• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
“ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী” চলন্ত ট্রাকে আড়াই ঘন্টা ঝুলে ৩২ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ করলেন সিপাহি জয়পুরহাট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ ড্রাম ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কা, নিহত ৩ সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার

আলোর দিশারী আমেনা-বাকি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ

মোহাম্মাদ মানিক হোসেন, চিরিরবন্দর (দিনাজপুর): উত্তরাঞ্চলের একটি অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম আমেনা বাকি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ । প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হলেও মাত্র ১৬ বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি মানসম্মত ও কাঙ্খিত শিক্ষা বিস্তারে উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে সাড়া জাগিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করছে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ।
দিনাজপুর-পার্বতীপুর সড়ক দিয়ে ১৪ কিলোমিটার গেলে পাওয়া যাবে চিরিরবন্দর উপজেলার ঘুঘরাতলী মোড়। রাস্তার দক্ষিণ পাশে চোখে পড়বে পাকা প্রাচীর ঘেরা আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের ক্যাম্পাস। স্কুলে টুকতেই দেখা যায় প্রধান ফটক সংলগ্ন চারতলা বিশিষ্ট মেয়েদের হোস্টেল। নিচে আমেনা-বাকী ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়। ২০০১ সালের ৫ জুলাই স্কুলটি আনুষ্ঠানিভাবে ডা: আমজাদ হোসেনের ক্রয় করা এক একর জমির উপরে যাত্রা শুরু করে । প্রথমে চালু হয় নার্সারি থেকে তৃতীয় শ্রেনী পর্যন্ত । পরের বছর ষষ্ঠ শ্রেণী এবং ২০০৪ সালে অষ্টম শ্রেণী চালু করা হয় । ২০০৯ সালে চালু হয় এসএসসি। ঐ বছর থেকে আমেনা-বাকি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল দিনাজপুর জেলায় প্রথম ও দিনাজপুর বোর্ডে টানা তিনবার এসএসসি ফলাফলে শ্রেষ্ট তৃতীয় স্থান দখল করে। স্কুলটি ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ৭৯ জন অংশগ্রহণ করে এবং সকলেই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় । ২০১৫ সালে ৮৯ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৯ পরীক্ষার্থী, ২০১৬ সালে ১০৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৬ জন, আর এ বছর ১৩২ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৭ জন । ২০১৪ সালে এই স্কুলটিতে একাদশ শ্রেনী খোলা হয় । নামকরণ করা হয় আমেনা বাকি স্কুল এন্ড কলেজ । ২০১৬ সালে এখান থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫২ জন । এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮ জন । চলতি বছর ৩৭ জনের মধ্যে ৩২ শিক্ষার্থী এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ।
বর্তমানে স্কুলের জমির পরিমাণ আট একর। প্লে- থেকে শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৭ জন। ১৮ জন নারীসহ শিক্ষক সংখ্যা ৭৬ জন। প্রতিষ্ঠানটিতে আবাসিক সুযোগ দিতে ছাত্রীদের জন্য ৩ টি ছাত্রদের জন্য ১ টি হোস্টেল নির্মাণ করা হয় । বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২৪৫ জন ছাত্র ও ৪২০ জন ছাত্রী আবাসিক হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে। ছাত্রীদের জন্য চারজন নারী শিক্ষক ছাড়াও একজন আয়া সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রদের তদারকির জন্য রয়েছে ৩০ জন শিক্ষক। স্কুলের ভিতরে পড়ালেখা থেকে শুরু করে থাকা খাওয়া, খেলাধূলার সবকিছুই নিয়ম অনুযায়ী হয়। নিয়ম ভঙ্গ করার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আয়া, কুকার দারোয়ান কারোরই নিয়মের বাইরে যাওয়ার উপায় নেই।’ জানালেন আবাসিক হোস্টেলে থাকা নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জেসমিন আক্তার।

Exif_JPEG_420

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো: মিজানুর রহমান স্কুলের মূলফটক থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকাসহ পুরো ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখালেন। ছায়াঘেরা ক্যাম্পাসের সামনে দুই সারি গাছের মাঝখান দিয়ে ছোট পথ দিয়ে হাটা শুরু করে পাশেই প্রশস্ত মাঠে রয়েছে শিশুদের বিনোদনের জন্য দোলনা, ¯িপ্র-পার, ঢেঁকি ছাড়াও সুন্দর বসার স্থান। তার পরেই পশ্চিমে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বড় ক্যাম্পাস। রয়েছে গাছের ছায়ার নিচে ইটের দেয়াল ঘেরা টিনের ছাউনি দিয়ে পাঁচটি বড় ভবন। ক্যাম্পাসের দক্ষিণ দিকে বড় ফুটবল মাঠ। মাঠের পশ্চিমে লিচুবাগান। তার সাথে আরও দুটি খেলার মাঠ। মাঠের পূর্ব দিকে ছয় তলাবিশিষ্ট ছেলেদের আবাসিক হোস্টেল। দক্ষিণ প্রান্তে শিক্ষকদের আবাস। পূর্ব দিকের ভবনে স্কুলের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের বসার কক্ষ ছাড়াও আছে প্রশিক্ষণ কক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব এবং দক্ষিণে বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার এবং স্কুল মিলনায়তন। এর পাশেই ছেলে ও মেয়েদের পৃথক খাবারের ঘর। তার পাশেই আটটি এবং উত্তর দিকের ভবনে পাঁচটি শ্রেণীকক্ষ ছাড়াও শিশুদের জন্য রয়েছে একটি বিনোদনকক্ষ। এছাড়াও ধর্ম পালনের জন্য হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পৃথক নামাজ পড়ার স্থান।
স্কুলের নিয়মাবলীতে বেষ্টিত থাকে সকল আবাসিক-অনাবাসিক শিক্ষার্থী । ভোর পৌনে পাঁচটায় আবাসিক শিক্ষার্থীদের ঘুম থেকে ওঠা বাধ্যতামূলক। এরপর নামাজ, প্রার্থনা ও শারীরিক ব্যায়াম শেষে সকালের নাশতা পায়েস, নুডলস, চিড়ার বিরিয়ানি, চা-টোস্ট, সেমাই মুড়ি রুটি-দুধসহ নানা খাবার। নাশতা শেষে শ্রেণীকক্ষে লেখাপড়া শেষে সকাল আটটায় ফিরতে হয় হোস্টেলে। পুনরায় ডাইনিংয়ে ভাত খাওয়া। সকাল নয়টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত স্কুলে কোচিং ক্লাস। ক্লাস শেষে হোস্টেলে ফিরে আবার পৌনে ১১টায় অ্যাসেম্বলিতে যোগ দেওয়া। বেলা ১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ক্লাস। দুইটার মধ্যে খেয়ে নিতে হয় দুপুরের খাবার। বিকেল চারটায় স্কুল ছুটির পর শিক্ষার্থীরা কেউ মাঠে খেলে, কেউ কম্পিউটার ল্যাবে, কেউবা নাচ-গান, আবৃত্তিতে অংশ নেয়। সন্ধায় পড়াশুনা শেষে রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ঘুমাতে যাওয়া বাধ্যতামূলক। এই স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত ভর্তি ফি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। আর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বেতন সাড়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। হোস্টেলে থাকার জন্য রয়েছে আলাদা খরচ।
শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো করছে না । সহশিক্ষা কার্যক্রমেও আছে এখানকার শিক্ষার্থীদের কৃতিত্ব । প্রতি বছর বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেয় এখানকার শিক্ষার্থীরা । ২০১৬ সালে সৃজনশীল মেধা অন্বেষন প্রতিযোগীতায় দৈনন্দিন বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিয়ে অষ্টম শ্রেনীর শিক্ষার্থী মোকলেছুর রহমান দেশ সেরা নির্বাচিত হয় ।
ডা: আমজাদ হোসেন তার মা আমেনা খাতুন ও বাবা প্রয়াত বাকী মন্ডলের নাম অনুসারে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এ বি ফাউন্ডেশন’। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আমেনা বাকি রেসিডেন্টসিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ। ডা: আমজাদ হোসেন ১৯৭১ সালে দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পেশায় তিনি একজন অর্থোপেডিক সার্জন । দেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতেই তিনি পিতা-মাতার নামে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন । তার সেই স্বপ্ন বাস্তবে রুপ নেওয়ায় তিনি এখন একটি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ