
খুরশিদ জামান কাকন ।। ‘আগোত হামরা মাইনসের বাড়িত আছিনো। এলা হামরা নিজের বাড়ি পাছি। শেখের বেটি হাসিনা হামাক বাড়ি বানে দিছে। বাহে, এলা হামরা অনেক ভালো আছি।’ হাস্যোজ্জ্বল মুখে কথাগুলো বলছিলেন হোসনে আরা লিপি। তিনি মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প ২ এর আওতায় বাড়ি পেয়েছেন। সেখানেই স্বামী সংসার নিয়ে সুখের ঘর পেতেছেন। এর আগে তিনি সপরিবারে মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এবার তিনি মাথা গুজার একটি ঠাই পেলেন। তাইতো দিন বদলের হাওয়ায় সন্তানকেও স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। সেই সাথে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন।
মুজিবর্ষ উপলক্ষে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের নিজবাড়ী গুচ্ছগ্রামে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পে গৃহহীন ও ভূমিহীন ৩৪ টি পরিবারকে পূনর্বাসন করা হয়েছে। গত ২৩ ই জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে উপকারভোগী এসব পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ দৃষ্টিনন্দন বাড়ি প্রদান করেন। দূর্যোগ সহনীয় এসব বাড়িতে রয়েছে দুই কক্ষ বিশিষ্ট পাকা ঘর, সাথে রান্নাঘর ও টয়লেট। আরো আছে বিদ্যুৎ সংযোগ ও টিউবওয়েলের ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে মাথা গুজার ঠাই পেয়ে কামারপুকুরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা অনেক উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত।
কামারপুকুরের উপকারভোগীদের অনেকেরই নিজস্ব কোন জমিজমা নেই। কারো কারো ঘরও নেই। তাদের অনেকে দিন আনেন দিন খান। মানবেতর জীবনযাপন করেন। এতোদিন তারা অন্যের দয়াদাক্ষিণ্যাই বেচে ছিলেন। এখন তারা নিজের বাড়ি ও জমি পেয়ে নতুন করে সংসার সাজাচ্ছেন। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গৃহবধূদের কেউ কেউ চুলোয় রান্না চড়িয়েছেন। কেউ বাড়িঘর ঝাড়ু দিচ্ছেন। কেউবা মেশিনে সেলাই করছেন। পুরুষদের বেশিরভাগ বাড়ির বাইরে কাজে গিয়েছেন৷ শিশুদের বাড়ির উঠোনে খেলতে দেখা গেলো। সবমিলিয়ে তাদের নতুন জীবন অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মনে হলো।
কথা হয় উপকারভোগী হামিদুল ইসলামের সাথে। তিনি একজন ভ্যানচালক। এর আগে ভাড়াবাড়ীতে ছিলেন। এখানে তিনি নিজের বাড়ি ও জমি পেয়েছেন। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এখন তিনি ভালোই দিন কাটাচ্ছেন। হামিদুল ইসলাম (৫৫) জানান, ‘আগোত হামরা ভাড়া বাড়িত আছিনো। প্রত্যেক মাসত ১০০০ টাকা করি ভাড়া দিবার লাগছিলো। এখন হামরা নয়া ঘর পাছি। হামাক আর ভাড়া দিবার লাগেনা।’
একইভাবে গৃহবধূ আয়শা খাতুনও আগে স্বামী-সন্তান নিয়ে মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছিলেন। মুজিববর্ষে জমি ও ঘর পেয়ে তার জীবনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তাইতো ভাগ্য পরিবর্তনের তাগিদে স্বামীর পাশাপাশি নিজেও সেলাইমেশিনে কাজ করছেন। আয়শা খাতুন জানান, ‘হামার এইলার ভাড়া বাড়িতও যাবার ক্ষমতা নাই। সেঠে বেলে এলা হামরা পাকা বাড়ির মালিক। অল্পনা হইলেও জমি পাছি। স্বপ্নেও হামরা এলা আশা করি নাই।’
কামারপুকুরে ভূমি ও গৃহহীনদের নতুন এই ঠিকানাই শিশুদের সময় কাটছে হৈ-হুল্লোড়ে। তাদের বেশিরভাগই এখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। কথা হয় শিশু লিটন ও আকাশের সাথে। এখানে এসে লিটন ভর্তি হয়েছে চতুর্থ শ্রেণীতে ও আকাশ পড়ছে তৃতীয় শ্রেনীতে। তাদের দুজনের ইচ্ছে পড়াশোনা শেষ করে বড় কোন চাকরি করার। তারা এই প্রতিবেদককে জানায়, ‘এখানে এসে আমরা স্কুলে ভর্তি হয়েছি। পড়াশোনা শুরু করেছি। বাড়ির পাশে খেলার মাঠ পেয়েছি। বিকেলে আমরা সবাই একসঙ্গে খেলাধুলা করি।’
সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসিম আহমেদ সিসি নিউজকে জানান, ‘মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে আশ্রয়ণ প্রকল্প ২ এর আওতায় গৃহহীন ও ভূমিহীন ৩৪ টি অসহায় পরিবারকে দুই শতক জমিসহ গৃহ তুলে দেওয়া হয়েছে। এসব গৃহ নির্মানে বরাদ্দ ছিলো ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা করে। আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাসরত বাসিন্দাদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত খোজ খবর নেওয়া হয়ে থাকে।’
সৈয়দপুরের কামারপুকুর ইউনিয়নের নিজবাড়ি গুচ্ছগ্রামে সরকারি খাস জমিতে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের উত্তর পাশে রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়ক হওয়ায় এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক ভালো। এখানে একটি বাজার রয়েছে। তাই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা অাত্বকর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগসুবিধা আছে। এছাড়াও প্রকল্পের পাশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় শিশুকিশোররা সহজেই স্কুলগামী হতে পারবে। সবমিলিয়ে এখানে নীড় বাধা বাসিন্দারা এখন অনেক ভালো আছে। দুর্দিন ছাপিয়ে তারাও এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে হাটছে।