সিসি ডেস্ক: ‘বাহে আটাশি সালের বন্যার নাহান ভাসি আচছে ইলিশের ঝাক। মোর দাদারাও এদন ইলিশ দেখে নাই।’ কথাগুলো আবেগে আপ্লুত হয়ে বলছিলেন কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ারচর এলাকার মঝি লালচান। গত কয়েক বছরে বন্যার সাথে খবরের পাতায় উঠে আসছিল পোড়ারচর গ্রামের বানবাসী মানুষের কষ্টের কথা। সেই পোড়ার চরে এখন সোনা ফলানোর মতো আকাঙ্খিত ইলিশ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। ফলে এই চরের মানুষের চোখে চকচক করছে আনন্দ।
বৃদ্ধ আছান আলী জানান, এই ইলিশ সাগরের লোনাজলোত থাকপের কথা। সেই মাছ চলি আসছে নদীর মিষ্টি পানিত। শতশত মানুষ সারারাইত ধরি মাছ মারছে। বাহে মাছের দাম পাইলে হামরাগুলা বড়লোক হয়া গেলং হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, জেলার চিলমারী উপজেলা থেকে উলিপুর, কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলা দিয়ে ব্রহ্মপূত্র, ধরলা, দুধকুমর, গঙ্গাধর, হলহলিয়া ও ফুলকুমর নদী হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ চলে আসে এই জেলার মাঝিদের নাগালের মধ্যে। সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকার সময় কুড়িগ্রামের নদ-নদীগুলোতে এমনিতেই ইলিশ পাওয়া যেত না। এ বছর জেলেরা নদীতে নেমে ইলিশের ঝাঁক জালে আটকাতে পেরে অবাক হয়ে যায়। একদম ঝকঝকে রূপালী ইলিশ।
এরপর বলতে গেলে ইতিহাস। গ্রামের সাধারণ একজন হতদরিদ্রের কপালেও জোটে এই ইলিশ। এত ইলিশ কিনবে কে? ফলে শুরুতে একশ’ টাকাতেই দুটো ইলিশ কেনাবেচা শুরু হয়। ছয়শ’ থেকে সাতশ’ গ্রামের ইলিশগুলো ডিমে ভর্তি। এই ডিমভরা ইলিশগুলো এমন সুস্বাদু যে শহরা লের লোকজন ছুটতে থাকে নদ-নদীর পাড়ে। গোপনে-প্রকাশ্যে চলে ইলিশ বেচাকেনা।
এসময়ে ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন পয়েন্টে শতশত মণ ইলিশ বিক্রি করেছে জেলেরা। প্রকাশ্যে বিক্রি করতে না পারলেও গোপনে ইলিশের বাণিজ্য হয়েছে কোটি টাকার। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর ইলিশের সংখ্যা কমে গেছে বলে জানান মাঝিরা। কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ হয়ে সীমান্তবর্তী ভারতের আসামে চলে গেছে অসংখ্য ইলিশের ঝাঁক।
জেলা মৎস বিভাগ সূত্র জানায়, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরার খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে নেয়া হয় নানা উদ্যোগ। এসময় মা ইলিশ না ধরার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা থেকে ২শ’ কৃষককে দেয়া হয় প্রণোদনা। নদ-নদীগুলোতে পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়। তারপরও গোপনে চলে ইলিশ ধরার কাজ। প্রশাসনের সহায়তায় মৎস্য বিভাগ ২২দিনে ১১টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে ১৫২টি। এসময় ইলিশ মাছ আটক করা হয় ৫৭৭কেজি, জাল নষ্ট করা হয় ২লাখ ৯৬হাজার মিটার। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬০লাখ টাকা। জরিমানা করা হয় ৫ হাজার টাকা এবং চিলমারীতে জেল দেয়া হয় ২ জেলেকে।
বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার যাত্রাপুরের পোড়ারচরে ২০ থেকে ৩০টি ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় মাছ ধরছে মাঝিরা। এসময় কথা হয় চর যাত্রাপুরের মাঝি হারুন মিয়া, হামিদুল ইসলাম, পোড়ার চরের মাঝি লাল চান, গোয়ালপুরি চরের মাঝি শহিদুল ইসলামের সাথে।
তারা জানান, নিষেধাজ্ঞা চলার প্রায় এক সপ্তাহ পর ব্রহ্মপুত্র নদে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ মাছ আসে। যেটা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সেই সময় অনেক মাঝি কারেন্ট জাল দিয়ে সারারাত মাছ ধরেছে। অনেকেই এক থেকে ৩ মণ পর্যন্ত ইলিশ পেয়েছে। যার ওজন ৪০০ গ্রাম থেকে ৮০০ গ্রাম ছিল। তখন ছোট-বড় ইলিশের কেজি ছিল ১৫০ হতে ২৫০ টাকা।
তারা আরো জানান, নিষেধাজ্ঞা উঠার পর থেকে মাঝিরা আগের মতো ইলিশ পাচ্ছে না। বর্তমানে এক-একজন মাঝি ৫ কেজি থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত ইলিশ পাচ্ছে। বর্তমানে ইলিশের বাজার ৩০০ হতে ৪৫০টাকা। এই মাছ ভারতের আসামেও যাচ্ছে সেখানে এর দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছে। নিষেজ্ঞাকালীন জনপ্রতিনিধি এবং প্রসাশনসহ বিভিন্ন দলীয় লোকজন এসে মণকে মণ ইলিশ কিনে নিয়েছেন আবার অনেকইে হুমকি ধামকি দিয়ে ইলিশ নিয়েছেন।
চিলমারীর মৎস্য আড়ৎদার ফুল বাবু জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও তারা প্রকাশ্যে বেচতে পারেননি। জেলেরা সরাসরি বিক্রি করেছে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩৫ মণ ইলিশ মাছ চিলমারীর ঘাটে এসেছে।
যাত্রাপুর নৌকার মাঝি সামাদ আলী বলেন, মোটর মাইকেল যোগে শত শত ক্রেতা এসে যাত্রাপুর ঘাট থেকে বস্তা করে ইলিশ নিয়ে গেছেন। এখানে গড়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০টি ডিঙ্গি নৌকা মাছ ধরছে।
হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, তার ইউনিয়নে কয়েকশ জেলে ব্রহ্মপুত্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও নদীতে মাছ না থাকায় তারা খুব কষ্টে জীবন যাপন করেন। এ বছরের মতো ইলিশ ধরা পড়লে তাদের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি এলাকার মানুষ সহজেই ইলিশ খেতে পারবে।
যাত্রাপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্রহ্মপুত্রে পানির প্রবাহ বেশী থাকায় মূলত ইলিশ ছুটে এসেছে ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদ-নদীতে। এতে করে অভাবী এলাকার মানুষজন স্বল্প খরচেই ইলিশ মাছ কিনে খেতে পারছেন। নিষেধাজ্ঞা সঠিকভাবে পালন করা গেলে ভবিষ্যতেও এমন ইলিশের আরো আবির্ভাব ঘটবে এবং জেলার অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে তিনি আশা করেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, সরকারের নিষেধাজ্ঞা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হওয়ায় ইলিশ সব নদ-নদীতে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। এতে করে এই অ লের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। বর্তমানে জেলায় কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ১৭ হাজার ৬৪৩ জন। প্রজনন মৌসুমে তাদের সহযোগিতা এবং ইলিশ সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা নিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা পরিকল্পনা পাঠিয়েছি।
উৎস: বিবার্তা