বাছির জামাল :লেবানন বংশোদ্ভূত কবি কাহলিল জিবরান বলেছেন, Exaggeration is truth that has lost its temper. অর্থাৎ অতিকথন বা অতিশয়োক্তি এমনই এক সত্য বিবৃতি যেখানে ওই বিবৃতির প্রকৃত রূপ হারিয়ে যায়। লেখার শুরুতেই কাহলিল জিবরানের এই উক্তিটি উদ্ধৃত করতে হলো এ বিষয়টি বুঝানোর জন্য যে, কথা বলা ভালো। কিন্তু অতিকথন, যত সত্যই হোক, সমাজে গ্রহণযোগ্য হয় না।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ইদানীংকার কথাবার্তা, বক্তৃতা-বিবৃতি যদি লক্ষ্য করি, তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি পেশায় চিকিৎসক। কিন্তু রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। তার এ সময়কার বক্তৃতার একটি বহুল চর্চিত বিষয় হচ্ছে বিএনপি। এ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কি করতে হবে এবং বিএনপির রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, কি করলে ভালো হয়, কিভাবে রাজনীতি করতে হবে তা নিয়ে একের পর এক কথা বলে যাচ্ছেন। এমনকি তিনি সংবাদপত্রের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বরাবর বিএনপির রাজনীতি বিষয়ে একটি চিঠিও দিয়েছেন।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী সর্বশেষ রামপাল নিয়ে বিএনপি সমর্থক প্রকৌশলীদের এক গোলটেবিল আলোচনায় খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, হতাশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ওনার আলো দরকার। তাই তিনি অনুরোধ করেন, ‘খালেদা জিয়ার প্রতি আমার আবেদন, ওনার রাতে মিটিং করে এত বিদ্যুৎ অপচয় করা ঠিক নয়। এই মিটিংটা বিদ্যুৎ অপচয় রোধের স্বার্থে ওনাকে দিনের বেলা, বিকাল বেলা করতে হবে। উনি সাহসী। উনি অতীতে কম সাহসের পরিচয় দেননি। নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, কিন্তু তিনি সময়মতো বেরিয়ে আসেননি।’
এর আগে গত ২১ আগস্ট তিনি একটি খোলাচিঠি দেন বিএনপি চেয়ারপারসনকে। বিএনপির নানা পুনর্গঠন সম্পর্কিত পরামর্শমূলক চিঠিটি পরের দিন দেশের সব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ খোলাচিঠিতে এবার ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন না করায় খালেদা জিয়াকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি তার কিছু ভুল কাজের সমালোচনা করেছেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শব্দের ওই চিঠিতে তিনি খালেদা জিয়াকে জামায়াতের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, দলে গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র চর্চা করা, উপদেষ্টা পরিষদে বিশিষ্টজনদের কো-অপ্ট করা, ড. কামাল হোসেনের দলসহ কয়েকটি দলকে নিয়ে একসঙ্গে জনসভার ঘোষণার পরামর্শ দেন।
এর বাইরে বর্তমান প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার করণীয় সম্পর্কেও চিঠিতে তুলে ধরেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। চিঠিতে তিনি খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ২০ দলের বাইরের বিরোধী দলগুলোকে একত্র করে বাংলাদেশে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সুসংহত করার জন্য আপনার হাতে সময় আছে বড়জোর ৯ মাস। সম্ভবত এ সময়ের মধ্যে আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় রাজনীতির আলোকে বিচারের রায় বের হবে। এ কয়েক মাস পরিশ্রম করলে জনগণের রায় আপনার পক্ষে আসার সম্ভাবনা সমধিক বলে চিঠিতে মন্তব্য করেছেন তিনি। জাফরুল্লাহ চৌধুরী তারেক রহমানকে নিয়ে বলেন, তারেক রহমান আমারও ¯েœহের। লন্ডনে বসে ভালোই করছেন। তাই বলে ওখানে বসে তার হুকুমে পার্টি চালানো যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমি শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে তর্ক করে আমি আজও বেঁচে আছি। আপনার সঙ্গে তর্ক করে আমি ফিরে যেতে পারব তো? তিনি বললেন, এটা কী বলেন? আমি বললাম, আপনি এমন কিছু করবেন না, যাতে এই ছবিটা কেউ নামিয়ে ফেলে। তিনি বললেন, কী করতে হবে? সেক্রেটারিয়েটে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে তার মাথার ওপরে শেখ মুজিবের ছবি ছিল। আমি সেদিকে নির্দেশ করে বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডানে মাওলানা ভাসানীকে বসিয়ে দিন। আর বঙ্গবন্ধুর পায়ের নিচে জেনারেল ওসমানী ও জিয়াকে বসিয়ে দিন। এই চারটি ছবি একসঙ্গে থাকলে আর তা কখনো নামবে না।’ তিনি এমন আরও অনেক কথাই বলেছেন যা সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়েছে। তিনি এসব সংবাদের কোনো প্রতিবাদ করেছেন বলে দেখিনি। তাই ধারণা করছি, তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, সেভাবেই তার বক্তৃতা সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়েছে।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে কে না চেনেন। তিনি গরিব ও পান্থজনদের দোরগোড়ায় কম খরচে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার নজির স্থাপন করেছেন যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তিনি আমাদের গৌরব একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সেনানী। পেশায় চিকিৎসক হলেও রাজনীতি তার একটি উপভোগ্য বিষয়। তিনি রাজনীতির সাম্প্রতিক বিষয়-আশয় নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সভায়-সুধী সমাবেশে কথা বলেন। তার এসব বক্তৃতায় বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতির একটি চিত্র ফুটে ওঠে। আর সেজন্য তার বক্তৃতায় কোনোটিতে রাজনীতি বিশ্লেষকদের জন্য চিন্তার খোরাকও থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার বক্তৃতা-বিবৃতি নিয়ে জনমনে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। অনেকে বলেন, তার বক্তৃতা অতিকথনে দুষ্ট। আর কে না জানে যে, অতিকথন ও অতিশয়োক্তির কোনো মূল্য সমাজে নেই।
বিচারকদের নিয়ে কটূ মন্তব্য করার কারণে আদালত গত বছরই তাকে ‘এক্সট্রিমলি রং হেডেড’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এর আগেও অবমাননার অভিযোগে দুই দফায় আদালতে আসা জাফরুল্লাহর মন্তব্যকে আদালত একজন ‘অবিবেচক ব্যক্তির বক্তব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আসলে সব কাজেই পরিমিতি থাকা চাই। পরিমিতিবোধ না থাকলে যেকোনো ভালো কাজও নষ্ট হয়ে যায়। যেমনভাবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তৃতা, কথাবার্তা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না, বরং এ নিয়ে চলছে সমালোচনা। এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কেবল তার কথাবার্তায় পরিমিতি না থাকার কারণে।
লেখক: সাংবাদিক