।। এস এম জামান ।। অর্থাভাবে পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সৈয়দপুরে ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত মারুফ হোসেন ও রিমন আহমেদ নামের দুই কিশোর। বর্তমানে রিমন ঢাকার সরকারি পঙ্গু হাসপাতালে ও মারুফ সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এরই মধ্যে ভাঙ্গা হাড় ও মাংসে পঁচন ধরায় যন্ত্রনায় ছটফট করছে হতভাগ্য এই দুই কিশোর। অথচ হতদরিদ্র অভিভাবকরা অর্থাভাবে তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। তাদের আশঙ্কা চিকিৎসার অভাবে সন্তানরা হয়তো পঙ্গু হয়ে যাবে।
ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়নের বর্গাচাষী রশিদুল হকের পুত্র মারুফ। চাচা সাইদার রহমান জানান, মারুফ তার বন্ধুসহ ঈদের পরের দিন নানীর বাড়ি থেকে ট্রেনে করে ফিরছিল। সৈয়দপুর রেললাইনের আউটার সিগনালের কাছে রেল লাইন সংলগ্ন দাড়িয়ে থাকা একটি ফলবাহী ট্রাকের দরজা ট্রেনের জানালার সাথে ধাক্কা খায়। এতে ট্রেনের জালানায় থাকা মারুফের ডান হাতটি ভেঙ্গে মাংস থেতলে কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মারুফ বর্তমান ঢাকার মোহাম্মদপুর শ্যামলিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালের অর্থপ্যাডিক্স সার্জারী ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে।
আহত মারুফের বাবা রশিদুল হক জানান, রংপুরে ৪দিন ভর্তি থেকেও কোন কাজ হয়নি। তারা শুধু ড্রেসিং করত। এ হাসপাতালেই হাতের ক্ষতি হয়ে যায়। পরে মাংসে পঁচন শুরু হলে চিকিৎসকরা ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করেন। এরপর পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসায়ও কোন উন্নতি হয়নি। পরে ভিটেমাটি বিক্রি করে দেড়লাখ টাকার চুক্তিতে ছেলেকে নিয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। তিনি বলেন, ছেলের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ৩ লাখ টাকা ব্যায় হয়েছে। অথচ আমার ছেলে সুস্থ্য হচ্ছেনা। ওই দুর্ঘটনায় আহত রিমনের অবস্থা আরও ভয়াবহ।
রিমনের বাবা শহিদুল হক জানান, পরিবারের সুখের আশায় তিনি ঢাকায় গিয়ে রিক্সা চালান। তার বাড়ী ডোমার উপজেলার বামুনিয়া ইউনিয়নের ডাক্তার পাড়ায়। এই করোনাকালে রিকশা চালিয়ে সংসার চালানোই দায়। তারপরও সৈয়দপুর, রংপুর এরপর ঢাকাসহ তিন দফায় ছেলের চিকিৎসায় সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয় করেছি। তবুও হাতটির কোন উন্নতি হয়নি। শুধু ড্রেসিং আর ড্রেসিং। চিকিৎসকরা অপারেশনের কথা বলছেন। লকডাউনে বন্ধ হোটেল। তাই বেশির ভাগ সময় বিস্কুট আর পাউরুটি খেয়ে হাসপাতালের পরিত্যাক্ত স্থানে পরিবারসহ ছেলেকে দেখভাল করছি ।
এদিকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে দুই পরিবারের হাত প্রায় শুণ্য। ছেলেদের চিকিৎসার চিন্তায় তারা চোখে অন্ধকার দেখছেন। রাজধানী ঢাকায় কার কাছে হাত পাতবেন এই চিন্তায় তারাও অসুস্থ্য হয়ে পড়ছেন।
উল্লেখ্য, ঈদের ২য় দিন রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সৈয়দপুর স্টেশনে ঢোকার সময় আউটার সিগনাল সংলগ্ন ফল বাজারের কাছে রেললাইন ঘেষা দাড়ানো একটি ফলবাহী কন্টেইনারের খোলা দরজার আঘাতে ট্রেনে থাকা ওই দুই কিশোর মারাত্বক আঘাত পায়।তাদেরকে সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রথমে চিকিৎসার জন্য সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতাল ও পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেয়া হয়।
এ ঘটনায় সৈয়দপুর রেলওয়ে থানার এসআই শাহজাহান আলী মন্ডল রেললাইনের ধারে অবৈধ ভাবে দাড়িয়ে থাকা সৈয়দপুর বিক্রমপুর ফল ভান্ডারের কন্টেইনার (ঢাকা-মেট্রো-ট-১৮-৪১৬৬) চালক হাবিবুর রহমান ও ফল ভান্ডারের মালিক শাহ আলমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় কেউ আটক না হলেও তদন্ত চলছে বলে জানান জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বিশ্বাস।
তিনি জানান, ওই এলাকায় অরক্ষিত রেলাইনের ধারে স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এছাড়াও দুর্ঘটনা এড়াতে রেললাইনের উভয় পাশে সীমানা বেষ্টনি নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যেই রেলওয়ের উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।