সিসি ডেস্ক: পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সামলে উঠতে পারছে না র্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দারা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক দুর্বলতা থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে জঙ্গিবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সে কারণে জঙ্গি দমনের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও সংকটের সমাধান করতে হবে। তবে সরকারের নীতি হচ্ছে, কঠোর নীতি অনুসরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়া।
পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁরা মনে করেন, এগুলো সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়। যারা এটা করছে, তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে। ওই কর্মকর্তারা বলছেন, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো নিত্যদিনের অপরাধ মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরিকল্পিত হত্যা বা গুপ্তহত্যা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ ধরনের ঘটনা পুলিশ একা সামালও দিতে পারবে না।
এদিকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পুলিশ দেশজুড়ে সপ্তাহব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে, যাতে সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার—এই চার দিনে অন্তত পাঁচজন সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হয়েছেন ‘বন্দুকযুদ্ধে’।
সরকার মনে করছে, বেছে বেছে এই হত্যার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক এসব খুনের ঘটনায় ওই দল দুটির সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট (সরকারপ্রধান)। সব তথ্য নিশ্চয়ই আমার কাছে আছে।’
প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের আলোকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একাধিক অধ্যাপক বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক দল যদি এ ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে এর সমাধান রাজনৈতিকভাবে হওয়া উচিত।
তবে এ প্রসঙ্গে সরকারের একজন প্রবীণ মন্ত্রী বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিন্তু ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে বৈঠক করেননি। তাঁর প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো সরকারপ্রধান কি আলোচনা করেছেন, না তাদের দমন করছেন বা করার চেষ্টা করছেন?
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড যতটা না আদর্শিক বা মতাদর্শিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। সমাজের একটি শ্রেণি এখন বেশ সংক্ষুব্ধ। তারা হয়তো এর প্রকাশ কোথাও না কোথাও, কোনো না–কোনোভাবে ঘটাচ্ছে।
ওই অধ্যাপকের মতে, সরকার এখন কাউকে কথা বলার সুযোগ দিতে চাইছে না। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অবশিষ্ট নেই। আলোচনা ও সমঝোতার পথ রুদ্ধ হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতি এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই, এর সুযোগ নিচ্ছে অস্বাভাবিক শক্তিগুলো।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাম্প্রতিকতম বাংলাদেশবিষয়ক বিতর্কেও রাজনৈতিক সংকট সমাধানের লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়ে জঙ্গিবাদের উত্থানের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ওই বিতর্কে ভিন্নমত ও বিরোধীদের নিবর্তনের কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলেও অভিমত প্রকাশ করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে জনাকীর্ণ এলাকায় দুর্বৃত্তরা যেমন হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তেমনি নির্জন এলাকা ও ফাঁকা রাস্তা তারা বেছে নিচ্ছে। বেছে বেছে করা একেকটি খুনের ঘটনা একেক ধরনের উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করলেও তা সামাল দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জানতে চাইলে ১৪ দলের সমন্বয়কারী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, কারা এ ঘটনা ঘটাচ্ছে, তা সবাই কমবেশি জানে। তাদের কি ডেকে বলতে হবে, মানুষ জবাই কোরো না?
কোনো রাজনৈতিক শক্তি যদি এটা করে থাকে, তাদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ আছে কি না, এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এটা থেমে যাবে। গত বছরের ৫ জানুয়ারির পর মানুষ পুড়িয়ে মারা বন্ধ করতে হয়েছে। এখনকার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডগুলোও বন্ধ হবে। আর যারা এসব ঘটাচ্ছে তাদের মনে রাখতে হবে, ২০১৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচন হবে না। এসব করে সরকার উৎখাত করা যাবে না।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রাষ্ট্রের ক্ষমতাশালীদের ইঙ্গিত না থাকলে এসব নিখুঁত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে না। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বিএনপির ওই নেতা জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি বিরোধী দলের ওপর এসব হত্যাকাণ্ডের দায় চাপাচ্ছেন। তিনি জানান, জঙ্গিবাদ বিষয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি এর আগে দলের পক্ষ থেকে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সরকার কিছুই শুনতে রাজি নয়।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১০ জুন পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৪৯টি। এঁদের মধ্যে সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী যেমন আছেন, তেমনি আছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী, সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়। নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় জাপান ও ইতালির দুই নাগরিক, প্রকাশক, ব্লগার, পীর, ফকির, সাধু, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ধর্মান্তরিত মুসলিমও রয়েছেন।
সর্বশেষ গত রোববার নিহত মাহমুদা একই ধরনের ঘটনার শিকার প্রথম নারী এবং তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী। পুলিশের মনোবল দুর্বল করতে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। যদিও পুলিশ বলছে, তারা সতর্ক হলেও মনোবল অটুট আছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, পুলিশ কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, হত্যাকারীরা ‘স্লিপার সেল’-এর সদস্য। এক দলের সঙ্গে আরেক দলের যোগাযোগ থাকে না। ফলে ঘটনার গভীরে পৌঁছাতে পারছেন না তদন্তকারীরা।
মন্ত্রী আরও বলেন, হত্যাকারীদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আর রাজনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে মানুষকে সজাগ ও সচেতন করতে হবে। গুটি কয়েক দুর্বৃত্তের কাছে ১৬ কোটি মানুষ জিম্মি থাকতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ‘দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, গুপ্তহত্যাকারীদের খুঁজে বের করুন। কারা পরিকল্পনা করছে দেখুন। তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিন। সবাই সচেষ্ট হলে এদের প্রতিরোধ করা সম্ভব।’ তিনি এসব ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতকে অভিযুক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। এ জন্য জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। হত্যাকাণ্ডগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না করেই বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য কিছু করতে পারেনি।
এখনকার এই পরিস্থিতির জন্য সন্ত্রাসের চেয়ে রাজনৈতিক কারণ বেশি দায়ী বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ব্যাপারী। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের চর্চা হলে ও সরকার গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতো না।
অধ্যাপক নুরুল আমিন মনে করেন, দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। এখনকার সরকার জবাবদিহিমূলক নয়, কর্তৃত্ববাদী। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে হলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না বলে মত দেন তিনি। তাঁর মতে, এখনকার এই পরিস্থিতিতে দেশি-বিদেশি যে–কেউ যেকোনো ধরনের সুযোগ নিতে পারে।