সিসি ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই মুহূর্তে ব্যক্তিগত সফরে লন্ডন অবস্থান করছেন। তার এই সফর ব্যক্তিগত হলেও রাজনীতিতে ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ক্ষমতাসীনরা এ সফরকে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যায়িত করেছে।
বিএনপি নেত্রীর সফর নিয়ে যেমন বারবার তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। তেমনি দেশে ফেরা নিয়েও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়া আদৌ শিগগির দেশে ফিরবেন কি না কারো কারো মনে সে প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছে। আর বিএনপি নেতারাও জানেন না ঠিক কবে দেশে ফিরবেন দলীয় প্রধান। খালেদা জিয়ার সফর ঘিরে নানা প্রত্যাশা থাকলেও অভিভাবকহীন বিএনপি নেতাকর্মীরা এক ধরনের অস্বস্তিতে ভুগছেন।
খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের কোনো টাইম ফ্রেম না থাকলেও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলাওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়, যা সিনিয়র নেতাদের বড় একটা অংশ মেনে নিতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মতো একটি দলে মহাসচিব না থাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন-কৌশলে বারবার পরাজিত হয়ে যে শিক্ষা অর্জন হয়েছে তাও ‘সঠিকভাবে’ কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলেও শোনা যায়।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বিএনপির জন্য যেমন অস্বস্তির, তেমনি স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে স্বীকৃত জামায়াত ইসলামীর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক জোট করা নিয়ে বিএনপিকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তাছাড়া বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে নিয়েও বিএনপিকে কম ঘামতে হচ্ছে না।
বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলীয় নেতা থাকাকালীন ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে তাকে যেভাবে বের করা হয়েছিল তার ধকলও বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর পড়েছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপির করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। দল পুনর্গঠনের পাশাপাশি নতুন আন্দোলন-কৌশলের ছক আঁকা হয়। আন্দোলনের সময় ঘনিয়ে এলেও দল পুনর্গঠন শেষের বাকি অনেক। এ অবস্থায় আবারো সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনে নামে বিএনপি। এতে দলের অনেক নেতাকর্মীর পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহত, আহত, নিখোঁজের পাশাপাশি রয়েছে ক্ষমতাসীন নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে হয়রানি নির্যাতনের অভিযোগ। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ডজন ডজন মামলা।
এ আন্দোলনে ব্যর্থতার মুখ দেখে আবারো দল পুনর্গঠনের কথা বলেন খালেদা জিয়া। দলের পক্ষ থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দলীয় ৭৫টি সাংগঠনিক জেলাকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া লন্ডন সফরের আগে দলীয় সিনিয়র নেতাদের ডেকে এ ব্যাপারে আরো তাগিদ দেন। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। একমাত্র ঝালকাঠি জেলা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুত হয়েছে বলে দাবি করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর।
তারপর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়নি। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে দলের মধ্যে সংঘাত লক্ষ্য করা গেছে। পকেট কমিটি, কমিটি বাণিজ্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। লন্ডনে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠানে হযবরল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশবেষ্টিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দুজন নেতার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ বলেছেন, ‘কোথাও কোথাও কেন্দ্রীয় নেতারা হস্তক্ষেপ করছেন।’ তার জানামতে, ‘কমিটি গঠন প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রয়েছে।’
এরই মধ্যে ঘটে দুই বিদেশি হত্যার ঘটনা। এতে সরকারপ্রধান লন্ডনে থাকা নেত্রীকে দায়ী করেছেন। বিদেশি হত্যাকাণ্ডের পর এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী মঈন খানকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলেন। সে থেকেই তিনি লাপাত্তা। মঈন খানের সঙ্গে বিএনপির আরো দুই নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তার মধ্যে একজন সাবেক ছাত্রনেতা ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর শরফত আলী শপুর নাম। ঢাকার কূটনীতিকপাড়ায় ইতালি এবং রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যার স্টাইল অনেকটা একই রকম বলে খবরে প্রকাশ। রংপুরের ঘটনায় পুলিশ যাদের আটক করেছে তাদের মধ্যে হাবিব উন নবী খান সোহেলের ভাই রয়েছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
এর আগে গুঞ্জন ছিল খালেদা জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন চৌধুরী এবং মুজাহিদুল ইসলামের রায়ের পরিস্থিতি বিবেচনা বা ফরেন সিগন্যাল নিয়ে দেশে ফিরবেন। কিন্তু দুই বিদেশি হত্যার ঘটনায় খালেদার দেশে ফেরা শিগগিরই হবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৫ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপি চেয়ারপারসনের রোগমুক্তি কামনা করে ছাত্রদলের এক দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা আশা করব, তিনি অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। এসে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঠিক পথে আমাদেরকে নেতৃত্ব দেবেন এবং সেই পথে ইনশাল্লাহ বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত হবে। দেশের মানুষ নেত্রীর আগমনের প্রতীক্ষায় আছে।’
তবে, ‘ফিরে এসে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঠিক পথে আমাদেরকে নেতৃত্ব দেবেন’ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের এই বক্তব্যে কোনো কিছুর ইঙ্গিত আছে বলেই কেউ কেউ অনুমান করছে।
ওদিকে স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহাবুবুর রহমানের করা মন্তব্য নিয়ে ক্ষিপ্ত বিএনপির অন্যতম মিত্র জামায়াত। সব মিলিয়ে বিএনপির এখন হযবরল অবস্থা।