খবর নেয়। এরই প্রেক্ষিতে রোববার একটি প্রাথমিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জানা গেছে, কক্সবাজারে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পরীক্ষামূলকভাবে ২০১০ সালে দুই প্রজাতির শৈবালের চাষ করার মাধ্যমে দেশে প্রথম এর চাষ শুরু হয়। সে সময়ে আশা করা হয়, শৈবাল চাষ করে কৃষকরা ভাগ্য ফেরাতে পারবে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই শৈবাল চাষ প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। ফলে কক্সবাজারের প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনসহ সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানে শৈবাল চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও কাজে আসছে না।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, কক্সবাজারে নারিকেল জিঞ্জিরা তথা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রায় ১৪০ ধরনের শৈবাল জন্মায়। তা ছাড়া জেলা উপকুলীয় প্যারাবন এলাকাতেও ১০ প্রকারের শৈবাল দেখা যায়।
সমুদ্রে শৈবাল চাষের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হলে শৈবাল বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে। দেশে ৭১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে সমুদ্রসৈকত। যেখানে পরিকল্পিত বাণিজ্যিকভাবে শৈবাল চাষ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বাংলাদেশ কোস্ট ট্রাস্টের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বছরে প্রায় দুই হাজার টন শৈবাল পাচার হয়। অথচ বৈধ পথে এ শৈবাল বিদেশে রফতানি করা হলে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
জানা গেছে, সামুদ্রিক শৈবাল একটি রপ্তানি যোগ্য পণ্য। বিশ্বে একুয়াকালচার উৎপাদনে শৈবালের অবস্থান দ্বিতীয়। শৈবাল একটি সম্ভাবনাময় জলজ উদ্ভিদ, যার পুষ্টিমান অন্যান্য জলজ প্রজাতির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ হিসেবে বিশ্বব্যাপী দিন দিন সামুদ্রিক শৈবালের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে মানুষের খাদ্য ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে অনেক দেশেই শৈবালের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।
কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সামুদ্রিক শৈবাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, হংকং, মিয়ানমারসহ পৃথিবীর অনেক দেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে যোগ করতে পারে এক নতুন মাত্রা। সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়ন টন শৈবাল উৎপাদন হয়, যার আর্থিক মূল্য ১২ বিলিয়ন ডলার।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম ইমামুল হক বলেন, গবেষণা দ্বারা প্রমানিত যে, দেশের উপকূলীয় জলরাশিতে ব্যাপকভাবে শৈবাল চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চাষের কাঠামো প্রতিষ্ঠাকরণে চাষীদের স্বল্প বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ শৈবালের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া চাষকৃত শৈবালের ভালোমানের ওষুধি গুণ থাকায় দেশেও খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। এতে করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।
জানা গেছে, গৃহস্থালী উপকরণ, দড়ি, বাঁশ, জাল, প্লাষ্টিক বয়া ইত্যাদি ব্যবহার করে চাষিরা সহজেই শেবালের চাষ শুরু করতে পারে। সৈকতে জোয়ার-ভাটার অন্তর্বর্তী স্থানে অধিকাংশ শৈবাল জন্মায় ফলে ভূমিহীন চাষিরা খাস অনাবাদি জলাভূমিতে বিনা বাধায় শৈবাল চাষ করতে পারে।
১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব সম্মেলনে স্পিরুলিনা নামক অতি ক্ষুদ্র নীলাভ শৈবালকে আগামী দিনের সেরা খাদ্য হিসেবে ঘোষনা করে এবং বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন খাদ্যের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ ছাড়াও দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবান ও সুস্থ রাখতে শৈবাল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
সামুদ্রিক শৈবালের রয়েছে নানাবিদ ব্যবহার। পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান-প্রোটিন, ভিটামিন, লৌহ, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, বিটা ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিংক, ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৬, ভিটামিন কে এবং ভিটামিন ডি রয়েছে শৈবালে। দেশীয় প্যাকেটজাত ও কোমল পানীয়, জেল, জেলি, সংরক্ষিত খাদ্যে, আইসক্রিম, সেম্পু, টুথপেস্টসহ বিভিন্ন জিনিস উৎপাদনে ব্যবহার হয় শৈবাল। তথা মানবদেহে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে থাকে।
এ ছাড়া শৈবাল সার উৎপাদন, সমুদ্রের দূষণ রোধেও ভূমিকা রাখে। এর বিভিন্ন পিগমেন্ট থাকে যা রঙ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শৈবালে ওষুধি গুণ থাকায় সবজি হিসেবে এটিকে খাবার তালিকায় রাখলে দেশের বেশির ভাগ জনগণ টিউমার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ প্রভৃতি রোগ থেকে রক্ষা পাবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্মানো শৈবাল বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় জনগণ ‘হাইপেনা’ শৈবাল কুড়িয়ে তা শুকিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে এবং কিছু শৈবাল সার হিসেবে ব্যবহার করে। এ ছাড়া প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রচুর শৈবাল জন্মে। কিন্তু পর্যটকদের অবাধে চলাফেরা, নৌ চালনা, পাথর আহরণ ইত্যাদি কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপে শৈবালের উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উৎস ছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতিতে শৈবাল উৎপাদন ও চাষে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।