ঢাকা: রহস্য ঘনীভূত হয়ে আছে বিমানবালা সূচীর মৃত্যু নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। তবে যে কারণেই সূচীর মৃত্যু হোক, এর নেপথ্যে যে প্রেমঘটিত বিষয় রয়েছে এ বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সূচী আত্মহত্যা করতে পারে না। যে মেয়ে সকালে বসে দুপুরের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল সেই মেয়ে দুপুর হওয়ার আগেই গলায় ফাঁস দিয়ে মরতে পারে না। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, হত্যা না আত্মহত্যা ময়নাতদন্তের আগে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আত্মহত্যা হলে এতে কারও প্ররোচনা ছিল কিনা তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার সহকর্মী কয়েকজনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এদের মধ্যে কথিত প্রেমিক মাহবুব মোর্শেদ রয়েছেন।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় একটি পরিবারের সঙ্গে ফ্ল্যাটে ভাগাভাগি করে থাকতেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিমানবালা সূচী। তার সঙ্গে থাকতো প্রবাসী ভাইয়ের স্ত্রী সুমি। সূচী চাকরির পাশাপাশি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে (এআইইউবি) বিবিএ পড়ছিলেন। ভাবী সুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। তিনি সাইফুরসে ইংরেজি কোচিং করছিলেন। বুধবার সকাল ১১টার দিকে সুমি কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় সূচী ঘরে বসে পড়ছিলেন। দুপুর দুইটায় তার পরীক্ষা ছিল। কিন্তু দুপুর পৌনে দুইটার দিকে তিনি বাসায় ফিরে দেখেন ঘরের সদর দরজা খোলা। ভেতরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে সূচীর নিথর দেহ। একই সময়ে ওই বাসায় পৌঁছে যায় সূচীর সহকর্মী বিমানবালা সৈয়দা রাখিনা লিকমা, কেবিন ক্রু মাহবুব মোর্শেদ ও মির্জা আদনান। তারা সবাই সূচীর ঝুলন্ত লাশ নিয়ে যান পাশের ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা সূচীকে মৃত ঘোষণা করলে লাশ আবার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে ওই বাসায় গিয়ে হাজির হয় পুলিশ। তারা লাশটি উদ্ধারের পাশাপাশি রাখিনা লিকমা, মাহবুব মোর্শেদ ও আদনানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যান থানায়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সূচীর ভাবী সুমি ও পাশের ভাড়াটিয়া লাকী আক্তারকেও। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সূচীর বন্ধুরা জানান, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে সূচীর সঙ্গে তাদের কথাবার্তা হয়েছে। এ সময় তার (সূচী) আচরণ ও কথাবার্তা ছিল অস্বাভাবিক ও এলোমেলো। সে সবাইকে ফ্ল্যাটে আসতে বলে। এজন্যই তারা সবাই সূচীর ফ্ল্যাটে ছুটে যায়।
নিহত সূচীর পিতা পরিবহন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, তার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। উচ্চ মাধ্যমিকের পর সূচী ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে বিমানবালা হিসেবে কাজ শুরু করে। বছর চারেক সেখানে কাজ করার পর গত কোরবানির ঈদের সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগ দেয়। একই সঙ্গে সে বিবিএ পড়ছিল। সে ছিল অনেক মেধাবী। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেছিল। তার খুব স্বপ্ন ছিল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার। কিন্তু দুর্বৃত্তরা তার মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে দিলো না।
তিনি আরও বলেন, বিমান বাংলাদেশে কাজ শুরু করার পর তার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় কেবিন ক্রু মাহবুব মোর্শেদ। কিন্তু সে বিবাহিত। সূচী এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু মোর্শেদ নাছোড়বান্দা। সে উত্যক্ত করতে থাকে তাকে। মোর্শেদের স্ত্রীও বিষয়টি জানতে পেরে উল্টো সূচীকেই বিভিন্ন সময় থ্রেট করে। এমনকি মোবাইল নম্বর যোগাড় করে আমার স্ত্রীকেও একাধিকবার ফোন করে থ্রেট করেছে। তিনি বলেন, আমাদের ধারণা মোর্শেদ কিংবা তার স্ত্রীর হাতেই আমার মেয়ে খুন হয়েছে। সূচীর পরিবারের এক সদস্য জানান, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মোর্শেদ একাধিকবার টাঙ্গাইলে সূচীদের বাসায় গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোর্শেদ অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে। কিন্তু বিয়ের পরও সূচীর সঙ্গে রেখেছেন যোগাযোগ। সমপ্রতি তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে একসঙ্গেই কাজ করতো।
এদিকে অপর একটি সূত্র জানায়, প্রায় বছর পাঁচেক আগে লন্ডন প্রবাসী মোবারক নামে এক তরুণের সঙ্গে সূচীর টেলিফোনে বিয়ে হয়। ওই বিয়েতে সূচীর মত ছিল না। ফলে বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। মাত্র এক মাস ঘর করেছিলেন তারা। কিন্তু লন্ডন প্রবাসী মোবারক গভীর ভালবেসে ফেলেন সূচীকে। এ কারণে বিচ্ছেদের পরও পিছু ছাড়েননি সূচীর। সূচীকে আবারও ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এ নিয়ে মাঝে মধ্যে হুমকিও দিতেন সূচীকে। এমনকি সূচীর পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নিতে নোয়াখালীর আদালতে সূচী, তার মা-বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। বছরখানেক পর সেই মামলা থেকে খালাস পান তারা। কিন্তু এরপরও মোবারক তাদের পেছনে লেগে ছিল। অপরদিকে আদনান নামে আরেক কেবিন ক্রুর ব্যাপারেও অভিযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়া প্রবাসী সূচীর বড় ভাই সাইদুল ইসলাম অপু মোবাইলে এ প্রতিবেদককে বলেন, সূচী কখনও আত্মহত্যা করতে পারে না। বুধবার রাতেও সূচীর সঙ্গে তার স্কাইপিতে কথা হয়েছে। বুধবারই এক লোকের মাধ্যমে তিনি বোনের জন্য পাঁচটি ভ্যানিটি ব্যাগ ও একটি মোবাইল ফোন পাঠিয়েছেন। তার বোন খুব খুশি হয়েছে। বলেছে আমি প্রতিদিন একটি করে ব্যাগ নিয়ে বাইরে বের হবো। বোনের সঙ্গে তার খুব ফ্রি সম্পর্ক ছিল জানিয়ে সাইদুল ইসলাম বলেন, প্রেম সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে তার বোন তাকে সব বলতো। সূচীকে তিনি সব সময় অ্যাফেয়ার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতেন। আগে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলতেন। তিনি বলেন, যে মেয়ে সকালে বাসায় বসে পরীক্ষার জন্য পড়ছিল সেই মেয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
সূচীর ছোট চাচা হারুনুর রশিদ বলেন, তার ভাইঝিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারা থানায় মামলা করবেন। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মোর্শেদ কিংবা তার স্ত্রী জড়িত বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, সূচীর মা সুলতানা বেগম থানা হাজতেও মোর্শেদকে একই কথা বলেছেন। সূচীর খালাতো বোন সাদিয়া জানান, সূচীর ভাইবোনরা সবাই মেধাবী। ছোট বোন শর্মীও অনেক মেধাবী। এমন মেধাবী একটি মেয়ে এভাবে আত্মহত্যা করতে পারে না।
গতকাল সরেজমিন সূচীর উত্তরার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চম তলার ওই ভবনের নিচতলার গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ারা এ বিষয়ে কিছু বলতে আগ্রহী নন। একজন ভাড়াটিয়া জানালেন, আলামত যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য পুলিশ ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ করে রেখেছে। সূচীর মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ঘটনার সংবাদ পেয়ে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করি। গলায় ফাঁসের লাল কালচে কাটা দাগ ছাড়া শরীরে অন্য কোন আঘাতের চিহ্ন বা জখম পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে ভিকটিম গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও তদন্তের আগে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। সূচীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১১১৬) করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত পুলিশ কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আলী মাহমুদ জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সূচী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনার পর কয়েকজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, প্রেমঘটিত বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল সূচী। এজন্যই সে আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে এখন পর্যন্ত নিহতের বন্ধুসহ ৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদেরকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। পরিবারের কেউ এখনও মামলা করেননি। মামলা হলে ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এদিকে সূচীর পারিবারিক সূত্র জানায়, গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে সূচীর লাশ তাদের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের করটিয়া খানবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ধ্যার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। উৎসঃ মানবজমিন