সিসি ডেস্ক: রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে সব কথাই বললেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিএনপি-প্রধান। এ সময় রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার অনুরোধও করেন তিনি। নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি নিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠকে গতকাল এসব কথা বলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি এর মাধ্যমে চলমান সংকট নিরসন হবে। ’ বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে সার্চ কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশন নিয়োগ ছাড়াও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব দেন বেগম জিয়া। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রস্তাবনা ছাড়াও চলমান রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন বেগম জিয়া। এ সময় তিনি সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন গঠনে পাঁচজন করে মোট ১০ জনের নামের প্রস্তাবিত তালিকা-সংবলিত একটি ফাইল রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি বিএনপি-প্রধানকে আশ্বস্ত করে বলেন, এ নিয়ে তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও মতামত নেবেন। প্রয়োজনে তিনি সার্চ কমিটি গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরেক দফা বৈঠক করবেন। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি বসবেন আগামীকাল বেলা ৩টায়। পরদিন বেলা ৩টায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও সাড়ে ৪টায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় সরকারের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সঙ্গে বসার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির। পরে পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি দলকে আলোচনায় ডাকা হবে বলে বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে বিএনপি মহাসচিব নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে বলে আমরা মনে করি। ’ এদিকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন সাংবাদিকদের জানান, বিএনপির প্রস্তাব নির্বাচন কমিশন গঠনে সহায়ক হবে। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে দলের নেতাদের নিয়ে বঙ্গভবনে পৌঁছান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বঙ্গভবনে তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব ওয়াহিদুল ইসলাম খান। পরে রাষ্ট্রপতি এসে বেগম জিয়ার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কেমন আছেন?’ জবাবে বেগম জিয়া বলেন, ‘মোটামুটি ভালো আছি। ’ এ সময় দুজনকেই হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়। বেগম জিয়া হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিত ছিলেন। পরে রাষ্ট্রপতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সব সদস্যের সঙ্গে কথা বলেন। বৈঠকের আগে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে প্রায় ১৫ মিনিট খোলামেলা কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপির প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শারীরিক অসুস্থতার জন্য স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি। অন্যদিকে তালিকায় থাকা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়া তার একটি লিখিত বক্তব্য ছাড়াও ইতিপূর্বে দলের পক্ষ থেকে ঘোষিত নির্বাচন কমিশন গঠন-সংক্রান্ত ১৩ দফা প্রস্তাবের একটি কপি রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা একটি ফটোসেশনেও অংশ নেন। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে চা-মিষ্টি ছাড়াও বিভিন্ন রকমের ফল ও বিস্কুট দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করা হয়। জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমরা নামের তালিকা দিলাম। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তালিকার সঙ্গে নামের সাদৃশ্য থাকলে তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। ’ রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে স্বাগত বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। বিজয় দিবসে আমরা একটি র্যালিও করতে পারি না। আপনি দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিন। ’ বেগম জিয়ার বক্তব্যের পর রাষ্ট্রপতি জানান, ‘এই সংলাপ ইতিবাচক বলে আমি মনে করি। দেশের চলমান সংকট নিরসনে এই সংলাপ ভূমিকা পালন করবে। আমি পর্যায়ক্রমে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করব। এরপর দ্বিতীয় দফায় আবারও সংলাপ করতে পারি। ’
বিএনপি আশাবাদী : বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে নয়াপল্টনে দলের কার্যালয়ে ফিরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে খুশি হয়েছি, আশাবাদী হয়ে উঠেছি। ’ নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতি যে সার্চ কমিটি গঠন করবেন, সে বিষয়ে বিএনপি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান মির্জা ফখরুল। বিএনপি সাবেক একজন প্রধান বিচারপতিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যারা নতুন নির্বাচন কমিশনারদের নাম প্রস্তাব করবেন। তাদের মধ্য থেকে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। সার্চ বা বাছাই কমিটিতে কোনো ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা হয়েছে কি না—প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা বলেছিই তো সার্চ কমিটির ব্যাপারে আমাদের দলের চেয়ারপারসন সুনির্দিষ্টভাবে তার মতামত রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছেন। বিএনপির প্রত্যাশা, বাছাই কমিটির সদস্যদের সবাই “দলনিরপেক্ষ” হবেন। বিতর্ক থাকলে চলবে না। অবসরের পর সরকারের লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন ব্যক্তিদেরও নেওয়া যাবে না। ’ মির্জা ফখরুল বলেন, রাষ্ট্রপতি একজন আপাদমস্তক রাজনৈতিক নেতা। তিনি দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন মানুষ। আমরা এটা জোর দিয়ে বলতে চাই, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আশাবাদী হয়েছি যে, এই সংকট নিরসনে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন তিনি। ’ বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি আমাদের প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। আশা করি ভবিষ্যতে এ বিষয়ে অধিকতর আলোচনার জন্য আপনি (রাষ্ট্রপতি) আমাদের আবারও আমন্ত্রণ জানাবেন। ’ বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ইসি নিয়োগে এখনো কোনো আইন না হওয়ায় এখন রাষ্ট্রপতির কাছেও বিকল্প কোনো পথ নেই। সে জন্য রাজনৈতিক দলের মতৈক্যের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন গঠন করার উদ্যোগ মহামান্য রাষ্ট্রপতির নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি এবং চেয়ারপারসন মনে করেন বলে তা উত্থাপন করেছেন। তিনি (রাষ্ট্রপতি) এই অভিমতও প্রকাশ করেন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আলোচনা ও সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। এ সমস্যার সমাধানগুলো আলোচনার মাধ্যমে হতে হবে বলে রাষ্ট্রপতি মনে করেন। ’ মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামী মাসের মধ্যে তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াটা শেষ করবেন। তিনি (রাষ্ট্রপতি) আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী মাসের মধ্যে এটা তিনি শেষ করতে চান। ’
বিএনপির প্রস্তাব ইসি গঠনে সহায়ক হবে : রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনায় ইসির ভূমিকাই যে ‘মুখ্য’, তা মনে করিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও তাদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বঙ্গভবনের দরবার হলে ঘণ্টাব্যাপী এ আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন সাংবাদিকদের সামনে বৈঠকের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বিএনপির প্রতিনিধিদল আলোচনায় অংশ নিতে আসায় রাষ্ট্রপতি শুরুতেই তাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই মুখ্য। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও সার্চ কমিটি গঠনের ব্যাপারে বিএনপি যেসব প্রস্তাব পেশ করেছে, সেগুলো সহায়ক হবে। জয়নাল আবেদীন রাষ্ট্রপতির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বিএনপির মতামত পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠনে ইতিবাচক অবদান রাখবে। যে কোনো বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় সমাধানের বহুমুখী পথের সন্ধান দেয়। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানোয় বিএনপি চেয়ারপারসন রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানান এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। নির্বাচন কমিশন ও সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি একটি লিখিত প্রস্তাব আলোচনায় তুলে ধরেন। এ ছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন ও নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণে তাদের প্রস্তাবও তিনি তুলে ধরেন। প্রেস সচিব আরও বলেন, বিএনপি রাষ্ট্রপতির এ উদ্যোগের সফলতা কামনা করেছে এবং এ ব্যাপারে তাদের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে বলে জানিয়েছে।
বিএনপি নেতারা যা বললেন : লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি থেকে শুরু করে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সবকিছু নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে আমরা রাষ্ট্রপতিকে তার সীমাবদ্ধতার ভিতরই দেশের চলমান সংকট নিরসনে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখার কথা বলেছি। জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, তিনি তার সীমিত সাধ্যের ভিতর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন। প্রয়োজনে আবারও সংলাপের উদ্যোগ নেবেন। আমরাও তার এ আশ্বাসে আশাবাদী। ’ বৈঠক শেষে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা একটি নিরপেক্ষ ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চেয়েছি। তিনিও আশ্বাস দিয়েছেন। ’ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, ‘আমরা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনসহ দেশের সার্বিক রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতিকে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। তিনিও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। প্রয়োজনে আবারও সংলাপের আয়োজন করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ’ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আলোচনা ভালো হয়েছে। আমরা আশাবাদী। ভবিষ্যতে এর কতটুকু বাস্তবায়িত হয়, এর ওপরই নির্ভর করবে বৈঠকের ফলাফল। ’