সিসি নিউজ: নীলফামারীর সৈয়দপুরে ঝুট কাপড়ের পোশাকের পর এবার বিশ্বের বাজারে দখলে নিয়েছে গরম কাপড়ের তৈরি সোয়েটার। আরামদায়ক, রকমারি ডিজাইনের উন্নত এ পোষাকটির কদর বেড়েছে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায়। বছরে ৩০ কোটি টাকার এ উষ্ণ পোষাক রপ্তানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। এতে যেমন কারিগররাও হচ্ছেন স্বনির্ভর, তেমনি এ শহরে অপার সম্ভাবনা জেগেছে তৈরি পোষাক শিল্পের।
সূত্র মতে, ২০১২ সালে শহরের মিস্ত্রীপাড়া এলাকায় ডিমলা ভবনে ঢাকার বিশিষ্ট গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মো. হাবিবুর রহমান রপ্তানিমুখী আমির সোয়েটার গার্মেন্টস স্থাপন করেন। শুরুতে ইপিজেড-এর বঞ্চিত ও প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা এখানে তৈরি করে সোয়েটার। পরে দু-এক মাসে স্থানীয় দরিদ্র কলেজ শিক্ষার্থী, গৃহবধূ ও গ্রামের বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলে নিয়োগ দেয়া হয়। উৎপাদন শর্তে আয় অনুযায়ী এ গার্মেন্টসে এখন প্রায় তিন শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন।
গার্মেন্টস মালিক সূত্র জানায়, এখানে প্রতিদিন শিক্ষিত অশিক্ষিত বেকাররা কাজের সন্ধানে আসে। তার বাড়তি মেশিন না থাকায় নিয়োগ দেয়া এখন সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামীতে এ ফ্যাক্টরীতে শতাধিক মেশিন বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ফ্যাক্টরীতে নিটিংয়ে ১৪৪ জন, লিংকিংয়ে ৭০ জন, ট্রিমিংয়ে ৩০ জন ও হোল্ডিং অপারেটর ৩৫ জন কর্মরত। এরা প্রত্যেকে উৎপাদন অনুযায়ী মাসে ৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পাচ্ছেন। ওই গার্মেন্টসের ট্রিমিং অপারেটর শহরবানু সাথী জানান, এখানে কাজ নেয়ার আগে সংসারে অভাব অনটন রেগেই থাকতো। এখন স্বামী ও সন্তান নিয়ে ভালই দিন যাচ্ছে। ফাতেমা নামে লিংকিং অপারেটর জানান, আগে গুলের ফ্যাক্টরীতে ঝঁকি নিয়ে কাজ করতাম। এখন সুস্থ্য পরিবেশে কাজ করে ভালই আছি। উপার্জন হচ্ছে ভাল। রাবেয়া নামে ডিগ্রিতে পড়ুয়া এক শিক্ষানবিশ শ্রমিক জানান, চাকরী নেই তাই এ কাজ করছি। তবে যা পাই তা দিয়ে বাবা মাসহ পরিবারের ও আমার পড়ালেখার খরচও চলছে। এভাবে ওই গার্মেন্টেসের শ্রমিকরা স্বনির্ভরতা কথা শুনান।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানান, আমরা যে মজুরী দেই তা সারাদেশের গার্মেন্টেসের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই প্রদান করি। এ সকল কর্মঠ শ্রমিকের সুনিপুণ গাঁধুনির সোয়েটার এখন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকায় যাচ্ছে। প্রতি বছর বায়ারের মাধ্যমে মালয়েশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্সে ৩০ কোটি টাকার এ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। তাদের চাহিদানুযায়ী প্রতিদিন ১০০৩ ও ০১৯ মডেলের সোয়েটার ৪ থেকে ৫শ পিস তৈরি হচ্ছে। আর এ সকল প্রতি পিচ পোশাকে সুতা পরিবহন, ওয়াশ, আয়রন, প্যাকিং, পলি, লেবেল ও কাটুন করাসহ শ্রমিক খরচ মিলে উৎপাদন ব্যয় হচ্ছে ৪ থেকে ৫শত টাকা। আর বিক্রয় হচ্ছে ৯ থেকে ১০ ডলার দরে। এতে মালিকপক্ষসহ শ্রমিকরাও স্বচ্ছলতা ফিরিয়েছেন নিজের।
প্রোডাকশন ম্যানেজার ইসমাইল হোসেন জানান, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মতে দ্রুত এখানে আরো মেশিন বসবে। এতে হয়তো শতাধিক বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জেনারেল ম্যানেজার জুলফিকার হায়দার জানান, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় গত ৬ মাসে বিভিন্ন কারণে প্রায় ১ কোটি টাকার সোয়েটার অবিক্রিত রয়েছে। যা সম্পূর্ণটাই লোকসান। বর্তমানে সেটা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগবে।
এদিকে ঝুট কাপড়ের তৈরী পোশাক কারখানার মালিকরা জানান, প্রায় ৫ শতাধিক কারখানার উৎপাদিত জ্যাকেট, থ্রিকোয়াটার, জিন্স প্যান্ট, শার্ট আমরা রপ্তানি করছি ভারত, বার্মা, নেপাল ও ভুটানে। তবে বায়রার মাধ্যমে উন্নত রাষ্ট্রে এ সকল পোষাক রপ্তানি হলে প্রসারিত হতো এ শিল্প। এনআর গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী হামিদার রহমান জানান, দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা সোয়েটার এখন বিদেশে রপ্তানি করছি। তবে সরকারসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শহরে হয়তো একদিন তৈরী পোষাক শিল্পে বিপ্লব ঘটবে।