বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশার ঘাতক ওবায়দুল খানকে ধরিয়ে দিয়েছেন নীলফামারী জেলার এক মাংস বিক্রেতা। সেই অসম সাহসী ব্যাক্তিটি হলেন দুলাল হোসেন। সে জেলার ডোমার উপজেলার হরিণচড়া গ্রামের আফতাব উদ্দিনের ছেলে। পারিবারিক জীবনে তিনি ২ ছেলে ও ২ মেয়ে সন্তানের জনক। তার এ অসম সাহসী কাজের জন্য দুলাল হোসেন নামের ওই মাংস বিক্রেতার প্রশংসায় এলাকার পঞ্চমুখ সবাই। প্রশংসার বন্যায় এখন ভাসছেন দুলাল। সে উপজেলার সোনারায় বাজারে প্রতিদিন সকাল হতে ছাগলের মাংস বিক্রি করেন।
দুলাল হোসেন জানান, বুধবার সকালে তিনি প্রতিদিনের ন্যায় সোনারায় বাজারে মাংস বিক্রির দোকান খুলতে আসেন। সকালে বাজারে তেমন কোন লোকজন ছিল না। এমন সময় তিনি পাশ্ববর্তী এক দোকানের বারান্দায় উদভ্রান্তের মত এক যুবককে বসে থাকতে দেখেন। কিছুক্ষনের মধ্যে ভ্যানে করে ওই যুবক নীলফামারীর দিকে রওনা হয়ে যান। এ সময়ের মধ্যে দুলালের সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হতে থাকে। সে তার মোটর সাইকেল নিয়ে ওই যুবকের পিছু ধাওয়া করে এবং নীলফামারী ডোমার সড়কের খানাবাড়ী মসজিদের সামনে থেকে তাকে আটক করে নিজের মোটর সাইকেলে তোলেন। তাকে সোনারায় বাজারে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ওই যুবক নিজেকে ওবায়দুল নামের পরিচয় দিয়ে জানায়, তার বাড়ী দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার মীরাটাঙ্গী গ্রামে। এতে দুলালের বিশ্বাস জন্মে সেই রিশার হত্যাকারী। এক পর্যায়ে তাকে চায়ের দোকানে সকালের নাস্তা খাওয়ায় দুলাল।
এরই ফাঁকে ওবায়দুল জানান, সে ঢাকায় রিশা নামের এক স্কুল ছাত্রীর ঘাতক। ঢাকা থেকে সে পালিয়ে এসেছে ডোমারে এক আত্মীয়ের বাসায়। গত মঙ্গলবার রাতব্যাপী পুলিশের অভিযান চললে সে রাতটা বাশঝাড়ে কাটিয়ে দেয়। পুলিশি অভিযান শেষে সে বুধবার সকালে পালানোর চেষ্টা করছেন মাত্র। ওবায়দুল আরো জানান, সে নিজের অজান্তেই রিশাকে খুন করে ফেলেছে। এরপরই দুলাল ডোমার থানা পুলিশকে ফোন দিলে ডোমার থানার এসআই ফজলুল হক ঘটনাস্থলে পৌছে ওবায়দুলকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে।
এ ব্যাপারে দুলাল আরো জানায়, রিশা নয় সে তো আমার মেয়ে বা বোনও হতে পারত, সে বিবেক থেকেই ওবায়দুলকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। এভাবে ওবায়দুলকে আটক করে জেলার নিভৃত পল্লীর এ মাংস বিক্রেতা নিজের বিবেক ও মনুষত্বের সর্বোচ্চ প্রমান রেখেছেন বলে এলাকাবাসী মনে করছেন। ওবায়দুলকে আটকের পরেও দুলালের মাঝে নেই কোন উচ্চাশা বা অহমিকাবোধ। প্রতিদিনের ন্যায় সে আজও তার দোকানে বসেছে রোজদিনের মতো মাংস বিক্রি করতে।
ওবায়দুলকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার পর বুধবার বেলা ১২টার পরেই ডোমার থানা থেকে মাইক্রোবাসযোগে ওবায়দুলকে নিয়ে ডিএমপি’র রমনা জোনের এডিসি এইচ এম আজিমুল হকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ঢাকায় রওনা দেয়ার আগে ডোমার থানায় র্যাব পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়।
অপরদিকে, রিশার হত্যাকারী ওবায়দুলকে গ্রেফতার নিয়ে র্যাব পুলিশের দ্বন্দ শুরু হয়ে যায়। কে তাকে গ্রেফতার করেছে এ কৃতিত্ব নিতে এ নিয়ে উভয় বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবী করা হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়, ওবায়দুলকে নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার সোনারায় থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর র্যাবের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়, ওবায়দুলকে পাশ্ববর্তী দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনারায় বাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
র্যাব জানায়, বুধবার সকালে পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনারায় বাজার থেকে র্যাব-১৩ এর সিভিল টিম ওবায়দুলকে প্রথমে গ্রেফতার করে। তাকে নীলফামারীর র্যাব ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার জন্য হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয়া হয়। এরপর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি টিম ওবায়দুল ও র্যাব সদস্যদের ডোমার থানা পুলিশের কাছে নিয়ে যায়।
অপরদিকে পুলিশ জানায়, ওবায়দুলকে গ্রেফতার করতে রমনার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আজিমের নেতৃত্বে একটি টিম দিনাজপুর. ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারীতে অভিযান পরিচালনা করছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খবর পাওয়া যায় যে, ওবায়দুল ডোমার এলাকায় আত্মগোপন করেছেন। গতকাল রাত থেকেই ডোমারের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছিল। বুধবার ডোমারের একটি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে থানায় নেয়া হয়।
এলাকাবাসীর দাবী দুলাল যে কাজটি করেছে তা অবশ্যই ভাল কাজ বলে এর মূল্যায়ন করা উচিত। এলাকাবাসীর মতে, দুলালের ভাগ্য এ কাজে তাকে সহায়তা করেছে মাত্র। না হলে ওবায়দুলের দুলাভাইয়ের ভাই খুশবু’র মত অবস্থায় গিয়ে দাড়াত দুলাল।
জানা যায়, খুশবু জানতে পারে ওবায়দুল ডোমারে আছে তাই সে পুলিশকে খবর দেয়। ওবায়দুল এ খবর টের পেয়ে পালিয়ে গেলে ডোমার থানা পুলিশ খুশবুকে তার অফিসেই হাতকরা পড়িয়ে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ওবায়দুল আটক হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এভাবে যদি দুলাল হোসেন পুলিশে খবর দেওয়ার পরে কোনভাবে ওবায়দুল নিজেকে অস্বীকার বা পালিয়ে যেত তাহলে আজ দুলালের পরিনতি কি হতো সে কথাই আজ এলাকাবাসীর মুখে মুখে।
উল্লেখ্য যে, গত ২৪ আগষ্ট রাজধানীর উইলস ফাওয়ার স্কুলের সামনের ফুটওভার ব্রীজের কাছে রিশাকে ছুরিকাঘাত করে ওবায়দুল। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৮ আগষ্ট রবিবার সে মারা যায়। রিশাকে ছুরিকাঘাত করার পরদিন তার মা তানিয়া হোসেন বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। রিশার মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।