সিসি ডেস্ক: ‘রাজনৈতিক ইনজুরির’ শিকার বিএনপির শেষ ভরসা হয়ে উঠছেন ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচিত তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান। দুর্নীতি মামলায় দলের শীর্ষ দুই নেতার সাজা হলে জোবায়দাকেই ‘বিকল্প নেতা’ বানানো ছাড়া আপাতত কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না বিএনপির।
অর্থ পাচার মামলায় স্বামী তারেক রহমানের সাজা হয়েছে। দুর্নীতির মামলায় শাশুড়ি খালেদা জিয়ারও সাজা হতে পারে। রাজনীতিতে জটিল কোনো বিষয়ের অবতারণা হলে ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাছাড়া বিএনপির বেশ কয়জন সিনিয়র নেতার বিষয়ে রয়েছে তার চরম অবিশ্বাস। খালেদা জিয়াসহ দলের অধিকাংশ নেতাই সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার আশঙ্কা জন্মেছে দলে। এই পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে দলের ‘চেইন অব কমান্ড’। অপরদিকে দিন যত যাচ্ছে সরকারের দমন-পীড়নও তত বাড়ছে। সাংগঠনিকভাবে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় দুর্দশায় রয়েছে দলটি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষয় হতে যাচ্ছে বিশাল নেটওয়ার্কের অন্যতম দলটি। এসব ঘটনার ঘনঘটায় ক্রমেই অনিবার্য হয়ে উঠছেন ডা. জোবায়দা রহমানের প্রকাশ্য অভিষেক। দলের নানামুখী কঠিন বাস্তবতায় রাজনীতিতে হাল ধরছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান। দল ও পরিবারের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে এমন আভাসই পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগেও একবার জোবায়দাকে রাজনীতিতে আনতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন খালেদা। সে সময় দেশের রাজনীতি এবং মিডিয়ার জোরালো আলোচনা ছিল ‘রাজনীতিতে আসছেন জোবায়দা’। কিন্তু তারেক রহমানের অনাগ্রহের কারণে সে আলোচনা বেশিদূর আগায়নি। তখন তারেকের পক্ষে বলা হয়েছিল, রাজনীতিতে না গিয়ে সন্তানদের সময় দিলে পরিবারের জন্য ভালো হবে। তারেকের এমন ইচ্ছায় বিষয়টি নিয়ে খালেদা জিয়াও বেশিদুর আগাননি। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারো দলের জন্য জোবায়দার প্রয়োজন অনুভব করছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার এমন অভিব্যক্তির কথা ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে তারেককে।
অর্থপাচার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তারেকও এখন ইতিবাচক চিন্তা করছেন। তিনি নিজে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনের অযোগ্য হয়েছেন এবং মামলার গতিপ্রকৃতি দেখে ধরে নিয়েছেন তার মা দলের চেয়ারপারসনও সাজা পাবেন। এমন পরিস্থিতিতে জোবায়দাকে নিয়ে নতুন চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছেন তারেক। তাছাড়া দলের সুপ্রতিষ্ঠিত সিনিয়র নেতারাও বিভিন্ন মামলায় সাজা পেয়ে নির্বাচনের অযোগ্য হতে পারেন। বিএনপিকে এরকম নানাবিধ সমস্যায় ফেলে আগামী বছরের যে কোনো সময় আগাম নির্বাচন দিতে পারে সরকার। সব মিলিয়ে সামনের কয়েক মাস পর বিএনপির জন্য আরো বড় ধরনের দুর্যোগ অপেক্ষা করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, চক্রান্ত শুরু হয়েছে মাত্র। অনির্বাচিত ও দুর্নীতিবাজ সরকার তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বিএনপির জনপ্রিয় নেতাদের নির্বাচন করতে দেবে না। সে জন্য তাদের মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে। তারেক রহমানকে দিয়ে এটি শুরু হয়েছে। সবাইকে এই ষড়যন্ত্রের শিকার করতে প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তিনি বলেন, সরকার তারেক রহমানকে সাজা দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়। তবে সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে না। এটা সরকারের ভুল ধারনা। নির্বাচনে জয়ী হতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের দরকার হবে না। কারণ জনগণ এই সরকারের ওপর এমনিতেই ক্ষুব্ধ।
সম্প্রতি অর্থপাচার মামলায় তারেক রহমানের সাজা হওয়ায় এবং দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর পরিণতি নিয়েও বেশ বেকায়দায় পড়েছে বিএনপি। এসব কারণে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে জঙ্গিবাদ ইস্যুতে মাঠে নামার ঘোষণা দেয়ার পরও সক্রিয় হতে পারছে না দলটি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দুদকের, বাকি মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা, নাশকতা ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়া ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ রয়েছে। সব মামলা এখন বিচারাধীন।
তিনি আরও জানান, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টিতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। তারেকের স্ত্রী জোবাইদা রহমানও স্বামীর সঙ্গে দুদকের একটি মামলার আসামি। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে মৃত আরাফাত রহমান কোকোও ৭টি মামলার আসামি ছিলেন। মানহানির একটি মামলায় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (২১ জুলাই) অর্থ পাচারের এক মামলায় তারেক রহমানকে ৭ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে ও জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব সংকটে পড়বে। যদিও দলটির কিছু নেতার বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে বিএনপির ‘দ্বাদশ খেলোয়াড়’ কিংবা ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে আবির্ভূত হবেন তারেক পত্নী ডা. জোবায়দা রহমান।
বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার ‘রাজনৈতিক ইনজুরিতে’ পড়লে দলের হাল ধরবেন জোবায়দা, এমনটাই ভেবে রেখেছেন দলের সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ। অর্থপাচার মামলায় সাজা হওয়ায় তারেক রহমান নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে গেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। আর একইভাবে খালেদা জিয়ার সাজা হলে তিনিও নির্বাচন করতে পারবেন না। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাঠে নেতৃত্ব দিতে পারেন জোবায়দা। আর নেপথ্যে থেকে দিক নির্দেশনা দেবেন খালেদা জিয়া ও তারেক, এমনটিই আলোচিত হচ্ছে দলীয় পরিম-লে।
মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাজা হলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপির পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বলেন, শুধু খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানকে নয়, বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের এই সরকার নির্বাচন করতে দেবে না। অন্তত তাদের কর্মকা-ে তাই বোঝা যাচ্ছে। দলের ক্রান্তিকালে তারেকের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, আসতে পারেন। তবে বিষয়টি জিয়া পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, জোবায়দা রহমানকে রাজনীতিতে নিয়ে আসবেন বলে এর আগেও অনেক আলোচনা শুনেছি, আবারো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দলের প্রয়োজনে চেয়ারপারসন তার কাজের সুবিধার জন্য জোবায়দাকে চাইলে বিএনপির রাজনীতিতে নিয়ে আসতে পারেন।
বিএনপির রাজনীতিতে জোবায়দার অভিষেক হলে পরিবারতন্ত্রের সূচনা হবে কিনা জানতে চাইলে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার পর দলের চেয়ারম্যান হবেন তারেক রহমান। বিএনপির মনোবল অটুট আছে জানিয়ে দলটির এই নেতা বলেন, বিএনপি সকল কিছুকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করছে এবং করবে।
প্রসঙ্গত, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি এক সঙ্কটময় সময়ে দলের হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়াই নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর থেকে বেগম জিয়া একাই সামলে আসছেন সংসার আর রাজনীতির মাঠ। বড় ছেলে তারেক রহমান ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকেই সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। সরকারি ডাক্তার জোবায়দা স্বামী তারেক রহমানের সঙ্গে রয়েছেন লন্ডনে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে চাকরি হারান তিনি। ডা. জোবায়দা নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান মাহবুব আলী খানের ছোট মেয়ে। চিকিৎসার পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয়ও পেয়েছেন তারেক রহমান। এর মাঝে গত ২১ জুলাই অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০ কোটি টাকার অর্থদন্ডসহ তাকে সাত বছরের সাজা দিয়েছে উচ্চ আদালত।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াও এখন আর আগের মতো শারীরিকভাবে সক্ষম নন। তার মাথার ওপরও রয়েছে একাধিক মামলার খড়গ। দুই-এক মাসের মধ্যেই কয়েকটি মামলার রায়ও ঘোষণা করা হতে পারে। এমন বাস্তবতায় দেশের চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বিএনপির আগামী দিনের কান্ডারি হিসেবেই সামনে আনা হচ্ছে জোবায়দাকে। এতদিন দেশের রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে তেমন মাথা না ঘামালেও সাম্প্রতিক সময়ে দলের তৃণমূলের অবস্থা এবং নেতৃত্ব সঙ্কটের ফলে বিএনপিতে নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন ডা. জোবায়দা। তাছাড়া রাজনীতি নিয়ে ক্লান্ত শাশুড়িকে উপযুক্ত সঙ্গ দিতে তিনি আগ্রহী বলে পরিবার সূত্র জানায়।