মানিক হোসেন, চিরিরবন্দর : দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে মঈনুদ্দীন (৩৫) কে গরু চোরের অপবাদ দিয়ে ঘর থেকে টেনে হেঁচরে বের করে লাঠি ও রড দিয়ে পিটিয়ে ডান হাত ভেঙ্গে দিয়েছে প্রতিবেশিরা । দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভাঙ্গা ডান হাতের পচন ধরলে কেটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এখন প্রতি মূহুতেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্চা লড়ছে মঈনুদ্দীন ।
এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছে চিরিরবন্দর উপজেলার সাইতারা ইউনিয়নের পূর্ব সাইতারা গ্রামের আবুল কালাম মন্ডলের ছেলে দিনমজুর মঈনুদ্দীনের উপর। বর্তমানে দিনমজুর মঈনউদ্দীনের ডান হাত কাটার পর রক্ত শূন্যতায় ভুগছে। মঈনুদ্দীনের শরীর এতটাই দূর্বল যে উঠে দাঁড়াতে পারে না। প্রতিটি মূহুর্তের মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে বেছেঁ আছে মইনুদ্দীন। দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের ২৬ নং বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
পারিবারিক অবস্থা এতটাই করুন যে এক বেলা অন্যের বাড়ীতে কাজ না করলে এক মুঠো ভাত পেটে জুটে না মঈনুদ্দীন পরিবারের। ছোট্ট একটা কুড়েঁ ঘরে স্ত্রী নূরবানু বেগম আর ৯ বছর বয়সের এক মাত্র ছেলে রাসেলকে নিয়ে বসবাস করে মঈনুদ্দীন ।
মঈনুদ্দীনের বাবার কোন জায়গা না থাকায় শ্বশুর আমেরুদ্দীনের ৫ শতক জমিনের উপর দো-চালা ঘর তৈরী করে ১২ বছর থেকে র্পূব সাইতারা গ্রামে বসবাস শুরু করেছিল মঈনুদ্দীন। শ্বশুরের দেওয়া এই ৫শতক জমিই তার জীবনের কাল হয়ে আজ দাঁড়িয়েছে। বাড়ীর পার্শ্ববর্তী আপন চাচা শ্বশুর আব্দুল সামাদের সাথে বাঁশ ঝাড়ের বাঁশ কাটা নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া লেগেই থাকত। একাধিকবার বাঁশ কাটা নিয়ে গ্রাম্য শালিশও হয়েছে কিন্তু কোন সমাধান হয়নি।
মঈনুদ্দীনের স্ত্রী নূর বানু জানায়, গত ১ জানুয়ারী মুঈনুদ্দীন মিল চাতালে কাজ শেষ করে নিজ বাড়ীতে ফিরে আসে রাত ৮ টার দিকে। হাত মুখ পা পরিস্কারের জন্য নিজ বাড়ীর টিউবওয়লের পানি না থাকায় পাশ্ববর্তী চাচা শ্বশুর আব্দুস সামাদের বাড়ীতে যায় পানির জন্য। মঈনুদ্দীন নিজ বাড়ীতে ফিরে আসার পর চাচা শ্বশুর আব্দুর সামাদ, মনজেল আলী, মহসিন আলী, আব্দুল মাজেদ, এনামুল ইসলাম, ওবায়দুর রহমান একত্রিত হয়ে চোর চোর বলে মঈনুদ্দীনের বাড়ীতে এসে ঘুমন্ত মঈনুদ্দীনকে ঘর থেকে টেনে হেঁচরে বের করে তার বাড়ীর আঙ্গিনায় রশি দিয়ে বেধে এলোপাথারি ভাবে পিটিয়ে পা জখম করে ও হাত ভেঙ্গে দেয় । পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য নূর ইসলাম এসে আবারো পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। আহত অবস্থায় স্বামী মঈনুদ্দীনকে চিরিরবন্দর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে ভর্তি করে স্ত্রী নুরবানী। অবস্থা বেগতিক দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরন করে।
তিনি আরোও জানান, গত ২২ জানুয়ারী রাতে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমার স্বামী মঈনুদ্দীনের ডান হাত পচন ধরার কারনে কেটে ফেলে হয়েছে। এই পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে কোথায় যাব, কি করব আমার ছেলের ভবিষ্যত কি হবে-এসব কথা বলতে বলতে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলে নূরবানু বেগম।
গ্রামবাসী কাউসার আলী জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে মঈনুদ্দীন এই এলাকায় বসবাস করছে কোন দিন তো শুনিনি যে মঈনুদ্দীন চুরি করেছে। বাশঁ ঝারের বাশঁ কাটা নিয়ে আব্দুস সামাদের সাথে দীর্ঘ দিন ধরে বিবাদ চলছে । এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গরু চুরির অপবাদ দিয়ে আব্দুস সামাদ ও তারা ছেলেরা মঈনুদ্দীনকে রশি দিয়ে বেধে পিটিয়ে হাত ভেঙ্গে দিয়েছে ।
গ্রামবাসী আবদুল মজিদ জানায়, চোর গরু চুরি করলে গরু নিয়ে চলে যাবে। যার গরু তার বাড়ীতেই আছে। অথচ গরু চোরের অপবাদ দিয়ে এক সহজ সরল দিন মজুর মঈনুদ্দীনকে বেধে পিটিয়ে হাত ভেঙ্গে দিল, তারপর হাত কেটে ফেলা হল । এটা আসলে অসহায় মানুষের উপর নির্যাতন ।
গ্রামবাসী সৈয়দ আলী জানায়, সামাদ পরিবারের দীর্ঘ দিনের রাগ মঈনুদ্দীনের উপর মিটিয়েছে। এই অসহায় মঈনুদ্দীনের পঙ্গু জীবনের জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া উচিত। আমরা অন্যায়কারীদের শাস্তি দাবি করি।
সাইতারা ইউপি সদস্য নূর ইসলাম জানায়, আব্দুর সামাদ, মনজেল আলী, এনামুল ইসলাম, মাজেদ, মহসিন ও ওবায়দুরসহ আরোও কয়েকজন মঈনুদ্দীনকে চোর বলে বেধে পিটিয়েছে- আমি ঘটনাস্থলে আসার আগেই। আমি মঈনুদ্দীনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করতে সহযোগিতা করছি ।
দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার বিপুল চন্দ্র রায় জানায়, মঈনুদ্দীনের ডান হাতের পচন ধরার কারনে কেটে ফেলা হয়েছে। তার ডান হাত কেটে ফেলে না হলে সমস্ত শরীরের এই পচন ছড়িয়ে পড়ত। অপারেশনের মাধ্যমে তার ডান হাত কেটে ফেলা হয়েছে। তবে তার শরীরে রক্তের স্বল্পতা রয়েছে।