সিসি ডেস্ক: নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে মুখোশ পরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আর এই সিদ্ধান্তের ফলে মুখোশ তৈরি ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।
মুখোশ তৈরি ও কেনাবেচার পেশায় জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা বছর ধরে উৎসবমুখর এই দিনটির জন্য তারা অপেক্ষা করেন। উৎসবে অংশ নেওয়ার জন্য নয়, খানিকটা বাড়তি আয়ের জন্য অপেক্ষা থাকে খেটে খাওয়া এই মানুষগুলোর। বিভিন্ন ব্যাংক ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে মুখোশ তৈরি করেন তারা বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে।
এ বছর সরকার কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পয়লা বৈশাখে মুখোশ নিষিদ্ধ করায় স্বাভাবিকভাবেই হাজার হাজার টাকার লোকসান গুণতে হচ্ছে এই পেশাজীবীদের। অনেক বিক্রেতা পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান উপলক্ষে চীন থেকে আমদানি করে এনেছিলেন বাহারি রঙের বিপুল পরিমাণ মুখোশ। কিন্তু সরকারের হঠাৎ নিষেধাজ্ঞার কারণে সমস্ত মুখোশের ঠিকানা এবার গুদাম।
এ সম্পর্কে এলিফেন্ট রোডের আল্পনা জরি হাউজের মালিক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘অনুষ্ঠানের দু’ তিন মাস আগে থেকেই মুখোশ বানানোর জন্য অর্ডার দিয়েছিলাম কারিগরদের। কিন্তু এখন সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্রেতারা মুখোশ কিনছেন না। তাই কারিগদের টাকা পরিশোধ করতে পারছি না। হাজার হাজার টাকার লোকসান দিয়ে পথে বসতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার যদি হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে আগেই সতর্ক করত, তাহলে আমাদের ক্ষতি কিছুটা কম হতো। মুখোশ তৈরি, রং করা সব শেষে বিক্রি করার সময় এসে সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হলো। এই হাজার হাজার মুখোশ নিয়ে এখন কোথায় যাব, কী করব আমরা?’
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, দোকান-মালিকরা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান উপলক্ষে ফুল, ব্যানার ও বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে মুখোশের ক্ষতি খানিকটা পোষাতে পারলেও চাপে পড়েছেন কারিগররা।
এ বিষয়ে কারিগর মো. কায়েস বলেন, ‘বৈশাখী অনুষ্ঠানের জন্য একটা সমিতি থেকে মুখোশ বানাতে ১০ হাজার টাকা লোন নিছিলাম। কিন্তু এখন সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় মহাজনরা মুখোশ কিনতেছে না। এখন কেমনে লোনের টাকা ফেরত দিব, পরিবারের খরচ মিটাব, বুঝতেছি না।’
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে মুখোশ শিল্পী রবি বিশ্বাস বলেন, ‘সরকার গত বছরের যে ঘটনার কারণ দেখায় মুখোশ পরা নিষিদ্ধ করেছে, ওই ঘটনায় জড়িতদের কেউ কি মুখোশ পরে ছিল ঘটনার সময়? পুলিশের সামনেই যা ঘটানোর ঘটাই চইলা গেছিল তারা। পুলিশ কিছু করতে পারে নাই। তাহলে কেন সরকার মুখোশ নিষিদ্ধ করছে?’
সরকারের সিদ্ধান্তে এই পেশার সঙ্গে জড়িত হাজারো কর্মীকে পথে বসতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে মুখোশ নিষিদ্ধ করাকে সংস্কৃতির উপর আঘাত মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রধান অনুষঙ্গ মুখোশ এবং নববর্ষের মূল ভাবনাকেও অনেকাংশে ধারণ করে মুখোশ।
এ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, ‘সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মুখোশ পরে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করাটা আমাদের সংস্কৃতি। সরকার কি আমাদের সংস্কৃতি রক্ষায় শোভাযাত্রা চলাকালীন চারুকলা থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা দিতে পারে না!’
এর ফলে পয়লা বৈশাখ উদযাপন বন্ধ করতে সাম্প্রদায়িক শক্তির দীর্ঘদিনের চেষ্টাকে বর্তমান সরকার সফল করে দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগে ৩ এপ্রিল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, দেশে প্রকাশ্য স্থানে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান বিকেল পাঁচটার মধ্যে শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে ভুভুজেলা নামে পরিচিত উচ্চ শব্দের বাঁশি বাজানো এবং মুখোশ দিয়ে মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ করা হয় ।