• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

আমদুধ, রাজনীতি এবং বাঘের ঝুনঝুনি

রনি।। গোলাম মওলা রনি ।। আমদুধের কথা এলেই এক পীর এবং তার মুরিদের গল্পটি মনে পড়ে যায়। মুরিদের বাড়িতে এসে পীর সাহেব ভক্তের দেয়া আম ও দুধ আচ্ছামতো মাখালেন। তারপর হঠাৎ মুখ কালো করে ফেললেন এবং একটি চামচ আনতে বললেন। এরপর চোখবুজে চামচ দিয়ে ইতঃপূর্বে হাত দিয়ে চটকানো আমদুধের মিশ্রণ গলাধঃকরণ করে হাসিমুখে ভক্তের দিকে তাকালেন। ভক্ত ভারী আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চোখ দু’টিকে গোল করে পীরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঘটনা বুঝতে পেরে পীর সাহেব বললেন, বাবা, আগে বুঝতে পারিনি যে আমদুধ মাখানোর পর ওমন বিজলা বিজলা হয়ে যাবে। ওগুলো দেখার পর বারবার আমাশয় রোগীর বিষ্ঠার মতো মনে হচ্ছিল। তাই হাত দিয়ে খেতে ঘৃণা হচ্ছিল বিধায় চামচ দিয়ে খেলাম। আজকের নিবন্ধের আমদুধ প্রসঙ্গটি অবশ্য সেই প্রসঙ্গে নয়, যে প্রসঙ্গে গল্পটি প্রায়ই উল্লেখ করতেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। অনেকে দাড়ি টুপি তজবিহ হাতে নিয়ে রোজার মাসে নানা ফন্দি ফিকিরের মাধ্যমে কিভাবে ঘুষ, দুর্নীতি করে তা বোঝানোর জন্য গল্পটি বলা হলেও আজ সে অপ্রীতিকর প্রসঙ্গে যাবো না। বরং সাম্প্রতিক রাজনীতির ‘আমদুধ’ নিয়ে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করব।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার তাদের বেশির ভাগ কর্মকাণ্ডকে আমদুধের মতো মিশিয়ে ফেলেছে। আম ও দুধ মিলিয়ে ফেললে যেমন একটি জটিল ও যৌগিক পদার্থ তৈরি হয়, তেমনি সরকারের প্রতিটি কর্ম তাদের চলার পথকে যৌগিক ও জটিল করে তুলছে। আমদুধকে মিশিয়ে ফেললে যেমন আবার তা পৃথক করা যায় না, তেমনি বর্তমান সরকারের কিছু কর্ম এমন জটিলতার সৃষ্টি করেছে এবং এসব কর্মকাণ্ডের সাথে সরকারের নাম এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, আগামী কয়েক শত বছরেও আজকের সরকারি দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ইচ্ছে করলেও সেসব কর্মের দায় মেটাতে পারবে না অথবা ওইসব কর্ম থেকে নিজেদের নাম পৃথক করতে পারবে না। সরকারের নানামুখী কর্মকাণ্ড, অদ্ভুত আচরণ এবং লাগামহীন কথাবার্তার দরুন আওয়ামী লীগের আদি রূপ, রস ও গন্ধ সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

সাম্প্রতিক রাজনীতিতে গণতন্ত্রের চিরায়ত সংজ্ঞা নির্বাসনে গেছে। সরকারি দল এবং তাদের জোটভুক্ত নামকাওয়াস্তে কিছু দলের মুখচেনা কয়েকজন লোকের কথাবার্তাই এখন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রধান দলিল বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইতঃপূর্বে জানতাম- গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন, যেখানে শাসন ক্ষমতায় নিয়োজিত অধস্তন কর্মচারী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি সবাই জনগণকে ভয় করবে, সমীহ করবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সমর্থন নিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করবে। গণতন্ত্র সম্পর্কে অতীতের সেই ধারণা এখন আর অবশিষ্ট নেই। এখন নির্বাচন হবেÑ কিন্তু ভোট হবে না। আবার ভোট হবে তো গণনা হবে না। অথবা ভাগ্যগুণে গণনা হলেও যদি বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয় এবং দুভার্গ্যক্রমে বিজয়ী যদি কর্তার মনোপুত না হয় তবে প্রার্থী এবং জেলখানার মধ্যে অদ্ভুত এক মহাকর্ষ, মাধ্যাকর্ষণ এবং মহাজাগতিক মায়ামমতার বন্ধন পয়দা হয়ে যায়।

রাজনীতির আম ও দুধগুলোর অতি মাখামাখি কিংবা চটকানোর ফলে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনই এমন ‘বিজলা বিজলা’ হয়ে গেছে যে, কাউকে ধরা যাচ্ছে না, কাউকে বোঝা যাচ্ছে না এবং কাউকে চেনাও যাচ্ছে না। সর্বত্রই এক নিবিড় আলো-আঁধারির খেলা। এ খেলায় চুলপাকা অধ্যাপক ও অধ্যাপিকারা তার কিশোর-কিশোরী ছাত্রছাত্রীদের মতো রাজনৈতিক নেতার পেছনে সারাক্ষণ ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছেন। কবি কবিতা লেখা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার জন্য জীবনমরণ যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। ইদানীং গায়কেরা গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, নৃত্যশিল্পীরাও নর্তনকুর্দন করেন না। অন্য দিকে, অভিনেতারা নেতা হওয়ার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কলাবিক্রেতা হেলিকপ্টার কেনার স্বপ্ন দেখেন, সাইকেলের মিস্ত্রি মনে করেন তার পক্ষে সেভেন ফোর সেভেন জাম্বো জেট বিমান মেরামত অসম্ভব নয়। চোর চিন্তা করে কিরূপে উত্তম ডাকাত হওয়া যায় আর ডাকাতেরা এখন অনেক কিছুর মালিক হওয়ার পর চিন্তা করছে কিরূপে জননন্দিত নেতা হওয়া যায়।

দেশ এখন কে বা কারা চালাচ্ছে তা হৃদয়ঙ্গম করার জন্য সাদামাটা হৃৎপিণ্ড থাকলে চলবে না। স্বাভাবিক দৃষ্টি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয় শাসন ক্ষমতার প্রকৃত কর্তৃত্ব কার হাতে রয়েছে। স্বাভাবিক কান দিয়ে যা শোনা যায়, তা যে সত্য নয়, তা এ দেশের পাগল, অবোধ শিশু এবং স্মৃতিশক্তি হারানো নারী-পুরুষেরাও অনায়াসে বুঝতে পারে। বই পুস্তকের মর্মবাণী, ধর্মীয় গ্রন্থের নীতিমালা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংবিধানের নিয়মকানুন বাংলাদেশের কোথায় কোথায় অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয় তা লিউয়েন হুকের আবিষ্কৃত অণুবীক্ষণ যন্ত্র শনাক্ত করতে অপারগ। এ দেশের রাজনীতিবিদদের দূরদৃষ্টি কোনো দূরবীনের সাথে তুলনীয় নয়। তাদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, চাল-চলন, পোশাক-আশাক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতো নয়; আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথেও ওগুলোর কোনো মিল নেই। এমনকি সৌদি বাদশাহ সালমান অথবা ইরানি প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির সাথেও কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

আমাদের রাজনীতির নিয়মকানুন, দর্শন ও গন্ধ বোঝার জন্য আলাদা মস্তিষ্ক দরকার। আর এ কারণেই বিদেশীরা আমাদের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু না বুঝে হুদাই বেহুদা কথাবার্তা বলে থাকেন। লন্ডনের মেয়রকে ঢাকা শহরের মেয়র বানানো হলে দু-তিন দিনের মধ্যেই পাগল হয়ে যাবেন। এ জন্য খুব বেশি কিছু করার দরকার পড়বে না। একদিন তাকে দুপুরে মুরগির রোস্ট, খাসির রেজালা এবং গরুর কালো ভুনা গোশত-পোলাও দিয়ে আচ্ছামতো খাওয়াতে হবে। তারপর তার সামনে খাবারের বিলটা তুলে ধরতে হবে। বিল দেখে প্রথমে ভারী আশ্চর্য হবেন এবং একটু পর মুচকি হেসে বলবেন, ‘চমৎকার! এত অল্প টাকায় চমৎকার খাবার খেলাম। ঢাকার মেয়র না হলে এমন সুখ কোনো দিনই পেতাম না। উফ্! কেন যে এতটা দিন লন্ডনে থেকে জীবনটা নষ্ট করলাম!’ তার কথা শুনে অফিসের আর্দালি বলবে, স্যার, আপনি খুব হিসাব করে চলেন তো! এ জন্যই আপনার জন্য একটু হিসাবকিতাব করে বিশেষ দোকান থেকে সস্তায় মজাদার খাবারের ব্যবস্থা করেছি। মেয়র তখন পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলবেন, তা বেশ! এবার বলো তো কিভাবে করলে? আর্দালি বলবেন, শহরে অনেক দোকান রয়েছে যেগুলোতে নিয়মিত মরা গরু, মরা খাসি এবং মরা মুরগির মজাদার খাবার তৈরি হয় এবং খুব কম দামে বিক্রি করা হয়।

আর্দালির কথা শোনামাত্র মেয়রের পেটটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তিনি তার অফিস থেকে শুরু করেন ভোঁ দৌড়। তারপর সদরঘাট গিয়ে ঝাঁপ দেন বুড়িগঙ্গায়। নদী সাঁতরে তিনি যখন কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার কালিগঞ্জ বাজারে ওঠেন, তখন তার সাদা ধবধবে চামড়া বুড়িগঙ্গার পানির স্পর্শে কুচকুচে কালো বর্ণে রঞ্জিত হয়ে যায়। তার বেসামাল লম্ফঝম্ফ, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি এবং এলোমেলো কথাবার্তার কারণে লোকজন তাকে কালু পাগলা বলে সম্বোধন আরম্ভ করে দেয়। কালু পাগলা সারা দিন মনের সুখে পাগলামি করে এবং রাতে এর চেয়েও বেশি সুখানুভূতি নিয়ে মরা মুরগির গোশতের স্বাদ স্মরণ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ মিয়ার বস্তিতে ঘুমাতে যায়।

রাজনীতির চিরায়ত সুবচন এখন আর মানুষের মুখে শোনা যায় না। শিশুদের জন্য তৈরি অ্যানিমেটেড কার্টুন ধরনের চলচ্চিত্রের দু-একটি কার্টুন চরিত্র মাঝে মধ্যে দু-চারটা ভালো কথা বলে। এসব চলচ্চিত্রও আবার বাংলাদেশে বিষম দু®প্র্রাপ্য। মাঝে মধ্যে কিংবা কালেভদ্রে কোনো কার্টুনের চলচ্চিত্র দু-একটি সিনেমা হলে মুক্তি পেলে সব বয়সের ছেলেমেয়ে, যুবক-যুবতী এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। কিছু দিন আগে কুংফু পান্ডা নামের একটি কার্টুন চলচ্চিত্র দেখার জন্য কয়েক মাস ধরে যেভাবে সব শ্রেণীর জনগণ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, তাতে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে, এ দেশের মনুষ্য সমাজে দেখার মতো কিংবা শোনার মতো তেমন কিছুই নেই। আমাদের দেশে বিনোদনের জন্য কিছু তৈরি হয় বটে, তবে এগুলোর নাম শুনেই রুচিবানদের সুরুচি স্বর্গে যাওয়ার জন্য চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। খাইছি তোরে, খামছি দিমু, কইয়া দিমু, খবর আছে ইত্যাদি শিরোনামের মধ্যেই আমাদের চিন্তাচেতনা যেভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাতে অদূরভবিষ্যতে আমাদের গন্তব্য যে কোথায় হতে পারে, তা নিয়ে দাদাদের চিন্তার অন্ত নেই।

রাজনীতিতে মিথ্যাচার, ক্ষমতার অনাচার, বুদ্ধিবৃত্তির ব্যভিচার এখন অনেকটা আমদুধের মতো আমাদের অস্থিমজার সাথে মিশে গেছে। অন্যকে ঠকানো, বড় মানুষদের অপমান করা, টোকাই-বোকাইদের বড় বড় দায়িত্ব দেয়া ইত্যাদি বদ খাসলত রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেছে। চরিত্রবান এবং চরিত্রহীন শব্দ দুটোর অর্থ ও প্রয়োগ উল্টো হয়ে গেছে। বড় পদে থাকলে কিছু বিষয়ে চারিত্রিক অলঙ্কার না থাকলেই নয়। দু-চারটা গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড, গোটা দশেক এক্সট্রা গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড, চার-পাঁচটা ক্লাবের মেম্বারশিপ, দু-তিন বোতল মদ পানের সক্ষমতা, সারা রাত বিনিদ্র থেকে ফেসবুক, স্কাইপে ইত্যাদির মাধ্যমে কুটুর কুটুর করা এবং নিজের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গের খবরাখবর, হালনাগাদ অবস্থা অপর পক্ষকে দেখানো এবং অপরেরটা দেখার দক্ষতা ও যোগ্যতা ইত্যাদি না থাকলে ওদের সমাজে নাকি প্রভাবশালী বলে নামডাক পাওয়া যায় না। ঘুষ, দুর্নীতি, জোরজুলুম, দখল, ব্যাংক ডাকাতি বা নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, ক্ষমতার দম্ভ প্রদর্শন ইত্যাদির সাথে রাজনীতি আর রাষ্ট্রক্ষমতা আমদুধের মতো মিলেমিশে একাকার হয়ে একেবারে ‘বিজলা বিজলা’ হয়ে পড়েছে।

ভয়, আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা পুরো সমাজ ও পরিবেশকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে আছে। এই জনপদের কারো মনে নির্মল আনন্দ নেই কবিগুরুর বর্ণনায় ভয়শূন্যচিত্ত এবং উন্নত শির এই বঙ্গ দেশে খুবই বিরল অথবা বিলুপ্ত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। নদীর জল, বনের গাছপালা, পাহাড়, সমুদ্র থেকে শুরু করে সাপ, বেজি, বাঘ, বানর, হাঙ্গর, কুমির, ব্যাঙ, ময়না-টিয়া-শালিক প্রভৃতি সব কিছুই আজ রাজনীতির ভয়ে কম্পমান হওয়ার পাশাপাশি অস্তিত্বসঙ্কটের মুখে পড়েছে। লোভলালসা, কামনা-বাসনা, কাম-ক্রোধ, অত্যাচার-জুলুম, গুম, হত্যা, প্রেম-ভালোবাসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পদোন্নতি, পদাবনতি, ধ্বংস-সৃষ্টি, নাচগান প্রভৃতি পরস্পরবিরোধী বিষয়গুলো ঝালমুড়ি অথবা চটপটির মতো একই পাত্রে অর্থাৎ একই গামলার মধ্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে মৃত সঞ্জীবনী সুরার ন্যায় পরিবেশিত হচ্ছে নব নব চেতনাধারীদের দিয়ে। ফলে মানুষের চেতনাশক্তিতে মরণব্যাধি ভাইরাস বাসা বাঁধার সুযোগ পাচ্ছে; চিন্তাশক্তি লোপ পাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে একটি বিশাল প্রজাতি আত্মমর্যাদাবোধ হারিয়ে জড়পদার্থে পরিণত হচ্ছে।

আমদুধের রাজনীতির কারণে সবচেয়ে অস্বস্তিকর ও অপমানজনক অবস্থায় পড়েছেন সমাজের প্রভাবশালী, অভিজাত ও শিক্ষিত সম্প্রদায়। তাদের প্রকৃত অবস্থা বোঝানোর জন্য একটি বাঘ এবং দেবদূতের কাহিনী বর্ণনা করা যেতে পারে। চিড়িয়াখানার একটি তরতাজা যুবক বাঘ গত কয়েক দিন ধরে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে অঝোরে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। চিড়িয়াখানার কর্তাব্যক্তিরা রাজ্যের সব ডাক্তার কবিরাজ, বৈদ্য ওঝা জড়ো করেও বাঘটির কান্নাকাটি থামাতে পারছিল না। এমন সময় দয়াপরবশ হয়ে একজন দেবদূত বাঘের খাঁচায় প্রবেশ করলেন এবং কণ্ঠে স্নেহের পরশ ঢেলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, বৎস! বলো তোমার কী হয়েছে? কেন তুমি নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে অবিরত কান্নার জালে আবদ্ধ হয়ে মৃত্যুপানে ধাবিত হচ্ছ?’

বাঘটি অশ্রুসজল নয়নে দেবদূতের দিকে তাকাল এবং কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলল, ওহে দেবদূত! আপনি আমায় সাহায্য করুন, যেন আমি স্বাভাবিকভাবে মরে যেতে পারি। এ জীবন আমার আর ভালো লাগছে না। সারাক্ষণ প্রচণ্ড অবহেলা, অনিরাপত্তা, খাদ্যাভাব, উঠতে বসতে অপমান এবং নিত্যদিনের জ্বালাময় টিটকারিতে আমার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ছিলাম বনের রাজা। আমার জন্ম রাজার ঔরসে এবং রানীর গর্ভে। রাজপরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী আমি শৈশব থেকেই রাজসিক চালচলন, আহার বিহার এবং কথাবার্তা রপ্ত করেছি; কিন্তু এখানে বন্দী হওয়ার পর আমাকে রীতিমতো একটি নিকৃষ্ট ভাঁড়ে পরিণত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আমাকে ঠিকমতো খেতে দেয় না। আমার যতœ নেয় না এবং সময় সুযোগ পেলেই আমার ওপর অত্যাচার চালিয়ে আমার রাজসিকতা অবদমন করে আমাকে বিড়াল অথবা বানরের সমপর্যায়ের প্রাণীতে রূপান্তরের চেষ্টা চালায়। তারা নিজেরা যেমন আমাকে অপমান করে, তেমনি আমাকে অরক্ষিত রেখে দর্শনার্থীদের সুযোগ করে দেয় নানারূপ নিত্যনতুন অপমানের মাধ্যমে আমার জীবনকে মরণের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য।

চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ আমার প্রতি যতটা না নিষ্ঠুর, তার চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর দর্শনার্থীরা। তারা আশা করে, আমি তাদের বিনোদনের জন্য বানরের মতো লাফ দেবো, কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করব এবং বিড়ালের মতো শান্ত থেকে তাদের কানমলা, লেজডলা, সুড়সুড়ি ইত্যাদি উপভোগ করব। তারা প্রায়ই আমার গায়ে ঢিল ছোড়ে এবং লাঠি দিয়ে খোঁচা দেয় আমার চিৎকার অথবা কান্না শুনে পুলকিত হওয়ার জন্য। এভাবে নিত্যকার অপমানে অতিষ্ঠ হতে হতে যখন নিঃশেষ হতে চলছিলাম, ঠিক তখনই ঘটল আমার জীবনের সর্বনিকৃষ্ট অপমানের ঘটনাটি। সে দিন ক্লান্ত শরীরে আধো আধো ঘুমে অর্ধমুদ্রিত চোখে দর্শকদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে খাঁচার এক কোণে চিৎ হয়ে শুয়েছিলাম। এমন সময় মধ্যবয়সী একজন মানুষ তার শিশুপুত্রকে নিয়ে আমাকে দেখতে এলেন। লোকটির পোশাক আশাক দেখে তাকে যেন ধনী, প্রভাবশালী এবং শিক্ষিত বলেই মনে হলো। আমি নির্বিকার থেকে তাদের পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করলাম।

দর্শনার্থী লোকটি আমাকে উত্তেজিত করার জন্য কয়েকবার বাঘের মতো ভেংচি কাটার চেষ্টা করল। দু-তিনটা ঢিলও ছুড়ল যেন আমি শোয়া থেকে উঠে দাঁড়াই। সে কয়েকবার ‘বাঘা ও বাঘা! কলা খাবা’ ইত্যাদি বলল। তার শিশু সন্তানটি সে তুলনায় কিছুই করল না। বরং সে আমার একটি অঙ্গ দেখিয়ে তার পিতাকে জিজ্ঞাসা করল, বাবা ওটা কী? লোকটি বেহায়া, বেশরম ও অশিক্ষিতের মতো বলল, ওটা হলো বাঘের ঝুনঝুনি। শিশুটি আবার জিজ্ঞাসা করল, বাবা! বাঘের ঝুনঝুনি কি বাজানো যায়! লোকটি বলল, অবশ্যই যায়, দাঁড়াও বাজিয়ে দেখাচ্ছি। এ কথা বলে সে লম্বা একটি কঞ্চি এনে আমার খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে আমার জীবনের সর্বনিকৃষ্ট অপমানের ঘটনাটি ঘটাল। আমার হুঙ্কারে বাবাটি তার শিশু সন্তানকে রেখেই ‘ওরে বাবারে’ বলে লাফ দিয়ে পেছনে পালাল। শিশুটি তার পরনের কাপড়চোপড় নষ্ট করে ফেলল এবং আরো অনেক দর্শনার্থী ছুটে এলো। সবাই নতুন করে তামাশা দেখার আশায় লোকটিকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগল, ভাই কী হয়েছিল? অন্য দিকে, আমি আবার খাঁচার কোণে গিয়ে শুয়ে পড়লাম এবং অপমানের বেদনায় অঝোরে কাঁদতে আরম্ভ করলাম।

উৎসঃ  নয়াদিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ