সিসি ডেস্ক: জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া সাময়িক নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানির উদ্যোগ নেয়নি দলটি দুই বছরেও। নতুন করে নিবন্ধন পাওয়ার কোনো চেষ্টাও নেই দলটির। রাজনৈতিকভাবে জামায়াত এতটা কোণঠাসা যে এখন দল হিসেবেও নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধ হতে পারে-এই ভয় তাড়া করছে দলের নেতাদের। এ কারণে নিবন্ধন-সংক্রান্ত আপিলের শুনানি করতে তাদের আর আগ্রহ নেই বলে জানা গেছে। নতুন কোনো দল গঠন করা হবে, নাকি জামায়াতে ইসলামীকেই পুনর্গঠন করা হবে, সেই হিসাব কষছেন দলটির নেতারা। দলের তৃতীয় সারির কয়েকজন নেতা ও এক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একের পর এক মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় এমনিতেই অনেকটা নেতৃত্বহীন অবস্থায় আছে দলটি। তার ওপর নাশকতার মামলায় বিভিন্ন পর্যায়ের আরো অনেক নেতা কারাগারে কিংবা পলাতক আছেন। সারা দেশে দলের কর্মীদেরও একই অবস্থা। এ ছাড়া জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দুই বছর ধরে অবস্থান করছেন বিদেশে। তাঁর ভূমিকা নিয়েও আছে নানা গুঞ্জন। এ অবস্থায় নিবন্ধন নিয়ে আইনি লড়াইয়ে সফল হওয়া যাবে কি না, সে বিষয়েও সংশয়ে আছেন দলের নেতারা। এ কারণে নিবন্ধন নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথাও নেই বলে জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিবন্ধন নিয়ে আপিল সম্পর্কে জামায়াতের বর্তমান অনেক নেতা কোনো খোঁজও রাখেন না। আপিলটি সম্পর্কে বলতেও পারেন না তাঁরা। এমনকি জামায়াতের আইনজীবীরাও জানেন না আপিলটি শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না।
জামায়াতের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল চেয়ে রিট আবেদনের ওপর শুনানিতে হাইকোর্টে আমি আইনজীবী হিসেবে ছিলাম। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল করার পর শুনানির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সেখানে মামলা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তিনি দেশে নেই। এ কারণে এ মামলার বিষয়ে আমি আর কিছুই জানি না।’
জামায়াতের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা সত্যিই এখন কোণঠাসা। দলই নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকির মুখে। নিবন্ধন নিয়ে বেশি কিছু করার সময় এখন নয়। তা ছাড়া এই মুহূর্তে নিবন্ধন-সংক্রান্ত আপিল কী অবস্থায় আছে, তাও জানি না।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সহকারী মতিউর রহমান আকন্দর মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। আরো কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে তাঁদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
জামায়াতকে ২০০৮ সালে ইসির দেওয়া সাময়িক নিবন্ধন অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট সংক্ষিপ্ত রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ এ রায় দেন। তিন বিচারপতির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ (দুজন) বিচারপতির রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়। বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন জামায়াতের নিবন্ধনের বিষয়টি ইসিকে দ্রুত নিষ্পত্তি করার পক্ষে মত দেন। অন্য দুই বিচারপতি নিবন্ধন বাতিল ও অবৈধ বলে রায় দেন। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন দেওয়া সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) কোথাও সাময়িক নিবন্ধন দেওয়ার বিধান নেই। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীকে ইসি যে নিবন্ধন সনদ দিয়েছে, তাতেও সাময়িক সনদ দেওয়ার কথা উল্লেখ নেই।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় একই বছরের ২ নভেম্বর। এরপর দলটির নিবন্ধন বাতিল করে ইসি। এ অবস্থায় জামায়াত নিজস্ব দলীয় প্রতীক নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। আরপিও অনুযায়ী শুধু ইসিতে নিবন্ধিত দলই জাতীয় সংসদে নির্বাচন করার সুযোগ পায়। এ কারণেই জামায়াত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। পাশাপাশি হাইকোর্টের রায় স্থগিত করারও আবেদন করা হয়। কিন্তু ওই আবেদনের ওপর আর শুনানি করার উদ্যোগ নেয়নি দলটি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট অংশ না নেওয়ায় তারা আপিল শুনানি থেকে দূরে থাকে।
বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান-এর সভাপতি হুমায়ূন কবির, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট মওলানা জিয়াউল হাসানসহ ২৫ ব্যক্তি ২০০৯ সালে জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই রিট আবেদন করেছিলেন।
দুই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েও চুপ : দলীয় সূত্রে জানা যায়, সাময়িক নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর জামায়াত পুনরায় নিবন্ধন ফিরে পেতে দুই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একদিকে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করার জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। পাশাপাশি ইসিতে নতুন করে নিবন্ধন পাওয়ার জন্য আবেদন করার চিন্তা ছিল। এই দুই বিষয়ে আইনজীবীদের মতামতও নেওয়া হয়। আইনজীবীরা আপিলের সঙ্গে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করার জন্য আবেদন করতে পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে ২০১২ সালের ২ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা জামায়াতে ইসলামীর সংশোধিত গঠনতন্ত্র সংযুক্ত করে নিবন্ধনের জন্য ইসিতে নতুন করে আবেদন দাখিল করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আইনজীবীদের পরামর্শ অনুযায়ী আপিল করা হয়। কিন্তু নিবন্ধন ফিরে পেতে নতুন আবেদন করা থেকে বিরত থাকে দলটি। আপিল শুনানির বিষয়েও দুই বছর ধরে নিশ্চুপ রয়েছে জামায়াত।
জামায়াতের একাধিক নেতা জানান, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেহেতু তাঁদের জোট অংশ নেয়নি, আবার পরবর্তী নির্বাচনও অনেক দূরে; তাই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এগোনোর চিন্তা করা হয়। এ ছাড়া আপিল শুনানি করলে হাইকোর্টের আদেশ যদি বহাল থাকে, তাহলে যাওয়ার আর জায়গা থাকবে না। এ কারণেই তাঁরা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জামায়াতের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছেন। অন্য কোনো পথেই হাঁটছেন না। জামায়াত ভেবেছিল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট লাগাতার হরতাল-অবরোধ চালিয়ে গেলেই সরকারের পতন হবে। আর নতুন সরকারে তারা অংশীদারত্ব পাবে। এ কারণেই আপিল দায়ের করেও শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।