সিসি ডেস্ক: সঙ্কট যেন পিছু ছাড়ছে না বিএনপির। একের পর এক ব্যর্থতায় রাজনীতিতে টিকে থাকাই দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণায় নতুন সঙ্কটে পড়েছে দলটি। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি ভাঙার নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে মাইনাস করে বিএনপি ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে সে সন্দেহ আরো তীব্র হচ্ছে।
সূত্রমতে, সম্প্রতি দুই বিদেশি নাগরিক হত্যায় খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ইন্ধন থাকার অভিযোগ করছেন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। লন্ডন থেকে হত্যার নির্দেশ এসেছে বলে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। বিএনপি-জামায়াত পরিকল্পিতভাবে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় বলে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে হত্যাকা-ে বিএনপি নেতাদের জড়িত থাকার খবর প্রকাশ হয় গণমাধ্যমে। এরপরই আত্মগোপনে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ অনেকে।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার দাবি ক্রমেই জোরাল হচ্ছে। এই দাবি পাশ কাটানোর লক্ষ্যে বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন এবং নেতাদের দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এমনকি বিএনপির রাজনীতি থেকে সরে না দাঁড়ালে বিদেশি হত্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়ার ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে অনেক শীর্ষ নেতাকে। শমসের মবিন চৌধুরী সরকারের চাপে পদত্যাগ করেছেন বলেও অনেকে মনে করেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, সরকারের সঙ্গে ‘আঁতাত’ করেই শমসের মবিন নাশকতার মামলায় কারাগার থেকে জামিনের মুক্তি লাভের অভিযোগ ছিল। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়। এরপর তিনি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। এ ছাড়া ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক না করায় দলের একটি অংশ দায় চাপায় তার ওপর। ২০১৪ সালে তারেক রহমানের সঙ্গে তার ফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন তারেক। এসব কারণে দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি।
শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, সম্পূর্ণ শারীরিক কারণে আমি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছি। আমি বাইরে যেতে পারি না, আমার চলাফেরার মধ্যে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ অবস্থায় রাজনীতি করতে হলে যে ধরনের শ্রম, সময় দেয়া প্রয়োজন, শারীরিক কারণে সেটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। খালেদা জিয়া পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করলে কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তো সরকারি চাকরি নয়। স্বেচ্ছায় কেউ রাজনীতি করে এবং স্বেচ্ছায় মানুষ রাজনীতি থেকে অবসরও নেয়। আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। আমি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছি, এখন থেকে অবসরেই থাকব। সুস্থ হলে ভবিষ্যতে দেশের কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, দলবদলে বিশ্বাস করি না। আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী।
সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছে দিতে গত বুধবার রাতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্তরার বাসায় যান শমসের মবিন। তিনি ফখরুলের হাতে পদত্যাগপত্র তুলে দেন। ফখরুল প্রাপ্তি স্বীকারপত্রও তাকে দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে ফখরুলের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একধিকবার কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়।
চিঠিতে খালেদা জিয়াকে সম্বোধন করে তিনি লিখেছেন, আপনি নিশ্চয় অবগত আছেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলাম। সে কারণে আমাকে বিভিন্ন সময় দেশে বিদেশে নানাবিধ চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বর্তমানে আমার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটেছে। আমার বর্তমান স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে আমি অনতি বিলম্বে রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবসর গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সব পদ থেকেও পদত্যাগ করলাম। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে সামনে রেখে দেশ ও জাতীয় কল্যাণে কাজ করার প্রয়াস আমার চিরকাল থাকবে। আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
এদিকে বৃহস্পতিবার জেলহত্যা দিবসের প্রস্তুতি সভা শেষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সহিংসতামূলক কর্মকা- বিএনপির অনেক নেতা পছন্দ করেন না। তাদের এসব কর্মকা-ের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে শমসের মবিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। আমার বিশ্বাস বিএনপির মধ্যে এখনো যারা বিবেকবান আছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, তারা এই দল ও সন্ত্রাসীদের পেছন থেকে বেরিয়ে আসবেন। তারেক রহমান ও খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে দলকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাবেন। তারপর মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবেন। এর আগে ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শমসের মবিন চৌধুরীকে ‘একজন বেঈমান’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ডিসেম্বরের মধ্যেই দুটি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলায় তারেক রহমানের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলছে। সাজা আতঙ্কে খালেদা জিয়া সহসাই দেশে ফিরবেন না বলে চাউর হয়েছে। তার অবর্তমানে মামলায় জড়ানো ও সাজার ভয় দেখিয়ে শীর্ষ নেতাদের দিয়ে বিএনপি ভেঙে সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাই আহমেদ কামালকে সামনে নিয়ে আসা হতে পারে। জিয়া পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় তিনি ৪ নভেম্বর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছেন। এ উদ্যোগকে দল ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন বিএনপি নেতারা।
এ ছাড়া খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার পর বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য আবু হেনার নেতৃত্বে বিএনপি ভাঙার তৎপরতা শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিনে তিনি বিএনপির সাবেক বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেছেন। আজ শুক্রবার বিএনপিপন্থি পেশাজীবীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ অতিথি করা হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বাদ দিয়ে তাকে অতিথি করায় বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্র আরো স্পষ্ট হচ্ছে। আরো বেশ কিছু নেতা পদত্যাগ করে ভাঙন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দলের কঠিন সঙ্কটকালে পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নেতারা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। প্রায় দিন ব্রিফিং করা হলেও গতকাল তা বন্ধ রাখে। করণীয় নিয়ে লন্ডনে কয়েক দফা যোগাযোগ করেছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সরকারের নির্যাতনে যদি বিএনপির সব নেতাও রাজনীতি থেকে অবসর নেন- তাতেও দলের কিছু হবে না। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ঠিক থাকলে সব ঠিক। শেখ মুজিবুরের আমলেও অনেক নেতা অবসর নিয়ে রাজনীতি থেকে সরে গেছেন। তাতে আওয়ামী লীগের কিছু হয়নি। মূল কথা নেতাকর্মীদের মাঝে আদর্শ ঠিক থাকলেই হলো। তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছানো কোনো ব্যাপার নয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, রাজনীতি করা না করা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয়। তবে শমসের মবিন চৌধুরী সবসময় জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষেই থাকবেন বলে আশা করছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে শমসের মবিন চৌধুরী পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দুই বছর চাকরি মেয়াদ শেষে করে ২০০৮ সালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ওই সময় তাকে চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা করা হয়। ২০০৯ সালে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। তিনি একজন যুদ্ধাহত ও বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।