সিসি ডেস্ক: সারাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্তত ১৫টি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ভেতরে রয়েছে ঘোরতর মতবিরোধ। রাজনৈতিক আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এক হলেও এসব জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক একে অপরকে সহ্য করতে পারেন না। কেউ কাউকে মানেনও না। উভয় নেতার মধ্যে নিজের দল ভারি করা ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার প্রবণতা কাজ করে বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও দফতর সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ভেতর মতবিরোধ আছে এমন জেলাগুলোর মধ্যে খুলনা, জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, নেত্রকোনা, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চাঁদপুর ও বান্দরবান রয়েছে।
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বার বার দলীয় ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও এসব জেলার চিত্র ভিন্ন। এসব জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে সুসম্পর্ক তো নেই-ই, বরং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একে অপরের প্রতিপক্ষ বনে গেছেন। জানা গেছে, সুসম্পর্ক না থাকায় জেলাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দৈন্যদশা চলছে। এর সত্যতা স্বীকার করেছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, ‘কয়েকটি জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক একে অপরের মধ্যে মতবিরোধের তথ্য আমাদের কাছেও আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বড় একটি রাজনৈতিক দল। মতবিরোধ থাকতেই পারে। তবে দুঃসময়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়।’
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, সব নেতা এক রকম হয় না। তাই কোনও কোন জেলায় মতবিরোধ হয়। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়, তাই সুযোগ সুবিধা কম-বেশি নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। হালুয়া-রুটির আশা তো সবাই করে।’
সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘মতবিরোধ থাকবেই। এগুলো মোকাবেলা করে পথ চলতে হবে।’
যেসব জেলায় মতবিরোধের খবর পাওয়া গেছে এমন কয়েকটি জেলায় অনুসন্ধান চালানো হয়। বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোমিন তুলু। প্রায় ১০ বছরের পুরনো কমিটি দিয়ে চলছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। এ জেলায় সাধারণ সম্পাদকই সর্বেসর্বা। সভাপতি ফজলুল কাদের মজনুকে পাত্তাই দেন না আব্দুল মোমিন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদধারী এক নেতা বলেন, দুজনের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব।
জানা গেছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ভোলার প্রবীণ দুই নেতার ইশারায় চলেন। দু’জনের দূরত্ব জেলার রাজনীতিকে চরম দুর্বল করে তুলেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়। আরও জানা গেছে, জেলার শীর্ষ এ দুই নেতার কোন্দলে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে একাধিকবার মারামারি হয়েছে। সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনেও দুই নেতা আলাদা আলাদা প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন। শুধু তাই নয়, দুই নেতার কোন্দলে সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের দুটি কমিটি রয়েছে। সদর উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়নেও এ দুই নেতার পক্ষের আলাদা আলাদা কমিটি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সভাপতি ফজলুল কাদের বলেন, রাজনীতি আর রাজনীতির জায়গায় নেই। এটি এখন স্বার্থের হয়ে গেছে। দলীয় কার্যালয়ে না যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এটি এখন দলীয় কার্যালয় নেই, দুর্নীতির আখড়া।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ হারুন অর রশীদ ও সাধারণ সম্পাদক হন এস এম মোস্তফা রশীদ সুজা এমপি। দুজনের মধ্যে চরম মতবিরোধ ও নিজের দল ভারী করার কারণে জেলায় এখনও পুর্নাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, ওই জেলায় সভাপতি হতে চেয়েছিলেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সুজা। সভাপতি হারুনকে ম্যানেজ করতে না পারায় সুজার সভাপতি হওয়ার স্বপ্নপূরণ হয়নি। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সম্মেলনের দিনই কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে হারুন গ্রুপের লোকজন মারধর করে সুজার অনুসারীদের। কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে মারামারি বন্ধ হয়।
জেলার দায়িত্ব নিলেও ২৬ ফেব্রুয়ারির পর থেকে আজ পর্যন্ত মুখোমুখি হননি হারুন-সুজা। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট খুলনা মহানগর আয়োজিত এক স্মরণসভায় হারুন-সুজা উপস্থিত হলেও কথা হয়নি দুজনের মধ্যে।
এ সম্পর্কে সভাপতি শেখ হারুন অর রশীদ বলেন, অনেক সময় মতবিরোধ থাকে। এটা স্থায়ী হয় না। জানতে চাইলে মোস্তফা রশীদ সুজা বলেন, আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে চাই না।
জয়পুরহাট জেলার সভাপতি শামসুল আলম দুদু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলী। জেলার পুরনো এক নেতা জানান, দুজনের কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না। তবে সভাপতি দুদু এ এলাকার সজ্জন রাজনীতিক বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, সোলায়মান আলী নিজের আধিপত্য বিস্তার করতেই সভাপতিকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন। জানা গেছে, সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান আলী বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে দলে যোগদান করাচ্ছেন সভাপতিকে না জানিয়েই। আর তা মেনে নিতে পারছেন না জেলার সভাপতি দুদু। আগস্টের শেষের দিকে দলীয় কার্যালয়ে বসে অন্য নেতাকর্মীদের কাছে এ ক্ষোভের কথা জানান দুদু। তাছাড়া সভাপতি হলেন এমপি, সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জেলা প্রশাসক। দু’জনের ভেতর ক্ষমতার টানাপড়েনও রয়েছে। রাজনৈতিক সখ্যতা না থাকায় ওই জেলায় প্রকৃতপক্ষে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও ভিত্তি দুর্বল বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। তবে সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলী মতবিরোধের কথা অস্বীকার করেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দবিরুল ইসলাম। সাধারণ সম্পাদক সাদেক কোরাইশী। এ দুজনের মধ্যেও বিরোধ রয়েছে। জেলায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে হেন কোনও কাজ নেই যা তিনি করেন না। সঙ্গে আছেন পুত্র মাজহারুল ইসলাম সুজন। ওই জেলার সভাপতিও বলতে গেলে তিনি, সাধারণ সম্পাদকও। সাদেক কোরাইশীকে ছাড়াই সব সিদ্ধান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়। নামমাত্র পদে রয়েছেন কোরাইশী। জানা গেছে, এসব কারণে সাদেক কোরাইশী জেলার রাজনীতিতে অনেকটাই কোণঠাসা। তাছাড়া দবিরুল পরিবারের প্রভাবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে না ওঠায় চুপসে আছেন সাদেক।
নেত্রকোনার আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মতিয়ার রহমান খান আর সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু। দু’জনের মধ্যে চরম বিরোধ চলছে। মাস দুয়েক আগে কলমাকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এ বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ওই সম্মেলনে আশরাফ আলী খান খসরুকে মতিয়ারের লোকজন চরম অপমান করে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ওই দিন কলমাকান্দা উপজেলায় সম্মেলনে খসরু ভোটের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি করে সভাপতি মতিয়ারের চক্ষুশূল হন। এর আগেও দুজনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে টানাপড়েন দেখা দেয়। পরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুই জন দুই মেরুর হয়ে পড়েন। সভাপতির কারণে সাধারণ সম্পাদক ওই জেলায় অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক কার্যালয়েও দু’জনের একসঙ্গে যাতায়াত কম চোখে পড়ে বলে জানা গেছে। আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, মত পার্থক্য হয়, মতবিরোধ নয়।
কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক মেজর জেনারেল (অব.) আমসাআ আমিন, জেলার সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি জাফর আলীর সঙ্গে গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে টিকতে না পেরে রাজনীতিই ছেড়ে দিয়েছেন। আমিন এখন জেলা পরিষদের প্রশাসক হলেও ঢাকাতেই বেশি সময় কাটান।