সিসি নিউজ: দিনাজপুর দরবার শরীফে কথিত পীর ফরহাদ হোসেন চৌধুরী ও তার গৃহকর্মীকে হত্যার ৫দিন আগে থেকে এলাকাটি রেকি (পর্যবেক্ষণ) করেছিলো দুবৃর্ত্তরা। স্থানীয়দের দাবি, সোমবার রাতে এ হত্যার ঘটনার আগে দু’টি মোটরসাইকেলে করে পাঁচজনকে ওই এলাকায় চলাফেরা করতে দেখেছেন তারা। এদিকে, এ হত্যা রহস্যের এখনও কোনও হদিস না পাওয়ায় বিষয়টির সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা যাচাই করতে স্থানীয়দের দেওয়া এ তথ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে পুলিশ। তবে কথিত পীর ও তার গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করেছে কুড়িগ্রাম পুলিশ। গ্রেফতারকৃতের নাম ইসাহাক আলী (২৮)। তাকে আজ বুধবার ভোরে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও সায়েদুল ও সুমি নামে দুজন মুরিদকে আটক করে ‘নজরদারিতে রেখে’ জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ হত্যার কারণ বা কোনো সূত্র উদ্ধার করা যায়নি বলে জানিয়েছেন দিনাজপুর পুলিশ সুপার মো. হামিদুল আলম। এ ব্যাপারে মঙ্গলবার রাতে বোচাগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছেন নিহত পীরের মেয়ে ফাতেমা ফারহানা এ্যামি।
বুধবার সরেজমিনে গেলে এলাকার পারুল বেগম বলেন, ‘পীর বাবা’র (ফরহাদ হোসেন) সঙ্গে এখানকার কারও কোনও বিরোধ ছিল না। এলাকায় সবার পছন্দের মানুষ ছিলেন তিনি। সোমবার (১৩ মার্চ) তাকে হত্যার আগে দ’ুটি মোটরসাইকেলে ৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে অনেকেই চলাফেরা করতে দেখেছেন। তারাই এই হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’ একই এলাকার পারভীন বেগম নামের আরেকজন জানান, ‘সন্ধ্যার দিকে দুটি মোটরসাইকেলে করে ৫ জনকে আসতে দেখেছি। তবে তাদের চিনতে পারিনি।’
এদিকে, দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পীর ও তার গৃহকর্মীর মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করেছেন দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আমির হোসেন। তিনি জানান, নিহত ফরহাদ হাসান চৌধুরীর শরীরে ৭টি অস্ত্রের আঘাত রয়েছে এবং গুলি রয়েছে। আর রূপালী’র বুকে গুলি লেগেছে। এছাড়া তার শরীরের অনেক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
এই ঘটনা উদঘাটনে জেলা পুলিশের ৬ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মাহফুজ জামান আশরাফ জানান, তাকে প্রধান করে ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাকি সদস্যরা হলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মিজানুর রহমান, কাহারোল সার্কেল এএসপি রুহুল আমীন, ডিবির এসআই বজলুর রশিদ ও ফরিদ হোসেন এবং বোচাগঞ্জ থানার ওসি আরজু মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন। তারা ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন। তবে এখনও এই বিষয়গুলো প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ ও অভিযান) চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির। তিনি জানান, খুব দ্রুত এই ঘটনার রহস্যের জট খুলবে পুলিশ।
উল্লেখ্য, সোমবার (১৩ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বোচাগঞ্জ উপজেলার দৌলা নামক এলাকায় কথিত পীর ফরহাদ হাসান চৌধুরী ও তার গৃহকর্মী রূপালী বেগমকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার হামিদুল আলম জানান, এই ঘটনায় কোনও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি শত্রুতামূলকভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে কিনা সেটাও দেখছে পুলিশ।
এ ঘটনায় নাম ইসাহাক আলী (৬০) নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে কুড়িগ্রাম পুলিশ। তাকে আজ বুধবার ভোরে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও সায়েদুল ও সুমি নামে দ’ুজন মুিরদকে আটক করে ‘নজরদারিতে রেখে’ জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ হত্যার কারণ বা কোনো সূত্র উদ্ধার করা যায়নি বলে জানিয়েছেন দিনাজপুর পুলিশ সুপার মো. হামিদুল আলম। এ ব্যাপারে মঙ্গলবার রাতে বোচাগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছেন নিহত পীরের মেয়ে ফাতেমা ফারহানা এ্যামি।
নিহত পীর ফরহাদ হোসেন চৌধূরী একসময় দিনাজপুর পৌর বিএনপির সভাপতি ছিলেন।তিনি ছিলেন,দিনাজপুর মোটর পরিবহন মালিক গ্রুপের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ৮ বছর আগে তিনি হঠাৎ দাঁড়ি রেখে জুব্বা আলখেল্লা পড়ে পীর সেজে যার। গড়ে তুলেন বোচাগঞ্জ উপজেলার দৌলাগ্রাামে ‘কাদরিয়া মোহাম্মদিয়া দরবার শরীফ’ নামে দরবার শরীফ। সেখানে তার মুরিদরা তাকে বাবা বলে ডাকতে শুরু করেন। কথিত ওই দরবার শরীফে প্রতি রাতে ভক্তদের মাহফিল ও জিকির হত। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা শফিকুল ইসলাম নামের এক ‘মুরিদের’ সঙ্গে হত্যার তিন দিন আগে পীরের বাড়ির গৃহকর্মী রূপালি বেগমের বিয়ে হয়।
‘দরবার শরীফের’ খাদেম সায়েদুল জানান, তিনি এবং সুমি নামে ৫২ বছর বয়সী এক মুরিদ প্রতিদিনের মত জিকিরে অংশ নিতে এসে দীর্ঘক্ষণ ‘হুজুরকে’ ঘুমিয়ে থাকতে দেখে ডাকতে গিয়ে রক্তমাখা লাশ পান। পরে পাশের রান্নাঘরে পাওয়া যায় রুপালির লাশ।
তাদের দুজনের শরীরে গুলির চিহ্নের পাশাপাশি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের ক্ষত ছিল বলে রাতে জানিয়েছিল পুলিশ।
সোমবার রাতে লাশ উদ্ধারের পর দরবার শরীফে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা মঙ্গলবার ঘটনাস্থল ঘুরে আলামত সংগ্রহ করেছেন।সোমবার রাতেই দুজনের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
কথিত পীর ও তারা নারী মুরিদের হত্যাকান্ডের পর ইতমধ্যে জোর তদন্ত শুরু হয়েছে। আলামত সংগ্রহ করছে সিআইডি’র একটি দল। তবে এখন অবধি মেলেনি কোন ‘ক্লু’। জানা গেছে,বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে অনুসন্ধান চালাচ্ছে পুলিশ । প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে পুলিশের একটি তদন্ত সুত্র জানায়, ‘ধরন দেখে মনে হচ্ছে ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।’ তবে নিহত কথিত পীরের রাজনৈতিক জীবন, ব্যাক্তিগত জীবনে ব্যবসায়িক কোন ঝামেলা অথবা বিরোধ ছিলো কী না ? সে বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানায় ঐ তদন্ত সুত্রটি ।
প্রতিবেশী শামসুল মিয়া জানান, ফরহাদ হোসেন চৌধুরী পরিবার নিয়ে দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গায় থাকতেন। তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। সন্তানদের নাম আশিক, এ্যামি ও অর্ণব।
তিনি আরও জানান, ৮বছর ধরে এই দরবার শরিফটি চলছে। এটি চালাতেন ফরহাদ হোসেন চৌধুরী। সেখানে প্রতিদিন রাতে মুরিদরা আসতেন এবং জিকির করতেন। বিকেলের দিকে ফরহাদ হোসেন শহর থেকে গাড়ি করে দরবার শরিফে চলে আসতেন।
প্রতিবেশীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, প্রায় ৬/৭ বছর আগে নাগরিক জীবনের সবকিছু ছেড়ে আকস্মিক ধর্ম কর্মে মনোনিবেশ করেন ফরহাদ হোসেন চৌধুরী। সেসময় সবার কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে নিজেকে পীর পরিচয়ই বেশি দিতেন তিনি। লোকজনও তাঁকে সে ভাবেই চিনত। রাজনৈতিক অঙ্গন ও মটর মালিক সমিতিতে নিজের ভালো অবস্থান থেকেই অনেক শ্রেনী-পেশার মানুষের সাথে সু-সম্পর্কের সুবাদে অল্প সময়েই নিজের বেশ কিছু ভক্ত অনুরাগী তৈরি করে বনে যান কথিত পীর।
প্রতিবেশীরা জানায়, ধীরে ধীরে ফরহাদ হোসেন বাড়িতে পীরের আখড়া গড়ে তুলেছিলেন। একসময় বাড়িটি ‘দৌলা দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত হয়ে পড়ে আশেপাশের মানুষদের কাছে । গত কয়েকবছর ধরে এ কথিত পীরর এই আস্তানায় সপ্তাহে এক দিন আনুষ্ঠানিকভাবে মুরিদরা ‘জিকির-আজকার’ করতেন। এ ছাড়াও প্রায় দিনই এই আস্তানায় কমপক্ষে শতাধিক মুরিদ ভক্ত জমায়েত হতেন এবং রাতভর চলতো জিকির ।প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে, জিকির শুরুর আগে আগে, তখনো লোকজন জড়ো হয়নি এমন সময় ৬-৭ জন দুর্বৃত্ত দরবার শরিফে ঢুকে প্রথম ‘হুজুরকে’ চাকু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে ও গলা কাটে। পরে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় রূপালী বেগম চিৎকার করলে দুর্বৃত্তরা একই কায়দায় তাঁকেও পাশের আরেকটি ঘরে হত্যা করে।
দৌলা দরবার শরিফের খাদেম সায়েদুল বলেন, প্রতিদিন রাতে দরবারের জিকির ও মিলাদ হতো। জিকিরে অংশ নিতে সুমি (৫২) নামের এক মুরিদ রাতে দরবারে আসেন। দীর্ঘক্ষণ হুজুরকে (ফরহাদ) ঘুমিয়ে থাকতে দেখে তিনি আমাকে ডাক দেন। আমি এসে দেখি হুজুরের রক্ত মাখা লাশ। পরে পরিবারের অন্যদের খোঁজ নিতে গিয়ে পাশের একটি কক্ষে গৃহকর্মী রুপালিকেও মৃত অবস্থায় দেখতে পাই। ’
ঘটনাস্থলে থাকা জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল হক জানান জানান, পুলিশ এরই মধ্যে তদন্তে নেমে গেছে। সিআইডির সদস্যরা আলামত সংগ্র করছে। পুলিশ সুপার হামিদুল আলম প্রাথমিক তদন্তের বরাতে সাংবাদিকদের আরও বলেন, নিহত ফরহাদ হোসেন চৌধুরী (৬৮) দৌলা খানকার পীর হিসেবে পরিচিত। তিনি বিএনপির সাবেক পৌর সভাপতি ছিলেন । স্থানীয়রা জানায়, গেলো ৮ বছর ধরে ফরহাদ হোসেন আখড়াটি চালাচ্ছেন। সপ্তাহে একদিন বিশেষ জিকিরের আসর বসে। আজও এরকম জিকিরের আগে সুযোগ বুঝে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।