সিসি ডেস্ক: ইরাকে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে থাকা শ্রম কাউন্সিলর বদরুন নাহারের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার ডলার আত্মসাৎসহ অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ভিসা প্রদানে অতিরিক্ত অর্থ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ দূতাবাসকে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছে, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ভিসা ফি কত? ফলে দেশটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। রিত্রুক্রটিং এজেন্সির প্রতারণার শিকার হয়ে দেড়শ’ বাংলাদেশি জেলে মানবেতর জীবনযাপন করলেও কোনো ব্যবস্থা নেননি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত; উল্টো রিত্রুক্রটিং এজেন্সির কর্মকর্তাদের দূতাবাসে অনুবাদক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বদরুন নাহার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মকর্তা। তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠির সঙ্গে বেশ কিছু প্রামাণ্য দলিল ও কাগজপত্র সংযোজন করা হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অভিযোগ তদন্তের চিঠি পাওয়ার পর একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঈদের পর পরই তদন্ত কমিটি সরেজমিন তদন্তের জন্য বাগদাদে যাবে।’ এদিকে সাবেক যুগ্ম সচিব এ এম এম ফরহাদকে ইরাকে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি ঈদের পরে যোগদান করবেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাগদাদ থেকে টেলিফোনে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বদরুন নাহার বলেন, ‘আমি মাত্র নয় মাস হলো ইরাক দূতাবাসে যোগ দিয়েছি। ছয় মাস আগে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পাই। এ দায়িত্ব পাওয়ার পর আমি আগে থেকে চলে আসা অনিয়ম বন্ধে বেশ কিছু সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নেই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কেউ কেউ শত্রুতামূলকভাবে আমার বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘শুনেছি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হবে এবং অবশ্যই আমি নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটির কাছে অভিযোগের ব্যাপারে জবাব দেব।’
একাধিক ভুয়া বিল : অভিযোগের নথিপত্র অনুসন্ধানে দেখা যায়, বদরুন নাহারের এক ছেলে ও এক মেয়ে বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি হয়। ওই স্কুলের ২০১৫ সালের টিউশন ফি বাবদ মোট ব্যয়ের পরিমাণ ২৩ হাজার ডলার উল্লেখ করে তা পরিশোধের জন্য চিঠি দেন তিনি। পরে সরকারি নিয়মে এক বছরে এ খাতে ২০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয়নির্বাহ করার বিধান না থাকায় তাকে ১৯ হাজার ৫৫০ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। অথচ বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের টিউশন ফির তালিকায় দেখা যায়, গ্রেড-৯ এর জন্য বার্ষিক টিউশন ফি ৪ হাজার ডলার এবং গ্রেড-৫ এর জন্য ৩ হাজার ৫০০ ডলার। এর সঙ্গে পরীক্ষা ফি বাবদ আরও প্রায় ১৫০ ডলার পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। দেখা যায়, স্কুলের হিসাবে দুই সন্তানের জন্য তার বার্ষিক মোট টিউশন ফির পরিমাণ ৭ হাজার ৫০০ ডলার, পরীক্ষার ফিসহ তা ৭ হাজার ৬৫০ মার্কিন ডলার। এক্ষেত্রে তিনি ১১ হাজার ৯০০ মার্কিন ডলার ভুয়া বিল তুলে আত্মসাৎ করেছেন।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সরকারি বাসভবনে বসবাস করলেও হোটেলে অবস্থান দেখিয়ে ভাড়া বাবদ ১১ হাজার ৫৩৯ দশমিক ৭১ মার্কিন ডলার, বছরে প্রকৃত বাড়ি ভাড়া ২৪ হাজার ডলারের পরিবর্তে ৪৬ হাজার ডলার উত্তোলন এবং ফার্নিচার ক্রয় না করেও ক্রয় বাবদ আরও ৫ হাজার ৯০০ ডলার অতিরিক্ত বিল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া একাধিক পারিবারিক ভ্রমণ ও চিকিৎসা ভাতা এবং গাড়ির তেলের বিল বাবদও ভুয়া বিল দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ আছে।
ভিসা প্রদানে ঘুষ আদায়: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ দূতাবাসকে চিঠি দিয়ে জানতে চায়, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ভিসা ফি কত? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কোনো দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন চিঠি দিয়ে ভিসা ফির ব্যাপারে জানতে চায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, ভিসা ফি নিয়ে অসঙ্গতি পাওয়ার কারণেই চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ইরাক দূতাবাসে ৫০ ডলার নির্ধারিত ভিসা ফির সঙ্গে আরও ১০০ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে। অপর একটি সূত্র জানায়, শুধু ইরাক নয়, এর আগে আরও একাধিক দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের বিরুদ্ধে ভিসা ফির সঙ্গে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ এসেছে।
নির্যাতিত শ্রমিক নয়, প্রতারক রিত্রুক্রটিং এজেন্সির পক্ষে দূতাবাস: অভিযোগে আরও বলা হয়, বর্তমানে বাগদাদে ৩৯ জন এবং কুর্দিস্তানে আরও প্রায় ১০০ বাংলাদেশি জেলে রয়েছেন। এ ছাড়া কিছু রিত্রুক্রটিং এজেন্সি চাকরি দেওয়ার নাম করে ইরাকে নেওয়ার পর আটকে রেখে নির্যাতন করে আরও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। এ ব্যাপারে রাসেল খান নামের একজন নির্যাতিত শ্রমিক ৬ জানুয়ারি বাগদাদে বাংলাদেশি দূতাবাসে একটি লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, তারা একটি রিত্রুক্রটিং এজেন্সির মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা দিয়ে ১৭ জন একসঙ্গে ইরাকে আসেন। সেখানে যাওয়ার পর চাকরি না দিয়ে তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং একটি বাড়িতে আটকে রেখে আরও ৩ হাজার ৬০০ ডলার করে দিতে বলা হয়। কয়েকজন এর প্রতিবাদ করলে তাদের বেদম মারধর করা হয়। পরে প্রত্যেকের বাড়িতে খবর পাঠিয়ে জনপ্রতি তিন লাখ টাকা করে দেওয়ার পর তারা তাদের পাসপোর্টসহ ছেড়ে দেয়। অভিযোগে বলা হয়, নির্যাতিত শ্রমিকদের কাছ থেকে এই অভিযোগ পাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত কোনো ব্যবস্থা নেননি।
বাগদাদ থেকে একজন শ্রমিক টেলিফোনে জানান, শুধু বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতই নন, এর আগেও যারা ছিলেন তারাও নির্যাতিত শ্রমিকের পক্ষ নেননি। বরং প্রতারক রিত্রুক্রটিং এজেন্সির সঙ্গে হাত মিলিয়ে শ্রমিকদের জেল থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাই নেননি।
তিনি জানান, প্রতারক রিত্রুক্রটিং এজেন্সির একাধিক দালালকে অনুবাদক হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে দূতাবাসের কার্ড দিয়ে অবাধে প্রতারণা করার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাগদাদে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিধি অনুযায়ী দুটি অনুবাদকের পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেখানে অনুবাদক আছেন ১১ জন। এর মধ্যে নয়টি রিত্রুক্রটিং এজেন্সির কর্মকর্তাদের অনুবাদক পদে নিয়োগ দিয়ে কার্ড ইস্যু করা হয়েছে, যার প্রত্যেকটিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বদরুন নাহারের সই রয়েছে।