কাজী আনিস: সেলিব্রিটি সাংবাদিক যাদের বলা হয়, তাদের অনেককেই কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সেলিব্রিটি হওয়ার আগে তাঁদের অনেক সাহসী প্রতিবেদন দেখতাম। আর মনে মনে ভাবতাম, ইস তাঁদের মতো যদি কখনও সাংবাদিক হতে পারতাম!সাহসের কারণে হোক, প্রতিবেদনের কারণে হোক-দিনে দিনে তাঁরা হয়ে উঠেছেন প্রিয়, সেলিব্রিটি। ’সেলিব্রিটি’ আর ’সাহসী’ দুটি যে সম্পূর্ণ বিপরীত তা বুঝলাম তাঁদের দেখে। যতই তাঁরা সেলিব্রিটি হয়েছেন, ততই তাঁরা হয়ে পড়েছেন ভীতু। কেউ কেউ তেলবাজ হয়েছেন। কেউ কেউ দালাল। যারা এখনও সাহস নিয়ে ঘুরে বেড়ান, তাঁরা সেলিব্রিটি হতে পারেননি।
আমার কাছে সবচেয়ে সাহসী সাংবাদিক মনে হয় মফস্বল সাংবাদিকদের। কারণ, তাঁরা যে এলাকার দুর্নীতি আর দুর্নীতিপরায়ণ লোকের বিরুদ্ধে লেখেন, তাঁদের পরিবার নিয়ে ওই এলাকায় থাকতে হয়। জীবনটাকে হাতে নিয়ে দিন রাত তাঁকে এলাকায় ঘুরতে হয়। ফলে যখন মফস্বলের একজন সাংবাদিকের চাকরি চলে যায়, তখন শুধু তাঁকে পরিবার নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখেন না, সঙ্গে জীবন শঙ্কায় ভোগেন। এমন উদাহরণ অগণিত।
এ মফস্বল সাংবাদিকের খবর কেউ নেয় না। স্বল্প বেতন আর প্রতিদিন অফিসের ঝাড়ি-তাদের জীবনের করুণ অধ্যায়। চাকরি হারানোর পর সেই অধ্যায় হয় আরও করুণ। সাহসিকতার এত এত পুরস্কার চারদিকে, অথচ সৎ নিষ্ঠাবান কোনো মফস্বল সাংবাদিককে আজ পর্যন্ত কোনো সাহসিকতার পুরস্কার দিতে দেখলাম না। পেতে হলে তাঁকে আগে মার খেতে হয়। অথচ প্রতিদিন তিনি জীবনটাকে হাতে নিয়ে ঘুরছেন, রিপোর্ট করছেন। সমাজ এর কোনো মূল্য দেয় না। জীবদ্দশায়ও না, জীবন শেষ করে দিলেও না। সম্প্রতি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক মফস্বল সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনাটি এ ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
হুমায়ুন আজাদের সেই কথা, আমরা প্রশংসা করি সিংহের, কিন্তু বেছে নিই গাধা। দেখতে দেখতে শিখেছি, একজন সাংবাদিক ’সেলিব্রিটি’ হওয়ার পর গাধা তথা ভীতু হয়ে ওঠে। আর মানুষ তাকেই পছন্দ করে, বেছে নেয়। কিন্তু দিনের পর দিন সাহসের সঙ্গে যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, গেছেন মফস্বলের ’সেলিব্রিটি নয়’ মানুষটি, তাকে নিয়ে কোনো খবর আমরা রাখি না। তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনায়ও কেউ সরব হয় না, প্রতিবাদ করে না। গণমাধ্যমও না।
তাই গণমাধ্যমে আজ সাহসী সাংবাদিকতা নেই…
সমাজে আজ কোনো সাহস নেই…
লেখক: শিক্ষক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।