কৃষি ডেস্ক: আফ্রিকার তেলাপিয়া ও মাগুর মাছ বাংলাদেশের মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে। এই মাছ দুটি এখন এদেশের গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের খাবারের টেবিলের প্রধান আমিষ। মাছের চাষ করে অনেক মাছচাষি স্বাবলম্বী হয়েছেন। গ্রামগঞ্জের কৃষকরা এ মাছ চাষ করে বাড়তি আয় করে থাকেন। আফ্রিকান মাছ দুটি মানুষের প্রিয় খাবার হলেও জায়ান্ট ল্যান্ড স্নেইল নামের আফ্রিকার শামুক দেশের পরিবেশ ও কৃষির জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। বিশালদেহী এই শামুক ধান-পাটের কচি পাতা খেয়ে ফেলে। গাঁদা, জিনিয়া, সিলভিয়, বাগানবিলাস, ক্যাকটাসসহ বিভিন্ন গাছের কচি পাতা ধীরে ধীরে খেয়ে সাবাড় করে দেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) নিরীহ ওই প্রাণিটির প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার চিত্র নজরে আসে পরিবেশবিদ ও কৃষিবিদদের। ব্যাপকভাবে বংশবিস্তার করে এ শামুক।
কৃষিবিদদের অভিমত, আফ্রিকান জায়ান্ট ল্যান্ড স্নেইলকে দমন করা না হলে গোটা দেশের কৃষি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে, কারণ কয়েক বছরের মধ্যে এ শামুকের বিস্তার ঘটতে পারে সারাদেশে। প্রাণিজগতের মলাস্কা পর্বের নরমদেহী ও প্যাঁচানো খোলসে আবৃত প্রাণী হচ্ছে স্নেইল বা শামুক। সাধারণত মরুভূমি, নদী ও স্রোতস্বিনী, পুকুর-নর্দমা ও সমুদ্র উপকূলসহ বিভিন্ন আবহাওয়াতে শামুক দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণত দেশী শামুকের তেমন কোনো ক্ষতিকর প্রভাব চোখে পড়ে না। শামুক পরিবেশের বিশেষ বন্ধু হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। শামুকের শক্ত আবরণ দিয়ে চুন তৈরি হয়। গ্রামের মানুষ সে চুন পানের সঙ্গে খেয়ে থাকে। শামুক মরে গেলে তার মাংস ও খোলস পচে জমিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি হয়। ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও অধিক ফসল হতে সাহায্য করে। কিন্তু আফ্রিকান শামুক কৃষির জন্য হয়ে উঠছে আতঙ্ক।
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) নিরীহ এই প্রাণীটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজাতির এ শামুকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ছড়িয়েই পড়েনি, হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবস্থাকে। আফ্রিকান জায়ান্ট ল্যান্ড স্নেইলকে যদি এখনই দমন করা না যায়, তাহলে গোটা দেশের কৃষি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ নাজমুল আহসান হলের বাগান পরিচর্যাকারীরা জানান, প্রতিবছর শীতকে সামনে রেখে হলের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য বিভিন্ন রকম ফুলের গাছ লাগান তারা। কিন্তু এ বছর ওই বিশালদেহী ওই শামুকগুলো গাঁদা, জিনিয়া, সিলভিয়, বাগানবিলাস, কেকটাসসহ বিভিন্ন গাছের কচি পাতা খেয়ে ফেলছে। কোনো গাছই টেকানো যাচ্ছে না। এমনকি হলের নোটিশ বোর্ডে টানানো কাগজও খেয়ে ফেলছে। আর একবার কোনো গাছ আক্রমণের শিকার হলে সে গাছকে বাঁচানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, প্রাকৃতিক ও দেশীয় মাছের প্রধান খাদ্য হচ্ছে শামুকের ডিম ও মাংস। বিশেষ করে কৈ, শিং, মাগুর, ট্যাংরা, টাকি ও শোল মাছের পোনার একমাত্র খাদ্য হচ্ছে শামুকের নরম ডিম। আর এ খাবার না পেলে ওই পোনা মারা যায়। শামুকের খোলসের ভেতরের নরম অংশ চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঘের মালিকেরা শামুক কিনে নিয়ে যান। তাছাড়া ম্যাচোফেলিয়া ও মাইক্রোফেলিয়া নামে দু’ধরনের কীট শামুক থেকে খাবার সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে এবং ধানগাছের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি ক্ষেতের ব্যাপক উপকার করে থাকে। অন্যদিকে শামুক নিঃসৃত পানির রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। শামুক থেকে তৈরি করা যায় চুন, এমনকি হাঁসের খাবারও।
বিশালদেহী ও ক্ষতিকর ওই শামুক সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএ সালাম জানান, এটি হচ্ছে আফ্রিকান জায়ান্ট ল্যান্ড স্নেইল। ২০০২ সালে শ্রীমঙ্গলের ডানকেন চা বাগান ও ব্রিটিশ এম্বাসির কাছাকাছি অঞ্চলে প্রথম আফ্রিকান জায়ান্ট স্নেইল পাওয়া যায়। ফসল ও বাগানের ক্ষতি করে বলে সে সময় তারা এদের ধরে ধরে পুড়িয়ে ফেলত, কিংবা মেরে ফেলত। কিন্তু এরপর এদের তেমন আর দেখা যায়নি। এরা ফসলের জন্য খুব ক্ষতিকর। বাগান নষ্ট করে ফেলে। সন্ধ্যা হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে বের হয়ে আসে। আর দিনের বেলা অত্যধিক সূর্যালোক থেকে বাঁচতে লুকিয়ে থাকে। অতিবৃষ্টির সময় এরা দালানের দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে আশ্রয় নেয়। এর মাংস খুবই শক্ত হওয়ায় পশু-পাখিরাও খেতে চায় না। আমাদের দেশীয় যে শামুক আছে, সেটি উপকারী এবং তারা স্থলভূমিতে উঠে আসে না, বরং পানিতেই থাকে। কিন্তু এটি গাছপালা, লতাপাতা ও ফলমূল খেয়ে ধ্বংস করে। এমনকি দিনের বেলা অনেক গাছ, যেমন পেঁপে গাছের মাথায় উঠে পাতা খেয়ে গাছ ধ্বংস করে, যা আমাদের দেশের কৃষির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। বিদেশীদের আগমনের সাথে সাথেই তাদের আগমন, এমনটাই ধারণা করেন তিনি। বিভিন্ন সময় বাইরের দেশ থেকে আমাদের দেশে গাছ-গাছালি আনা হয়। সেখানকার মাটিতে কিংবা গাছের পাতার মধ্যে লুকিয়ে থেকে তারা আমাদের দেশে আসতে পারে।এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় সম্পর্কে ড. সালাম বলেন, এটিকে স্বমূলে নির্মূলের জন্য এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং যেভাবেই হোক এর প্রজনন ও বৃদ্ধি প্রক্রিয়া নষ্ট করতে হবে। এর উপকারিতা বলতে কিছু নেই। একে ধ্বংস করার জন্য অনতিবিলম্বে বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। অন্যথায় এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যাবে এবং গোটা দেশের কৃষি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।
এদিকে স্নেইল নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন বাকৃবির প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম। তিনি জানান, আফ্রিকান প্রজাতির ওই স্নেইলগুলো বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রাপ্ত অন্যান্য প্রজাতির চেয়ে এরা ক্ষতিকর। এই স্নেইলগুলো পানিতে থাকে না, এরা ডাঙায় থেকে ফসলের ক্ষতি করে। এরা ফসলের এক ধরনের পেস্ট বা পোকা। এরা ফসলের পাতা ও কচি ডগা খেয়ে ফেলে ফসল নষ্ট করে। তাছাড়া এরা চলার পথে এক ধরনের আঠাল পদার্থ নিঃসরণ করে, যা মাটির অম্লীয় ভাবকে বৃদ্ধি করে মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। এটি দমনের বিষয়ে তিনি বলেন, হ্যান্ড পিকিং বা কুড়িয়ে কুড়িয়ে নষ্ট করা সব থেকে ভালো উপায়। তাদের চলার পথে বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে দিয়েও দমন করা যায়। অথবা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যেমন কপার সালফেট (তুঁতে) স্প্রে করেও আফ্রিকান জায়ান্ট ল্যান্ড স্নেইল দমন করা যায়।